১
‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বনাম বাংলাদেশের ‘জুলাই আন্দোলন’।
একদিকে একদল ভারতীয় তরুণ, যাদেরকে এক মান্যবর বিচারপতি ভালোবেসে ‘তেলাপোকা’ বলে ডেকেছিলেন, আর তারা সেই আত্মমর্যাদায় আঘাত খেয়ে আস্ত একটা দল গঠন করে ফেলল—‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)! অন্যদিকে, বাংলাদেশের চব্বিশের জুলাই, যা দেখতে দেখতে কোটা সংস্কারের নিরীহ গণ্ডি পেরিয়ে এক মহাকাব্যিক গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিল।
বাহ! আপাতদৃষ্টিতে কী চমৎকার মিল!
দুই প্রান্তেই ফুটন্ত রক্ত, হাতে স্মার্টফোন, চোখে ক্ষোভ আর মুখে রাষ্ট্রব্যবস্থার মুখে ঝামা ঘষে দেওয়ার তাগিদ। সোশ্যাল মিডিয়ার স্ক্রোলে একের পর এক ভাইরাল ভিডিও ভেসে আসছে, হ্যাশট্যাগের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে শাসকদলের আইটি সেল। একদল লোক তো ক্যাফেতে বসে এ ওর কাঁধে হাত রেখে বলেই ফেললেন, দেখলে ভাই? জেন-জির কী মহিমা! সিস্টেমকে একদম হুল ফুটিয়ে দিচ্ছে!
কিন্তু এই যে ‘উপরে উপরে মিল দেখে ফালাফালা হওয়া’—এটা বাঙালির এক অতি প্রাচীন এবং মারাত্মক ব্যাধি। জোড়া কাঠাল দেখলেই যেমন আমরা ভাবি ভেতরের সব কোয়া একরকম মিষ্টি হবে, ঠিক তেমনি দুটো তরুণ আন্দোলন দেখলেই আমরা ধরে নিই তাদের নাড়ি কেটে একই পাত্রে রাখা হয়েছে।
অথচ একটু গভীরে চোখ রাখলেই বোঝা যায়—পার্থক্যটা আকাশ আর পাতালের।
ভারতের CJP আন্দোলনটি কী? এটি মূলত ব্যঙ্গাত্মক, কিছুটা স্পর্ধিত এবং বিপুল পরিমাণে ইস্যুভিত্তিক এক ডিজিটাল প্রতিবাদ, যা ধীরে ধীরে রাজপথের ধুলোবালি স্পর্শ করেছে। বেকারত্ব আর পরীক্ষা ব্যবস্থার গাফিলতি নিয়ে ক্ষোভ থাকাটা স্বাভাবিক, কিন্তু সেই ক্ষোভ প্রকাশের পেছনে রয়েছে একধরনের শহুরে, ডিজিটাল নাগরিক রসিকতা। রাষ্ট্র এখানে জল কামান চালায়, টিয়ার গ্যাস ছোড়ে, কয়েকজনকে থানায় নিয়ে গিয়ে চা-বিস্কুট খাইয়ে (বা না খাইয়ে) জামিনও দিয়ে দেয়।
কিন্তু বাংলাদেশ? উফ! ওখানকার গল্পটা তো অন্য কোনো ধাতুতে তৈরি।
ওটা কোনো মিষ্টি ব্যঙ্গচিত্র ছিল না, ওটা ছিল দীর্ঘ ১৫ বছরের চেপে রাখা শ্বাসরুদ্ধকর এক রাষ্ট্রীয় স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে মানুষের বেঁচে থাকার আর্ত চিৎকার। ওখানে ক্ষোভ কেবল কোনো মন্তব্যের উত্তর দিতে রাজপথে নামেনি; নেমেছিল বছরের পর বছর গুম, ভোটাধিকার হরণ আর বিচারহীনতার যে পাহাড় জমেছিল, তা উপড়ে ফেলতে।
যারা এই দুটোকে একই দাঁড়িপাল্লায় মেপে ভাবছেন আহা, দুই দেশেই তো ছেলেপুলে গর্জে উঠেছে, তারা আসলে ক্রাউড কন্ট্রোলের টিয়ারগ্যাস আর বুকে তাজা গুলি চালানোর পার্থক্যটা বোঝেন না।
২
প্রথমেই আসি সেই অমোঘ সত্যে—সহিংসতার পরিমাপ।
ধরুন, আপনি রাজপথে একটা প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে চেঁচাচ্ছেন, আমরা তেলাপোকা নই, আমরা বেকার! ওদিকে পুলিশ এসে আপনার দিকে একটু টিয়ার গ্যাস ছুড়ল, সামান্য জলকামান মারল, আর বেশি লাফাল তো লাঠি উঁচিয়ে একটা সপাটে দিল। ব্যস, জল গড়াল থানায়, সেখানে কয়েক ঘণ্টা বসিয়ে রেখে, উকিলের সামান্য গুঁতোয় জামিন হয়ে আপনি আবার বাড়ি ফিরে মালাই চা খেতেন লাগলেন। ভারতের ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজিপি-র আন্দোলনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়াটা ঠিক এই স্তরের—যা সাধারণ, ট্র্যাডিশনাল ‘ক্রাউড কন্ট্রোল’-এর বইতে লেখা থাকে।
কিন্তু চব্বিশের জুলাইয়ে বাংলাদেশে রাষ্ট্র কী করল?
