কথায় বলে, পাপে ছাড়ে না বাপেরে! আমার এই কাহিনির শুরুও এমন জায়গা থেকেই। যখন আমাদের ইয়াং ড্যাশিং দেবরাজ জিউস তাঁর খ্যাপাটে, অত্যাচারী বাপ ক্রনোসকে এক্কেবারে সাইজ করে ফেলে দুনিয়াকে দিলেন হাফ ছাড়ার সুযোগ, সেখানেই স্পটলাইট। বাপ তাঁর পাপ করে বেড়াচ্ছিলেন সারা দুনিয়া ভরে। ব্যস! দিলেন গদি থেকে নামিয়ে! হইহই যুদ্ধ, রইরই ব্যাপার!সময় তখন ৭৭৬ খ্রীস্টপূর্ব।
এরপর দেবরাজ জিউস যখন অলিম্পিয়ার সিংহাসনে বসলেন, তখন তাঁর চামচারা- আই মিন, পাত্র-মিত্রেরা, সভাসদরা বসল এক চরম বৈঠকে।
বৈঠকে আলাপের টপিক একটাই:
: মামা, নতুন বসের অভিষেকটা এমন হাইপড হতে হবে যেন পুরো দুনিয়া হাঁ হয়ে থাকে!
সবার মাথার ঠুকাঠুকিতে আইডিয়া ধাক্কা খেয়ে বেরিয়ে এলো,
: বস, একটা পবিত্র খেলার আয়োজন করা যাক।এন্টারটেইনমেন্টও হবে, আবার পাবলিকের মধ্যে মারামারিও কমবে।
জিউস আবার পুরাই শান্তিপ্রিয় পাবলিক। আইডিয়া শুনে তিনি ফিদা! বলে ফেললেন,
: জোশ আইডিয়া! ডান, খেলা হবে!
ব্যস, অলিম্পাস পর্বতের পাদদেশে শুরু হয়ে গেল এলাহী কাণ্ড। আর সেই পবিত্র পর্বতের নামেই এই ইভেন্টের নাম হয়ে গেল- অলিম্পিক গেমস।
কথা তো আজ-কাল-পরশুর নয়। সাদা-কালো যুগেরও আগের কথা। তখনকার দিনে গ্রীসের ছোট ছোট নগর-রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সারাক্ষণ ডগ বাইটিং মানে কুত্তা- কামড়াকামড়ি লেগে থাকত। কিন্তু অলিম্পিকের খাতিরে চালু হলো 'পবিত্র যুদ্ধবিরতি'। খেলা শুরুর তিন মাস আগে থেকেই সব গ্যাংস্টারগিরি, মারামারি, থাবড়া-থাবড়ির ওপর বসানো হল ফুলস্টপ! যাতে অ্যাথলেট আর দর্শকরা নিরাপদে অলিম্পিয়া আসতে পারে।
তো, প্রথমবার খেলা হয়েছিল মাত্র একদিনের। আর ইভেন্টটা কী ছিল জানেন? মাত্র ১৯২ মিটারের একটা দৌড় প্রতিযোগিতা!
পরে অবশ্য কুস্তি, বক্সিং, রথ চালানো- সব ডেঞ্জারাস ফাইটিংয়ের ব্যাপারগুলোকে খেলা বলে অলিম্পিকে ঢুকিয়ে দেয়া হলো। তবে সবচেয়ে মাথা নষ্ট করা ফ্যাক্ট কোনটা জানেন? খেলা যাই হোক না কেন, প্রতিযোগীগুলো এক্কেবারে 'নাগা বাবা'! মানে শরীরে তাদের এক ফালি সুতাও থাকত না, পুরাই এহেম এহেম! কারন কী? কারন গ্রিকদের লজিক ছিল- মানুষের সুগঠিত বডি নাকি ঈশ্বরের এ-ওয়ান পিস সৃষ্টি। তাই দেবতাদের সামনে কাপড় ছাড়া বডি শো-অফ করা নাকি এক ধরণের শ্রদ্ধা নিবেদন! হে হে!
