Spotlight from Boston to Bangladesh: মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতন এবং আমাদের নীরবতা

২৮ পঠিত ... ২৩ ঘন্টা ২৯ মিনিট আগে

 

একটি শিশুর ওপর নির্যাতন কি শুধু একজন অপরাধীর গল্প, নাকি তার পেছনে লুকিয়ে থাকে একটি প্রতিষ্ঠান, একটি সংস্কৃতি এবং আমাদের সম্মিলিত নীরবতা?

২০১৫ সালে মুক্তি পাওয়া Spotlight সিনেমার সবচেয়ে অস্বস্তিকর জায়গাটি নির্যাতনের ঘটনাগুলো নিজে নয়; বরং ঘটনাগুলোর চারপাশে তৈরি হওয়া নীরবতা। The Boston Globe-এর Spotlight টিম যখন Boston-এর Catholic Church-এ শিশুদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করেছিল, তখন তাদের সামনে শুরুতে একের পর এক বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল। কিন্তু অনুসন্ধান যত এগোয়, সাংবাদিকরা বুঝতে পারেন, এটি কয়েকজন বিপথগামী priest-এর ব্যক্তিগত অপরাধের গল্প নয়। এর পেছনে ছিল এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, যেখানে অভিযোগ জানা সত্ত্বেও অভিযুক্তদের সরিয়ে না দিয়ে অন্য জায়গায় পাঠানো, গোপন সমঝোতা, নথি লুকিয়ে রাখা এবং প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষাকে শিশুর নিরাপত্তার ওপর অগ্রাধিকার দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো ঘটছিল।

এখানেই সিনেমাটির ঘটনার বাংলাদেশের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু তৈরি হয়। বাংলাদেশে মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ নতুন কোনো বিষয় নয়। UNICEF Bangladesh ইতিমধ্যেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ শিশুদের নিরাপদ থাকার কথা এমন জায়গায় যৌন সহিংসতার ঘটনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ২০২৬ সালের মার্চে Manusher Jonno Foundation কুষ্টিয়ার একটি মাদ্রাসায় ১০ বছর বয়সী শিশুর ওপর যৌন সহিংসতার ঘটনার পর এসব প্রতিষ্ঠানের দুর্বল নজরদারি ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। MJF-এর ভাষ্য অনুযায়ী, মাদ্রাসাসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে পর্যাপ্ত মনিটরিং এবং জবাবদিহিতা প্রয়োজন। কিন্তু এসব প্রশ্নেই আমাদের এখানে কবি নীরব।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে এই নীরবতা কেন আরও জটিল?

এখানে Boston-এর Catholic Church এবং বাংলাদেশের মাদ্রাসার মধ্যে সরাসরি সমীকরণ টানা ঠিক হবে না। ইতিহাস, প্রতিষ্ঠান, আইন, ধর্মীয় কাঠামো এবং সামাজিক বাস্তবতা ভিন্ন। কিন্তু একটি কাঠামোগত মিল নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়: যখন কোনো প্রতিষ্ঠান শুধু শিক্ষা দেয় না, বরং মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ও নৈতিক আস্থার জায়গাও হয়ে ওঠে, তখন সেই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে অভিযোগটি কখনো কখনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নয়, বরং ধর্মের বিরুদ্ধে আক্রমণ হিসেবে উপস্থাপিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তখন প্রতিরক্ষার ভাষাটিও বদলে যায়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটি মনে রাখা দরকার: ধর্মের সমালোচনা আর একটি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি চাওয়া এক জিনিস নয়।

কোনো মাদ্রাসায় একটি শিশুর নিরাপত্তা ব্যর্থ হলে সেই ব্যর্থতার তদন্ত দাবি করা ইসলাম বা মুসলমানদের বিরুদ্ধে অবস্থান নয়। বরং ধর্মীয় নৈতিকতার দৃষ্টিতেও দুর্বল ও নির্ভরশীল শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি মৌলিক দায়িত্ব। একইভাবে, Catholic Church-এর কোনো priest-এর অপরাধ নিয়ে অনুসন্ধান Catholic ধর্মাবলম্বী প্রত্যেক মানুষকে অভিযুক্ত করা নয়। Spotlight-এর প্রকৃত শিক্ষা তাই ধর্মকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা কীভাবে জবাবদিহির বাইরে চলে যেতে পারে, সেটি পরীক্ষা করা।

‘চেপে যাওয়া’ কীভাবে একটি কাঠামো তৈরি করে?

নীরবতা সবসময় একটি কেন্দ্রীয় ষড়যন্ত্রের ফল নয়। বরং অনেক ছোট ছোট সিদ্ধান্ত মিলে নীরবতার সংস্কৃতি তৈরি হতে পারে।

একটি অভিযোগকে গুরুত্ব না দেওয়া। পরিবারকে মামলা না করতে বোঝানো। শিশুর কথা বিশ্বাস না করা। প্রতিষ্ঠানের ‘সম্মান’ রক্ষার কথা বলা। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সাময়িকভাবে সরিয়ে আবার অন্যত্র সুযোগ দেওয়া। অথবা ঘটনাটিকে ‘একজন মানুষের ভুল’ বলে শেষ করে দেওয়া।

এসবের প্রতিটিই আলাদা ঘটনা মনে হতে পারে। কিন্তু একসঙ্গে দেখলে এগুলো সবগুলোর ডটই একে অপরের সঙ্গে কানেক্টেড।

Boston-এর ক্ষেত্রে Spotlight টিম ঠিক এই ডটগুলোকেই খুঁজেছিল। আদালতের নথি, চার্চের অভ্যন্তরীণ নথি, ভুক্তভোগীদের সাক্ষাৎকার এবং দীর্ঘ সময়ের অভিযোগ একত্র করে তারা দেখিয়েছিল যে ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন ছিল না। বাংলাদেশেও তাই এসব ঘটনায় অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রশ্ন শুধু ‘অপরাধী কে?’ হওয়া উচিত নয়। বরং প্রশ্নটা হওয়া উচিত, ‘অভিযোগের পর প্রতিষ্ঠান কী করেছিল?’

