ক্ষমতাসীন বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনায় সফল দেখতে চাই। দেশের মানুষ ভোট দিয়ে তাদের এই দায়িত্ব দিয়েছে। জনমানুষের আস্থার মূল্যায়ন করা তাদের কর্তব্য।
শপথ গ্রহণের দিনই বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন আহমেদ যখন ‘গণভোট’-এর রায়কে অগ্রাহ্য করে তারা কেবল সংসদ নির্বাচনের ফলাফল উপভোগ করবেন, এটা স্পষ্ট করলেন, জনগণ তখন প্রতারিত বোধ করল। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে এই অনীহা বিএনপির ক্রেডিবিলিটির জন্য ক্ষতিকর হবে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের পরিশীলিত আচরণ সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। কিন্তু সংসদে ফজলুর রহমান, মনিরুল হকদের অচল কথামালা দিয়ে প্রতিপক্ষকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার বহুব্যবহারে জীর্ণ পদ্ধতিতে হেসে হেসে সায় দেওয়ায়, উনার ব্যক্তিগত শালীন আচরণের সঙ্গে দলীয় কতিপয় সাংসদের অশালীন আচরণ যে উনার প্রশ্রয়েই চলছে, তা স্পষ্ট হয়ে গেল।
২০২৪-এর জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে এরকম পশ্চাদপদ রাজনীতি কেউ প্রত্যাশা করেনি।
প্রতিপক্ষকে তুচ্ছ করার এই সিগন্যাল জাতীয় সংসদে কতিপয় সাংসদের কাছ থেকে পেয়ে যাওয়ার পর, ছাত্রদল-যুবদল মিছিলে মিছিলে প্রতিপক্ষকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে শুরু করল। আর টিভি টকশোতে ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর বিএনপি হয়ে ওঠা দুধের মাছি ভনভন করতে শুরু করল।
হাসিনা পড়ে গেলেও ইন্ডিয়ান কালচারের উপনিবেশ রয়ে যাবে, এই আশা বুকে বেঁধে ৫ আগস্টের ঠিক আগে আগে যারা জুলাই মিছিলে যুক্ত হয়েছিল, ৫ আগস্টের পর তারা বিএনপির কোলে উঠে গেরুয়া আশা বাঁচিয়ে রাখতে চেষ্টা করেছিল। এ কারণেই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারা বিএনপিকে ভোট দিয়েছিল।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিএনপি যেসব তকমার ভিক্টিম হয়েছে, সেইসব তকমাগুলো গেরুয়া কালচারাল উইংকে কোলে নিয়ে বিএনপির অনেক অ্যাক্টিভিস্ট তাদের নতুন প্রতিপক্ষকে দিয়েছে। ফেসবুকে দেখবেন, বিএনপির কিছু সমর্থক হুবহু আওয়ামী লীগ সমর্থকদের টোনে ও শব্দে তকমা দেয়।
প্রতিবেশী যেহেতু বদলানো যায় না, তাই প্রতিবেশীর মনপছন্দ কিছু লোক বিএনপির মন্ত্রিসভায় রয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে এই লোকগুলোর ব্যবসা-বাণিজ্য, যাপিত জীবনে তেমন কোনো আঁচ লাগেনি। বরং অনেকের সম্পদ বহুগুণ বেড়েছে।
এখানে উল্লেখ্য যে, জামায়াতের নেতৃত্বের মাঝেও ইন্ডিয়ার উপনিবেশের বিরুদ্ধে কুসুম কুসুম প্রতিবাদের বেশি কিছু নেই। ঐ যে মিথ, প্রণব মুখার্জি চেয়েছিলেন বলেই ওয়ান-ইলেভেনের সর্দারদের সঙ্গে শলা করে হাসিনাকে ক্ষমতায় এনেছিলেন, ঐ মিথের ভীতি বিএনপির মতো জামায়াতের মধ্যেও আছে। বুমারস, জেনেক্স ও সিনিয়র মিলেনিয়ালদের মাঝে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারের প্রতি সমীহ তাদের ডিএনএ-তে পরিবাহিত। এরা হচ্ছে বাংলা চলচ্চিত্রের সেই দুর্বলচিত্ত পিতা আনোয়ার হোসেনের মতো, যে তার স্ত্রীকে বলে, ‘আমেনার মা, তোমার ছেলেকে তুমি চৌধুরী সাহেবের সঙ্গে লাগতে নিষেধ করো। চৌধুরী সাহেব অনেক শক্তিশালী, তার শক্তির সঙ্গে আমরা পারব না।’
