ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দিতে গিয়ে অভিনেত্রী বাঁধন উগ্রবাদী নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আওয়ামী লীগের হামলার মুখে পড়েছেন। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী অভিনেত্রী বাঁধন ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে অংশগ্রহণ করার পর থেকেই তার ফেসবুক পোস্টগুলোতে সাইবার বুলিং করে আসছে নিষিদ্ধ উগ্রবাদী গোষ্ঠীটির সদস্যরা।
ইতালিতে বাঁধনের ওপর হামলা চালানোর পরে নিষিদ্ধ আওয়ামী গোষ্ঠীটি হামলার দায়দায়িত্ব স্বীকার করে ফেসবুক পোস্ট দিয়েছে।
২০২৪-এর জুলাই বিপ্লবের সময় ও ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ চালানোর কারণে উগ্রবাদী রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হয়।
জুলাই বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী নারীদের ওপর সাইবার সহিংসতা ও জুলাই শহীদের কন্যাকে ধর্ষণের মতো ঘটনা এই নিষিদ্ধ সংগঠনটি ঘটিয়েছে। এ কারণে জুলাই বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী নারীদের একটি অংশ সোশ্যাল মিডিয়া থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে।
হামলায় আক্রান্ত হয়ে ফিরে ফেসবুক লাইভে বাঁধন বলেছেন, একজন আজমেরী হক বাঁধনকে দমানো এত সহজ নয়।
বাঁধনের ওপর হামলার খবরটি ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকা ও বাংলাদেশের কালের কণ্ঠ পত্রিকা বেশ উচ্ছ্বাসের সঙ্গে প্রকাশ করেছে। অন্যান্য হামলার ক্ষেত্রে শিরোনামে হামলাকারীদের নাম গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশকারী প্রথম আলো এই খবরটি প্রকাশে শিরোনামে হামলাকারী গোষ্ঠীর নাম উহ্য রেখেছে।
নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ নব্বইয়ের দশক থেকে তার অভিভাবক দিল্লির সাউথ ব্লক ও কলকাতার হিন্দুত্ববাদী ব্লকের সহযোগিতায় বাংলাদেশের কালচারাল সার্কেলটিকে দলভুক্ত করে; আর এই কালচারাল উইংকে ব্যবহার করে ২০০৯-২৪-এর ফ্যাসিস্ট শাসনের বৈধতা উৎপাদন করে। যে কারণে ক্ষমতাচ্যুতির পর থেকে আজ পর্যন্ত ফেসবুক, টিভি, সংবাদপত্র, ইউটিউবে নিষিদ্ধ সংগঠনের পক্ষে সম্মতি উৎপাদনের লক্ষ্যে কালচারাল ফ্যাসিস্টরা সক্রিয় রয়েছে।
জুলাই বিপ্লবে বাংলাদেশের যে শিল্পী, সাহিত্যিক, চলচ্চিত্র অভিনেতা-অভিনেত্রী, নির্দেশকেরা অংশ নেন; লীগের কালচারাল ফ্যাসিস্টরা তাদের তালিকা করে; দলের সন্ত্রাসীদের কাছে পৌঁছে দেয়; তাদের টার্গেট করে সাইবার বুলিং করার জন্য। ভয় দেখিয়ে জুলাই বিপ্লবী কালচারাল ফিগারদের নিষ্ক্রিয় করে ফেলাই এসব অশুভ কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য।