ওখানে রাষ্ট্র কোনো নিয়মপুস্তকের তোয়াক্কা করেনি। সেখানে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি আর শাসকদলের হেলমেট পরা পাণ্ডারা মিলে রাষ্ট্রকে বানিয়ে ফেলল একটা উন্মুক্ত শিকারভূমি। আকাশে হেলিকপ্টার, নিচে সাঁজোয়া যান, আর হাতে তাজা গুলির মারণাস্ত্র। ছাদে খেলাধুলো করা বারো বছরের বাচ্চার বুক ফুঁড়ে চলে গেল বুলেট, রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা ছাত্রের চোখ ঝাঁঝরা হয়ে গেল পেলেট গানে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন বা বিভিন্ন হিসেব বলছে—এক মাসের ব্যবধানে প্রায় ১,০০০ থেকে ১,৪০০ মানুষের জীবন স্রেফ হাওয়া হয়ে গেল। ভাবুন একবার! ১,৪০০ জীবন! এটি কোনো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা নয়, এটি হলো রাষ্ট্র কর্তৃক নিজের নাগরিকদের বিরুদ্ধে ঘোষিত গণহত্যা।
দ্বিতীয় মারাত্মক ফারাকটা হলো গুম বা Enforced Disappearance-এর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহার।
ভারতে আপনি মোদি সরকারের তীব্র সমালোচনা করে রিল বানাতে পারেন, রাস্তায় নেমে খিস্তি দিতে পারেন—সর্বোচ্চ আপনার নামে হয়তো দেশদ্রোহিতার আইনি ধারায় মামলা ঝুলিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু রাতের অন্ধকারে কালো কাঁচের গাড়ি এসে আপনাকে তুলে নিয়ে যাবে, পরিবারের লোক বছরের পর বছর আপনার জামাকাপড় শুঁকে কাঁদবে, অথচ রাষ্ট্র বলবে আমরা তো ওকে চিনিই না!—এই বিভীষিকা অন্তত মোদি মডেলের মূল ভিত্তি হয়ে ওঠেনি।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে ১৫ বছর ধরে এই গুম সংস্কৃতিকে রাষ্ট্রের প্রধান হাতিয়ার বানিয়ে রাখা হয়েছিল। ডিজিএফআই বা ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের গোপন আইনাঘরগুলো ছিল সেই ব্যবস্থার কঙ্কাল। জুলাই আন্দোলনের সময়ও ছাত্রনেতাদের হাসপাতাল বা রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে আড়ালে রেখে দেওয়া হয়েছিল। রাষ্ট্র এখানে শুধু মানুষকে মারে না, মানুষকে ‘নাই’ করে দেয়।
সংক্ষেপে বললে, ভারতের রাষ্ট্রযন্ত্র যেখানে কেবল কিছুটা নিষ্ঠুর ও উদ্ধত, বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রযন্ত্র সেখানে হয়ে উঠেছিল পুরোপুরি এক হিংস্র, পশুতুল্য হত্যাযন্ত্র।
যারা এখনো দূরবীনে চোখ রেখে বলবেন, দূর মশাই, দুটোই তো এক!—তাদেরকে বলি, কয়েক ডজন আহত হওয়া আর হাজারখানেক লাশের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা আন্দোলনের পার্থক্য যদি আপনি না বোঝেন, তবে আপনার রাজনৈতিক বিবেচনার জায়গায় কোনো এক অদৃশ্য টিয়ারগ্যাস ঢুকে বসে আছে!
কিন্তু প্রশ্ন হলো—কেন? মোদি কেন চাইলেও ‘হাসিনা’ হয়ে উঠতে পারলেন না? ভারতের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ঠিক কোন খাঁজগুলো তাঁকে এই চরম স্বৈরাচারী রূপ নিতে বাধা দিল?
