মাসুদ কি শেষ পর্যন্ত ভালো হয়েই গেলেন?

৯০ পঠিত ... ২৩ ঘন্টা ৩৭ মিনিট আগে

আজকে একটা জিনিস নিয়ে কথা বলা যাক। আমাদের অতি-আধুনিক, ডিজিটাল বাংলাদেশের অতি পরিচিত এক নাম: মাসুদ।

ইদানীং জেনজি প্রজন্মের অনেকেই খুব মজা করে বলে,
ভালো হয়ে যাও মাসুদ, ভালো হয়ে যাও!

তারপর হা-হা রিয়েক্ট, একটা মিম, সঙ্গে একটা ভিডিও। ব্যস! সবাই মনে করে পপ-কালচারের বিশাল একটা জ্ঞান অর্জন হয়ে গেল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই জেনজি কি আসলেই জানে মাসুদ কে? তারা কি জানে, এই ভালো হয়ে যাও মাসুদ কোনো সাধারণ ফানি ডায়লগ না? এর পেছনে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র, রাজনীতি আর ক্ষমতার একেবারে দেশি ভার্সনের আজব এক গল্প।

অ্যালগরিদম আমাদের মিমটা দেখায়, কিন্তু মিমের পেছনের গল্পটা দেখায় না। তাই চলেন, আজকে একটু পুরোনো ফাইল খুলি।

গল্পের শুরু ২০১৭ সালে। জায়গা বিআরটিএর মিরপুর কার্যালয়। সেখানে হঠাৎ হাজির হলেন তৎকালীন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। ক্যামেরা আছে, সাংবাদিক আছে, জনতা আছে। আর জনতার অভিযোগেরও শেষ নেই। কারও ড্রাইভিং লাইসেন্স হচ্ছে না, কারও গাড়ির রেজিস্ট্রেশন আটকে আছে, দালালের দৌরাত্ম্য আছে, ঘুষের অভিযোগ আছে। মানে পুরো বিআরটিএ তখন একেবারে অভিযোগের হটস্পট।

আর ঠিক সেই সময় মন্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের গল্পের নায়ক, প্রকৌশলী মো. মাসুদ আলম, তখনকার বিআরটিএর উপ-পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং)। দেখতে শান্ত, মুখে মিষ্টি হাসি। যেন কিছুই হয়নি। মন্ত্রী সাহেব একসময় ঘুরে তাকালেন মাসুদের দিকে। তারপর এলো সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

মন্ত্রী বললেন, ভালো হয়ে যাও মাসুদ, ভালো হয়ে যাও। তোমাকে আমি অনেক সময় দিয়েছি। তুমি ভালো হয়ে যাও।

ব্যস! বাংলাদেশ পেল এক নতুন ডায়লগ। তবে মন্ত্রী সেখানেই থামেননি। তিনি আরও বলেছিলেন, মাসুদের ব্যবহার নাকি খুবই ভালো, মিষ্টি। কিন্তু সমস্যা হলো, সে যা করার, একটু ভেতরে ভেতরে করে।

এখানেই গল্পটা আরও মজার। কারণ সাধারণত কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যদি এত বড় অভিযোগ ওঠে, তাহলে আমরা ধরে নিই। এবার বুঝি ব্যবস্থা হবে। শাস্তি হবে, তদন্ত হবে, বদলি হবে, চাকরি যাবে, কিছু একটা হবে। কিন্তু বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রে গল্প সবসময় সেভাবে এগোয় না। এখানে কখনো কখনো প্রকাশ্যে ধমক খাওয়া আর ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাওয়া, এই দুই জিনিস এক না।

২০১৭ সালের সেই ভিডিও ভাইরাল হলো। মানুষ হাসল। মিম হলো। গান বানানো হলো। ভালো হয়ে যাও মাসুদ ঢুকে গেল লোকমুখে। কিন্তু মাসুদ? মাসুদ ঠিকই রয়ে গেলেন সিস্টেমের ভেতরে। আর এখান থেকেই শুরু হয় আসল গল্প। কারণ যে মাসুদকে ২০১৭ সালে প্রকাশ্যে বলা হয়েছিল,
তুমি ভালো হয়ে যাও। সেই মাসুদই পরবর্তী বছরগুলোতে আমলাতন্ত্রের সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে থাকলেন। খুলনা গেলেন। চট্টগ্রাম গেলেন।

আর তারপর?