এই মানসিক দুর্বলতার কারণে ইন্ডিয়া তার গেরুয়া আদর্শে গড়া আওয়ামী লীগের মাধ্যমে ১৭ বছর ঘুঘু চরিয়েছে বাংলাদেশে। তারা প্রমাণ করেছে, ইন্ডিয়ায় যেভাবে হিন্দুত্ববাদীরা সংখ্যালঘু মুসলমানের ভাগ্যনিয়ন্তা হয়েছে, বাংলাদেশেও গেরুয়া প্রগতিশীল কালচারাল উইং, মিডিয়া, পুলিশ-সেনা কর্মকর্তা দিয়ে সংখ্যাগুরু মুসলমানের ভাগ্যনিয়ন্তা হওয়া যায়।
জুনিয়র মিলেনিয়াল, জেনজি ও জেন আলফা ভৌগোলিক ও কালচারাল সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপসহীন বলেই ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লবটি সম্ভব হয়েছিল। বাংলাদেশের জনগণ তাই সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কেবল তাদের ওপরেই নির্ভর করে।
আওয়ামী লীগ দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে গেছে; জ্বালানি খাতকে আদানির উপনিবেশের প্রজা করে রেখে গেছে। এই অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ানো সহজ হতো, যদি ২০২৪-এর ৬ আগস্ট থেকে বিএনপির ক্যাডারেরা আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য দখল করে লুণ্ঠন চালিয়ে না যেত। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দ্বিদলীয় চাঁদাবাজির যে পলিটিক্যাল ডকট্রিন তৈরি হয়েছিল, তা ক্লাসে ফেল করা ছাত্রদের নতুন জমিদার হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে চাঁদাবাজি, টেন্ডার-বাণিজ্য, প্রকল্পের কমিশন-বাণিজ্যকেই সাফল্যসূত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
বাংলাদেশের কৃষক, দেশি-প্রবাসী শ্রমিক, মেহনতি মানুষ উদয়াস্ত পরিশ্রম করে উপার্জন করবে; আর আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ক্লাসে ফেল করা ক্যাডার সেই অর্থ লুণ্ঠন করে বিদেশে পাচার করবে। এই দুষ্টচক্রে দেশ আটকে থাকায় ক্ষমতাসীন বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষে দেশের অর্থনৈতিক ও জ্বালানি খাতের পঙ্গুত্ব কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হচ্ছে না।
চাঁদাবাজ দলীয় ক্যাডার কিংবা ঘুষখোর পুলিশ, তাদের ক্ষমতাসীন দলের নেতার প্রতি আনুগত্য প্রকাশের ও পদপূজা করার ভাষা মোটামুটি একই। কোথায় কে সরকারি নেতাকে গালি দিয়েছে, তা খুঁজে বের করে গালিবাজ লোকটাকে গ্রেপ্তার করে কোর্টে চালান করা। প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেট, আদালতের বিচারক ক্ষমতাসীন দলের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে বোধবুদ্ধি বিসর্জন দিয়ে গালিবাজ লোকটাকে কারাগারে প্রেরণ করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে।