৩
ভারতের অনেক বুদ্ধিজীবী পরম আনন্দে মোদিকে স্বৈরাচার বলে গালি দেন। অভিযোগের তালিকাও নেহাত ছোট নয়—গণমাধ্যমকে হাতের মুঠোয় নেওয়া, বিরোধী নেতাদের পেছনে কেন্দ্রীয় সংস্থাকে লেলিয়ে দেওয়া, সংখ্যালঘু দমন কিংবা প্রতিবাদী কণ্ঠকে কোণঠাসা করা। কিন্তু ওই পর্যন্তই! মোদি ক্ষমতার চূড়ায় বসে থেকেও শেখ হাসিনার সেই ‘বিনা বাক্যব্যয়ে হত্যা ও গুম’ করার মডেলে পৌঁছাতে পারেননি।
কেন পারেননি? সেটা মোদির মহানুভবতা নয়, বরং ভারতীয় রাষ্ট্রযন্ত্রের অভ্যন্তরীণ কিছু বাধ্যবাধকতা।
প্রথমত, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক পতন।
হাসিনা মডেলের মূল কৌশল ছিল রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গকে দলীয় কার্যালয়ে পরিণত করা। বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে নির্বাচন কমিশন, পুলিশ থেকে শুরু করে প্রশাসন—সব জায়গায় স্রেফ আনুগত্য বিকিয়ে দেওয়া লোকদের বসানো হয়েছিল। ফলে রাষ্ট্র হয়ে উঠেছিল একচ্ছত্র এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তি।
২০২৪-এর জুলাইয়ে যখন তিনি নিজের দেশের নাগরিকদের ওপর লাইভ বুলেট ব্যবহারের নির্দেশ দিলেন, তখন সেই রাষ্ট্রযন্ত্রের কেউ তাঁকে ‘না’ বলার সাহস দেখায়নি।
ভারতে মোদি ক্ষমতাবান ঠিকই, কিন্তু নির্বাচন ব্যবস্থা এখনো যথেষ্ট প্রতিযোগিতামূলক। মোদি কেন্দ্রে একচ্ছত্র রাজত্ব করলেও রাজ্যে রাজ্যে বিরোধীরা ক্ষমতায় আসছে, তাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। আর বিচার বিভাগ পুরোপুরি বশীভূত নয়। ভারতের কোনো পুলিশ বাহিনী যদি রাতারাতি রাজপথে এক হাজার তরুণকে গুলি করে মেরে ফেলার স্বপ্ন দেখে, তবে পরদিনই সুপ্রিম কোর্টের হাতুড়ির ঘা আর মিডিয়ার কাঠগড়ায় পুরো রাষ্ট্রকাঠামো কাঁপতে শুরু করবে।
দ্বিতীয়ত, সেনাবাহিনীর ভূমিকা এবং ক্ষমতার শেষ সীমা।
বাংলাদেশে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত মুহূর্তটা এসেছিল তখন, যখন রাষ্ট্রযন্ত্রের শেষ রক্তচক্ষু হিসেবে সেনাবাহিনী নিজের দেশের জনগণের ওপর গুলি চালাতে অস্বীকার করল। অর্থাৎ, রাষ্ট্রকে এমন এক চরম হিংস্রতার মোড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, যার পর আর শাসন করার মতো কোনো ভিত্তি অবশিষ্ট থাকে না।
ভারতে সিজিপি (CJP)-র তরুণরা যখন রাস্তায় নামল, পুলিশের সাধ্য ছিল লাঠি উঁচিয়ে টিয়ারগ্যাস ছোড়া, জলকামান চালানো আর দু-চারজনকে গ্রেপ্তার করা। কারণ, ভারতে কোনো ‘র্যাব’ টাইপের বাহিনী তৈরি হয়নি, যাকে দিয়ে রাতারাতি রাজনৈতিক বিরোধীদের স্রেফ ভ্যানিশ করে দেওয়া যায়। ভারতের শাসনব্যবস্থা কঠোর হতে পারে, কিন্তু তা কসাইখানা হয়ে ওঠার ছাড়পত্র পায় না।
তাহলে কি মোদির ভারতের গণতন্ত্র একদম দুধেধোয়া তুলসীপাতা? একেবারেই নয়। সেখানে চাপ আছে, ভীতি আছে, গভীর সংকট আছে।
কিন্তু ককরোচ জনতা পার্টি আর বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলন-এর তুলনামূলক বিচার করতে বসে যারা ভাবেন দুটোই এক জিনিস, তারা আসলে মোদির ‘কঠোর শাসন’ আর হাসিনার ‘রাষ্ট্রীয় গণহত্যা’-র ফারাকটা বুঝতে মারাত্মক ভুল করেন।
একটা হলো ব্যবস্থার ভেতরে থেকে অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার এক চতুর ডিজিটাল লড়াই। অন্যটি হলো পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়া এক জাতির রক্ত দিয়ে স্বৈরাচারের শিকড় উপড়ে ফেলার মহাকাব্যিক রূপকথা।
পার্থক্যটা কেবল মৃতের সংখ্যার নয়, পার্থক্যটা রাষ্ট্রের চরিত্রের। মোদি কোনোদিন পূর্ণাঙ্গ ‘হাসিনা’ হতে পারেননি, আর ভারতীয় তরুণদেরও আপাতত জুলাইয়ের মতো রক্তনদী পার হয়ে স্বাধীনতা খুঁজতে হয়নি। ইতিহাস এই পার্থক্যটুকু বড় নিষ্ঠুরভাবে মনে রাখবে।



পাঠকের মন্তব্য