১
মানুষের জীবনটা একটা অদ্ভুত চাকা। ঘুরতে ঘুরতে কখন যে কোন জায়গায় এসে থামে, কেউ বলতে পারে না।
মাঝরাতে হুট করে আমার ঘুম ভেঙে যাওয়ার একটা বাতিক তৈরি হয়েছে। বয়স বাড়ছে কি না কে জানে। আমার বাবা যখন মাঝরাতে জেগে উঠতেন, দেখতাম খাটের ওপর পা ঝুলিয়ে গম্ভীর মুখে বসে আছেন। হয়তো দেশের অর্থনীতি, অফিসের ফাইল কিংবা আগামী মাসের বাজারের হিসাব মেলাচ্ছেন। ওনাদের চিন্তাভাবনা ছিল একদম সরলরেখার মতো। পড়াশোনা করো, চাকরি পাও, দায়িত্ব নাও, শেষ বয়সে বারান্দায় বসে খবরের কাগজ পড়ো।
আর আমি যখন এই জমানার একজন বাবা হিসেবে মাঝরাতে জাগি, আমার মাথায় কোনো জটিল হিসাব ঘোরে না। আমি সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ভাবি, আমাদের সময়কার সেই অ্যাস্থেটিক রিলসগুলো এখনকার বাচ্চারা দেখলে কি হাসাহাসি করবে?
সংসারে এই জেনারেশন গ্যাপ জিনিসটা ভারি চমৎকার। আমার দাদা যখন আমার বাবার দিকে তাকাতেন, উনার মনে হতো দুনিয়াটা বোধহয় রসাতলে গেল। কারণ বাবা তখন বেলবটম প্যান্ট পরতেন আর চুলে সুগন্ধি তেল দিতেন। বাবা যখন আবার আমার দিকে তাকাতেন, উনার চোখ চড়কগাছ হয়ে যেত। ছেঁড়া জিন্স আর গায়ে জড়ানো বিশালাকার ওভারসাইজড টি-শার্ট দেখে বাবা একদিন বিষণ্ন গলায় বলেছিলেন, বাবা রে, কাপড়ের অভাব হলে আমাকে বলতি। জামাটা মনে হচ্ছে তোর গায়ে না, তুই জামার ভেতর সপরিবারে বাস করছিস।
আমি তখন মুখে এক চিলতে উদাসীনতা ফুটিয়ে বলেছিলাম, এটাই তো ড্রিপ! তুমি বুঝবে না।
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে গিয়েছিলেন। উনি ড্রিপ বোঝেননি, চিল করাও বোঝেননি। ওনারা বুঝতেন নিয়ম আর শৃঙ্খলা। আর আমাদের জেনারেশনের ফ্যাশন থেকে শুরু করে থট প্রসেস—সবকিছুতেই ছিল একটা ছন্নছাড়া ভাব। আমরা একই সাথে ক্যারিয়ার নিয়ে তীব্র ডিপ্রেশনে ভুগেছি, আবার সেই ডিপ্রেশন নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় মিম বানিয়ে ভাইব চেক করেছি। আমাদের দুঃখগুলোও ছিল এক ধরনের বিলাসিতা।
অথচ সময় ও নদীর স্রোতের মতো সেই চাকা ঘুরে গেল। যে ছেলে একদিন কথায় কথায় বন্ধুদের 'ঘোস্ট' করত, যে ছেলে 'ক্রিঞ্জ' শব্দটা দিনে বাহাত্তর বার ব্যবহার না করলে পেটের ভাত হজম করতে পারত না, সে-ই এখন মাঝরাতে বাচ্চার কাঁথা বদলে দিয়ে আয়নায় নিজের ক্লান্ত মুখ দেখে।
এখনকার এই নতুন পৃথিবীর নতুন বাচ্চাদের দিকে যখন তাকাই, তখন আমার বাবার সেই পুরোনো দীর্ঘশ্বাসটার ওজন টের পাই। ওদের চিন্তা, ওদের ভাষা আরও অন্যরকম, আরও জটিল।
২
আমার বাবারা যখন আমাদের শাসন করতেন, তাদের হাতে একটা মোক্ষম অস্ত্র ছিল, চোখের পলক না ফেলে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা। ওই এক চাহনিতেই আমরা বুঝে যেতাম, বার্ষিক পরীক্ষার রেজাল্ট যদি আশানুরূপ না হয়, তবে পিঠের চামড়া আর আস্ত থাকবে না। ওনাদের শাসনব্যবস্থা ছিল ব্রিটিশ আমলের আইনি কাঠামোর মতো কঠোর এবং সোজা।