ক্ষমতাকাঠামোর দোর্দণ্ড প্রতাপের সামনে উপায়হীন নাগরিকের প্রতিবাদের একমাত্র ভাষাই গালাগাল। ইউরোপের কল্যাণরাষ্ট্রগুলোতে কোনো নেতাকে গালি দেওয়ার কারণে গ্রেপ্তারের প্রয়োজন পড়ে না। বরং নাগরিক যে বিষয়ে ক্ষুব্ধ, সেই সমস্যার সমাধানই সুশাসনের চর্চা। ব্রিটিশ রাজবংশ, সুইডিশ রাজবংশের লোক নাগরিকের অসংখ্য গালি খেয়েছে। কিন্তু গণতান্ত্রিক সমাজকাঠামোতে রাজার ভৃত্য কিংবা পুলিশ নাগরিকদের গ্রেপ্তার করেনি। দক্ষিণ এশিয়ায় রাজবংশ না থাকলেও কাল্পনিক রাজবংশের আকাঙ্ক্ষা আছে ভৃত্য ও পুলিশের। এ কারণেই ভ্যাড়ভেড়ে গোবিন্দপুর হয়ে রয়ে গেল এই অঞ্চলটি।
যেভাবেই হোক বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনায় সফল হতে হবে। সেক্ষেত্রে ২০২৪-এর জুলাই-পূর্ববর্তী গাজোয়ারি পলিটিক্যাল কালচার বদলাতে হবে। আওয়ামী লীগের স্টাইলে রাজপথে, টকশোতে, সংসদে ঘেউ ঘেউ ছেড়ে দিয়ে প্রতিপক্ষকে তুচ্ছ করার গোপালী কালচার পরিত্যাগ করতে হবে।
দেশের মানুষ সুশাসন দেখতে চায় ভাতের থালায়, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানি সরবরাহে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, হাসপাতালে, চাঁদামুক্ত জীবিকায়, ঘুষমুক্ত সরকারি সেবায়, বাক্স্বাধীনতায়, ভোট দেওয়ার অধিকারে, নারী ও শিশুর নিরাপত্তায়, স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টিতে।
ন্যারেটিভে কিছু এসে যায় না। বাংলাদেশের ন্যারেটিভ নির্মাতা গেরুয়া প্রগতিশীলদের দেশের জনগণ এতটুকু বিশ্বাস করে না। ফলে তাদের চিংড়ি-লাউ কিংবা টক দই খাইয়ে লাভ নেই। পত্রিকার উপসম্পাদকীয় এখন ব্যবহৃত হয় গরম সিঙ্গারা ঠান্ডা করার কাজে। টকশো এখন স্ট্যান্ড-আপ কমেডির মতো বিনোদন দেয়।
আওয়ামী লীগের সিপি গ্যাংয়ের হাত ধরে যৌক্তিক কথা না বলে ‘মুখে যা আইল, কইলাম’, তা বলতে শিখেছে নতুন প্রজন্ম। গালাগালের মাঝে কৃতিত্ব কিংবা স্মার্টনেস নেই। বাবা-মা হয়তো ভদ্র ভাষায় কথা বলেন, কিন্তু ছেলেমেয়ে সিপি গ্যাংয়ের কাছে গালি দেওয়া শিখেছে; কিন্তু কোনো তরুণ-তরুণীকে গালি দিতে দেখলে লোকে ধারণা করে, এদের মা কলতলার গালিবাজ কিংবা বাবা গরুর হাটের গালিবাজ।
অথচ জুলাই বিপ্লব গালি দিয়ে হয়নি; হয়েছে সুপরিকল্পনার মাধ্যমে। এই যে জুলাই বিপ্লবের নেতা নাহিদ, মাহফুজ, আসিফ, হাসনাত, আখতার প্রমুখ, তাদের কখনো গালি দিতে দেখেছেন! টকশোতে তুষার, ফরিদুর, মনিরা, মোস্তাফিজ প্রমুখ এনসিপির বক্তারা শক্তিশালী যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করে, শব্দচয়নে সচেতন থেকে। নাসির তার বক্তব্যে রস সঞ্চারে যতটুকু অসাংবিধানিক শব্দ ব্যবহার করে, তা থ্রি ইডিয়টস মুভিতে ব্যবহৃত স্ল্যাংয়ের পরিসীমা মেনে চলে।
কাজেই গালাগাল না করেও শক্তিশালী প্রতিবাদ করা যায়; এর প্রমাণ আমাদের চোখের সামনেই রয়েছে।
লেখার শেষে সরকারদলীয় বিএনপি, বিরোধীদলীয় জামায়াত ও জুলাই বিপ্লবীদের দল এনসিপির সাফল্য প্রত্যাশা করছি।



পাঠকের মন্তব্য