ইউরোপের শীর্ষ ফুটবল দলগুলোতে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের উপস্থিতি এখন খুবই পরিচিত একটি দৃশ্য। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস কিংবা বেলজিয়ামের জাতীয় দলে বিভিন্ন অভিবাসী পরিবারের সন্তানদের নিয়মিত দেখা যায়। তবে এশিয়ার দেশগুলোতে, বিশেষ করে জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় দলে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত খেলোয়াড় এখনো তুলনামূলকভাবে বিরল।
সাম্প্রতিক জাপান বনাম ব্রাজিল ম্যাচে এমনই এক বিরল দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছেন ফুটবলপ্রেমীরা। এই ম্যাচে জাপানের গোলপোস্টে দায়িত্ব পালন করেন গোলরক্ষক জিওন সুজুকি (Zion Suzuki)। তার চেহারা দেখে অনেক দর্শক অবাক হলেও, বাস্তবে জাপানই তার মাতৃভূমি এবং তিনি নিজেকে একজন জাপানি হিসেবেই পরিচয় দেন।
জিওন সুজুকির জন্ম যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে। তবে জন্মের কিছুদিন পরই তিনি পরিবারের সঙ্গে জাপানে চলে আসেন। জাপানের সাইতামা প্রিফেকচারেই তার বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা এবং ফুটবল ক্যারিয়ারের ভিত্তি গড়ে ওঠে। তার মা একজন জাপানি, আর বাবা একজন ঘানাইয়ান বংশোদ্ভূত আমেরিকান। মায়ের সূত্রে তিনি জন্মগতভাবেই জাপানি নাগরিকত্ব লাভ করেন। ফলে জাতীয় দল বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে জাপান তার জন্য স্বাভাবিক একটি পছন্দ ছিল।
শুধু নাগরিকত্ব নয়, সুজুকির পুরো ফুটবল ক্যারিয়ারই জাপানকে ঘিরে। তিনি দেশটির অন্যতম সফল ক্লাব উরাওয়া রেড ডায়মন্ডসের যুব একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। সেখান থেকেই একজন পেশাদার গোলরক্ষক হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলেন। এরপর অনূর্ধ্ব-১৫ দল থেকে শুরু করে জাপানের প্রায় সব বয়সভিত্তিক জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন। দীর্ঘদিন ধরে জাপানের ফুটবল কাঠামোর অংশ হওয়ায় জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তোলার পথও তার জন্য স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়।
ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, জিওন সুজুকির সামনে একাধিক জাতীয় দলের হয়ে খেলার সুযোগ ছিল। জন্মস্থান হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে খেলতে পারতেন। আবার বাবার সূত্রে ঘানার প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগও ছিল। তবে ছোটবেলা থেকেই জাপানের সমাজ, সংস্কৃতি, ভাষা এবং ফুটবল ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থাকায় তিনি শেষ পর্যন্ত জাপানের জাতীয় দল 'সামুরাই ব্লু'-এর হয়েই খেলার সিদ্ধান্ত নেন।
জাতীয় দলের পাশাপাশি ক্লাব ফুটবলেও জিওন সুজুকি নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। বর্তমানে তিনি ইতালির ক্লাব পারমার হয়ে গোলরক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। ইউরোপের প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে নিজের পারফরম্যান্সের মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে বিশ্বের অন্যতম সম্ভাবনাময় তরুণ গোলকিপার হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছেন।
জিওন সুজুকির গল্প শুধু একজন গোলকিপারের গল্প নয়; এটি আধুনিক ফুটবলে বৈচিত্র্য, বহুসাংস্কৃতিক পরিচয় এবং জাতীয় পরিচয়েরও একটি অনন্য উদাহরণ। তার পারিবারিক শিকড় একাধিক দেশে ছড়িয়ে থাকলেও, বেড়ে ওঠা, শিক্ষা এবং ফুটবল ক্যারিয়ার গড়ে উঠেছে জাপানেই। তাই জাপানের জার্সি গায়ে তার উপস্থিতি কোনো ব্যতিক্রম নয়, বরং বর্তমান বিশ্বের বহুসাংস্কৃতিক বাস্তবতারই একটি সুন্দর প্রতিফলন।



পাঠকের মন্তব্য