কালচারাল ফ্যাসিস্টদের গুচ্ছবদ্ধতার কারণেই জুলাই বিপ্লব কিংবা দেড় দশকের ফ্যাসিজমকালের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে তেমন নাটক-চলচ্চিত্র নির্মিত হয়নি। বরং হাসিনার পতনের পর দিল্লির সাউথ ব্লক ও ইন্ডিয়ার গদি মিডিয়ার যে ‘বাংলাদেশে ইসলামাইজেশনের জুজু’, তা নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। ৮০ বছর ধরে জিইয়ে রাখা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারি হারানোর গল্প নিয়ে কথিত দেশভাগের বেদনা চিত্রিত হয়েছে চলচ্চিত্রে। ক্ষমতাচ্যুত হয়েও কালচারাল জমিদারি অব্যাহত রেখেছে পতিত ফ্যাসিস্ট অনুসারীরা।
জুলাই বিপ্লবী বাঁধনের ওপর হামলাটি বাংলাদেশের স্বকীয় সংস্কৃতির বিকাশকে স্তব্ধ করে দেওয়ার হুমকি। ২০২৪-এ অর্জিত কালচারাল সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করে শতবর্ষ ধরে চলা কালচারাল হেজিমনির বুনো উল্লাস।
বাঁধনের ওপর হামলাকারীরা তাদের অপরাধ সংঘটিত করেছে ইতালিতে। বাংলাদেশ দূতাবাসকে ইতালির আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে হামলাকারীদের আইনি পথে মোকাবিলা করতে হবে। জুলাই বিপ্লবকালে আওয়ামী লীগ-সংগঠিত মানবতাবিরোধী অপরাধ নিয়ে জাতিসংঘের যে তদন্ত প্রতিবেদন রয়েছে, তাকে রেফারেন্স হিসেবে উপস্থাপন করে আওয়ামী গোষ্ঠীর দেশের বাইরে সংঘটিত অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব।
বাংলাদেশে নিষিদ্ধ আওয়ামী গোষ্ঠীর স্লিপিং সেলের যে লোকেরা ইন্ডিয়াবর্তী দেশি মিডিয়া ও নিউ মিডিয়ার বালিশে মাথা রেখে আওয়ামী পুনর্বাসনের আলাপ জারি রেখেছে; বাঁধনের ওপর আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হামলা সেসব রিকনসিলিয়েশনের উদ্দেশ্যমূলক আলোচনাকে অসাড় প্রমাণ করেছে। ২০০৯-২০২৪, ৫ আগস্ট সকাল পর্যন্ত মানবতাবিরোধী অপরাধ করা গোষ্ঠীটির গত দুই বছরে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা তো চোখেই পড়েনি; বরং গুপ্তহত্যা, ধর্ষণ, হামলার মধ্য দিয়ে তারা পৃথিবীর নিকৃষ্টতম অপরাধমনস্তত্ত্ব তুলে ধরেছে।
বাঁধন একজন অত্যন্ত প্রতিভাবান অভিনেত্রী। ভার্সেটাইল অভিনয়ের গুণে দর্শকমহলে তিনি সমাদৃত। চলচ্চিত্রে পুরুষ নায়কের প্রাধান্যের মিথ ভেঙে দিয়ে বাঁধন তার অভিনয়গুণে নিজেকে ‘হিরো’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এদিক থেকে তিনি ট্রেন্ডসেটার। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে ঋদ্ধ করতে চলচ্চিত্রকারেরা বাঁধনকে ভার্সেটাইল নানা চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ সৃষ্টি করবেন বলে প্রত্যাশা করি।
বাঁধন ব্যক্তিগত জীবনে আপসহীন। তিনি নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার পোস্টার গার্ল না হয়ে, যাপিত জীবনে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইটি লড়েছেন। নারীকে আইটেম গার্ল হিসেবে পেতে অভ্যস্ত পুরুষতান্ত্রিক শোবিজের পক্ষে তাই তাকে গ্রহণ করা অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়েছে। কিন্তু শোবিজে নতুন প্রজন্মের নাটক ও চলচ্চিত্র পরিচালকের আগমন ঘটেছে; যারা নারীকে ‘পারসন’ হিসেবে বুঝতে সক্ষম। ফলে বাংলাদেশ চলচ্চিত্রের নতুন উদয়ে বাঁধন মূল্যায়িত ও সুচিহ্নিত হবেন বলে বিশ্বাস করি।



পাঠকের মন্তব্য