আর ভাই, জেতার পর কিন্তু কোনো গোল্ড মেডেল-টেডেলের বালাই ছিল না। বিজয়ী হলেইধরিয়ে দেয়া হত মানে পরিয়ে দেয়া হত একটা জলপাই পাতার মুকুট। তাতেই বিজয়ী আশমানে!
দেবরাজের উদ্দেশ্যে সৃষ্ট এই ধর্মীয় উৎসব প্রায় এক হাজার বছর ধরে পুরাই ‘স্মুথলি’ চলছিল। কিন্তু মাঝখান দিয়ে রোমান সম্রাট থিওডোসিয়াস এসে সব গুড়ে বালি ঢেলে দিল। সে ভাবল,
: আরে ধুর! যতসব পুতুল-পূজারিদের ফালতু উৎসব!
ব্যস, এতেই অলিম্পিকের দুয়ারে তালা।
এরপর কেটে গেল দীর্ঘ দেড় হাজার বছর। উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এলেন ফরাসি এক ব্যারন- পিয়েরে দ্য কুবার্তা। লোকটার মাথায় ভূত চাপল,
: দুনিয়ার সব দেশের মধ্যে বন্ধুত্ব আর শান্তি বজায় রাখার জন্য গ্রীসের সেই পুরনো খেলাটা আবার চালু করতে হবে।
যেমন ভাবা তেমনি কাজ! ১৮৯৪ সালে ইন্টারন্যাশনাল অলিম্পিক কমিটি (IOC) গঠন করে ১৮৯৬ সালে গ্রীসের এথেন্সের পুরা শ্বেতপাথরের তৈরি প্যানাথেনাইক স্টেডিয়ামে তিনি বসিয়ে ফেললেন আধুনিক অলিম্পিকের প্রথম আসর!
প্রথম আধুনিক অলিম্পিকের সবচেয়ে হাইপড ইভেন্ট ছিল ম্যারাথন। নাকউচুঁ গ্রিকদের খুব ইচ্ছা ছিল, এই ঐতিহাসিক দৌড়টা যেন কোনো গ্রিকই জেতে।
আর হলোও ঠিক তাই! স্পিরিডন লুইস নামের এক গ্রীক পানি বিক্রেতা দৌড়ে ফাস্ট হয়ে রাতারাতি পুরাই সেলিব্রিটি! খুশিতে গ্রীসের যুবরাজ নিজেও তাঁর সাথে শেষ কয়েক মিটার দৌড়েছিলেন। ভাবা যায়?
গ্রীস আজও অলিম্পিকের গডফাদার! তাই তার রেস্পেক্টও সেই লেভেলেরই দেওয়া হয়, তার কোনো তুলনা নেই।
এখনো অলিম্পিক খেলা যে দেশেই হোক না কেন, মশাল কিন্তু সেই গ্রিসের প্রাচীন অলিম্পিয়া নগরী থেকেই সূর্যের আলো দিয়ে জ্বালানো হয়। ওখান থেকে রিলে করে হোস্ট দেশে আনা হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যখন সব দেশের প্লেয়াররা লাইন ধরে হাঁটে, সবার প্রথমে কিং সাইজ এন্ট্রি নেয় গ্রীস,সবসময়। আর হোস্ট দেশ থাকে সবার শেষে।
তা, এতক্ষণ ধরে অলিম্পিক নিয়ে এই যে এত জ্ঞান দিলাম, কেন জানেন? কারণ আজ ২৩ জুন, বিশ্ব অলিম্পিক দিবস!
তাই ভাবলাম একটু ইতিহাস ঘেঁটে আপনাদের সাথে প্যাচাল পেড়ে নেই আরকি!
রাগ করলা?



পাঠকের মন্তব্য