২০২৬ সালে এসে আবার ঢাকায় ফিরে এলেন বড় চেয়ারে।

মানে, ২০১৭ সালে যে ঢাকায় দাঁড়িয়ে তাকে বলা হয়েছিল ভালো হয়ে যাও, প্রায় এক দশক পর সেই ঢাকাতেই তিনি ফিরে এলেন পরিচালক হয়ে! এখন একটু থামেন। একদিকে সেই মন্ত্রী, যিনি একদিন দাঁড়িয়ে মাসুদকে ভালো হওয়ার উপদেশ দিয়েছিলেন, রাজনীতির পালাবদলে আজ তিনি ক্ষমতার বাইরে। অন্যদিকে সেই মাসুদ, যাকে বলা হয়েছিল ভালো হয়ে যাও, তিনি দিব্যি সিস্টেমের ভেতর দিয়ে নিজের জায়গা ধরে রেখেছেন। তাহলে মাসুদ কি শেষ পর্যন্ত ভালো হয়ে গেলেন?

২০২২ সাল।মাসুদ আলমকে পদোন্নতি দিয়ে করা হলো খুলনা বিভাগীয় পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং)।

একবার ব্যাপারটা খেয়াল করেন। ২০১৭ সালে যাকে নিয়ে মন্ত্রী নিজে প্রকাশ্যে অভিযোগের কথা বলেছিলেন, কয়েক বছর পর সেই কর্মকর্তাই একটা পুরো বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে।

বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের এই জায়গাটাই আসলে মজার। এখানে একটা ভাইরাল ভিডিও আপনার চাকরি খেয়ে ফেলবে; এমন কোনো গ্যারান্টি নেই। বরং আপনি যদি সিস্টেমের ভেতরে টিকে থাকতে পারেন, সময়ের সঙ্গে অনেক কিছুই বদলে যেতে পারে। মাসুদের ক্ষেত্রেও সেটাই হলো।

খুলনা অধ্যায় শেষ করে ২০২৪ সালের মার্চে তিনি চলে গেলেন চট্টগ্রামে। দায়িত্ব পেলেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালকের। মানে ২০১৭ সালের সেই মিরপুর অফিস থেকে শুরু করে কয়েক বছরের মধ্যে খুলনা, তারপর চট্টগ্রাম—মাসুদের ক্যারিয়ার দিব্যি নিজের গতিতে চলতে থাকল।

তারপর এলো আগস্ট ২০২৪। দেশের রাজনীতিতে এমন একটা পরিবর্তন হলো, যেটা কয়েক মাস আগেও অনেকে কল্পনা করতে পারেনি। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ক্ষমতার পালাবদল হলো। আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলো। সেই ওবায়দুল কাদেরই ক্ষমতার পালাবদলের পর দেশ ছাড়লেন।

একদিকে মন্ত্রীর রাজনৈতিক অধ্যায়ের পতন। অন্যদিকে? মাসুদ তখনও সিস্টেমের ভেতর। এটাই সম্ভবত এই গল্পের সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং জায়গা। কারণ রাজনীতিতে সরকার বদলেছে, মন্ত্রী বদলেছে, ক্ষমতার কেন্দ্র বদলেছে—কিন্তু আমলাতন্ত্রের চাকাটা নিজের মতোই ঘুরতে থেকেছে। আর সেই চাকায় মাসুদও দিব্যি চড়ে আছেন।

এরপর আসে ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি হলো। চট্টগ্রাম থেকে মো. মাসুদ আলমকে বদলি করে আনা হলো ঢাকায়। পদ—ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং)। অর্থাৎ, যে ঢাকার মিরপুর অফিসে দাঁড়িয়ে ২০১৭ সালে তাকে বলা হয়েছিল। ভালো হয়ে যাও মাসুদ! প্রায় নয় বছর পর সেই ঢাকাতেই তিনি ফিরে এলেন আরও গুরুত্বপূর্ণ পদে।

এবার একটু সিনেমার মতো করে চিন্তা করেন।

২০১৭:
মন্ত্রী: ভালো হয়ে যাও মাসুদ।

২০২৪:
মন্ত্রী: বিদায়।

২০২৬:
মাসুদ: ঢাকায় কামব্যাক।

এটা কি রিভেঞ্জ? নাকি কাকতালীয়? নাকি বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের স্বাভাবিক নিয়ম? সেটা যার যার ব্যাখ্যা। তবে একটা জিনিস পরিষ্কার। মাসুদকে সময় হারাতে পারেনি। রাজনীতি তাকে সরায়নি। ভাইরাল ভিডিও তাকে সরায়নি। সরকারের পরিবর্তনও তাকে সিস্টেমের বাইরে ঠেলে দেয়নি। বরং শেষ পর্যন্ত তিনি ফিরে এসেছেন সেই ঢাকাতেই।

৯০ পঠিত ... ২৩ ঘন্টা ৩৭ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top