কিন্তু Boston-এর মতো Spotlight এখানে কতটা সম্ভব?

সত্যি বলতে গেলে, বাংলাদেশের বাস্তবতা অনেক কঠিন। The Boston Globe-এর Spotlight টিম দীর্ঘ সময় ধরে গোপনে কাজ করতে পেরেছিল, আদালতের নথি অনুসরণ করেছিল, sealed records প্রকাশের জন্য আইনি লড়াই করেছিল এবং একের পর এক ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলেছিল। পরে প্রকাশিত Globe-এর বর্ণনা থেকে জানা যায়, আদালতের মাধ্যমে কিছু confidential record উন্মুক্ত হওয়াই তদন্তকে অনেক বেশি শক্তিশালী করেছিল।

বাংলাদেশে একই ধরনের অনুসন্ধানের পথে অনেক বাস্তব বাধা রয়েছে, যেমন: তথ্য পাওয়ার সীমাবদ্ধতা, স্থানীয় ক্ষমতার সম্পর্ক, সাক্ষীর নিরাপত্তা, আইনি ঝুঁকি, সম্পাদকের স্বাধীনতা, মালিকানার চাপ এবং সাংবাদিকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা। সংবাদমাধ্যমের সামগ্রিক স্বাধীনতার সূচকও একটি কঠিন বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। RSF-এর ২০২৬ World Press Freedom Index-এ বাংলাদেশ ১৮০ দেশের মধ্যে ১৫২তম অবস্থানে ছিল; ২০২৫ সালে অবস্থান ছিল ১৪৯তম।

আরেকটি সমস্যা আরও সূক্ষ্ম: সাংবাদিকরা অনেক সময় ঘটনার খবর প্রকাশ করেন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি follow-the-paper-trail journalism করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে আমরা শুধু ‘মাদ্রাসায় শিক্ষক গ্রেপ্তার’, ‘স্কুলে শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ’, এগুলো পাই। কিন্তু এরপর মামলা কতদূর গড়াল? প্রতিষ্ঠান কী ব্যবস্থা নিল? অভিযুক্তের কর্মজীবনের আগের ইতিহাস কী? অভিযোগের পর অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান কি তাকে নিয়োগ করেছিল?

এগুলো হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।

বাংলাদেশের মাদ্রাসাগুলোকে একসঙ্গে সন্দেহের চোখে দেখা যেমন অন্যায়, তেমনি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদার কারণে অভিযোগকে প্রশ্নাতীত ধরে নেওয়াও বিপজ্জনক।

একটি মাদ্রাসা যেমন ভালোভাবে শিশুদের নিরাপত্তা দিতে পারে, তেমনিভাবে একটি সাধারণ স্কুল বিষয়টিতে ব্যর্থ হতে পারে। আবার উল্টোটাও ঘটতে পারে।

তাই প্রতিষ্ঠানটি ধর্মীয় কি না, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো: সেখানে ক্ষমতার ভারসাম্য কেমন? অভিযোগ জানানোর স্বাধীনতা আছে কি না? প্রতিষ্ঠান কতটা স্বচ্ছ? এবং শিশুর নিরাপত্তাকে সুনামের ওপরে রাখা হয় কি না?

Spotlight আমাদের শেষ পর্যন্ত একটি অস্বস্তিকর শিক্ষা দেয়, অপরাধীকে শুধু খুঁজে বের করা যথেষ্ট নয়। জানতে হবে, কেন এতদিন কেউ তাকে থামাতে পারেনি। কিংবা থামানোর জন্য কী করা হয়েছে?

Boston-এ সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে The Boston Globe-এর সাংবাদিকরা দেখেছিলেন চার্চ, প্রশাসন, আদালত, পরিবার, আইনজীবী এবং সংবাদমাধ্যম—সর্বোপরি পুরো সিস্টেম কীভাবে বৃহত্তর নীরবতার অংশ হয়ে উঠেছিল।

বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এখানেও মাদ্রাসা, এর সঙ্গে জড়িত প্রশাসন, নিপীড়িত ছাত্রের পরিবার এবং Spotlight-এ উল্লেখিত সামাজিক উপাদানগুলো বৃহত্তর নীরবতার অংশ হয়ে উঠতে পারে।

এখানেও একইভাবে এসব বিষয় নিয়ে আলাপ তোলা হলেই ধর্মীয় নেতা কিংবা বক্তারা বিষয়টি চেপে যান অথবা ইনিয়ে-বিনিয়ে সাফাই গেয়ে ফেলেন। আর ঘটনা যিনি ঘটিয়েছেন, তিনি দোষ দেন শয়তানের।

কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যায়—

সিস্টেমের মধ্যে ভূত রেখে শুধু শয়তানের ওপর দায় চাপালেই কি সামাজিক এই ব্যাধির সমাধান হবে?

২৮ পঠিত ... ২৩ ঘন্টা ২৯ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top