আর আমার অবস্থা দেখুন। আমি একজন জেন-জি বাবা। আমার সন্তান যখন কোনো অন্যায় করে, আমি তার দিকে কড়া চোখে তাকাতে পারি না। তাকালেই মনে হয়, আমি বোধহয় তার 'পার্সোনাল স্পেস' নষ্ট করছি, তার 'মেন্টাল হেলথ'-এ আঘাত হানছি। তাই আমি শাসন করি আধুনিক পদ্ধতিতে, যেটাকে আমি বলি 'ব্লুটুথ প্যারেন্টিং'। দূর থেকে আলতো করে সিগন্যাল পাঠানো, কিন্তু কানেক্ট হতে গেলেই পাসওয়ার্ড ভুল দেখায়।
একদিন আমার সন্তানকে বললাম, শোনো, সারাদিন এই স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকাটা কিন্তু একদমই সুস্থ লক্ষণ না। আমাদের সময়ে আমরা এই বয়সে বিকেলে মাঠে গিয়ে ফুটবল খেলতাম।
সে আমার দিকে এমন একখানা করুণার দৃষ্টিতে তাকাল, যেন সে কোনো জাদুঘরের আদিম অধিবাসীর কথা শুনছে। অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল, তোমার ওই মেটাভার্স-পূর্ববর্তী যুগের এনালগ নস্টালজিয়া আমার ওপর চাপিয়ে দিও না তো। আই অ্যাম জাস্ট ট্রায়িং টু অপ্টিমাইজ মাই ফোকাস। আর তাছাড়া, মাঠের চেয়ে আমার ভার্চুয়াল রিয়েলিটি গেমের গ্রাফিক্স অনেক বেশি রিয়েল।
আমি কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম। যে ছেলে একদিন বাবার একটা হুংকারে বাথরুমে লুকিয়ে লুকিয়ে ঘামত, সে আজ নিজের সন্তানের কাছে এনালগ নস্টালজিয়ার খোঁটা শুনছে। একেই বোধহয় বলে প্রকৃতির নিখুঁত প্রতিশোধ।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা লাগে যখন ওদের থট প্রসেস আর ফ্যাশন দেখি। এখনকার বাচ্চাদের ফ্যাশনে কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম নেই। কেউ হয়তো প্যান্টের এক পাশ গুটিয়ে রেখেছে, অন্য পাশ ছেড়ে দিয়েছে। চুলে এমন সব রঙ, যা দেখলে মনে হয় মাথায় কোনো ট্রপিক্যাল রেইনফরেস্ট গজিয়েছে।
আমি একদিন সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম, মাথায় এই নিয়ন গ্রিন কালার করার পেছনের মূল দর্শনটা কী?
উত্তর এলো, ইটস অল অ্যাবাউট সেলফ-এক্সপ্রেশন, ড্যাড। তুমি বুঝবে না, এটা আমার কারেন্ট ভাইব।
আমি মনে মনে হাসলাম। আমার বাবাও ঠিক এই একই বাক্য আমাকে বলেছিলেন, যখন আমি ওনার সাধের ক্যাসেট প্লেয়ারটা খুলে ভেতরে কী আছে দেখার চেষ্টা করেছিলাম। তফাত শুধু একটাই, আমার বাবা তখন আমাকে একটা চড় কষিয়ে দিয়েছিলেন, আর আমি এখন একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে শুধু বলি, আচ্ছা, নাইস।
আমরা জেন-জিরা যখন বাবা হলাম, তখন ভাবতাম আমরা হব দুনিয়ার সবচেয়ে 'কুল' বাবা। আমরা সন্তানদের বন্ধু হব, তাদের সাথে আড্ডা দেব। কিন্তু বাস্তবে এসে দেখছি, কুল হওয়ার চক্করে আমরা আসলে এক অদ্ভুত গোলকধাঁধায় পড়ে গেছি। আমরা না পারছি পুরোনো দিনের মতো কর্তৃত্ব খাটাতে, না পারছি ওদের এই অতি-আধুনিক মহাজাগতিক চিন্তাভাবনার সাথে তাল মেলাতে। আমরা মাঝখানের এক ঝুলন্ত সেতু, যার একপাশে ফেলে আসা অতীত, আর অন্যপাশে এক কুয়াশাবৃত ভবিষ্যৎ।
৩
ভবিষ্যৎ জিনিসটা সবসময়ই কুয়াশায় ঢাকা থাকে, তবে এখনকার ভবিষ্যৎ যেন একটু বেশিই ধোঁয়াটে। মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, আমি বোধহয় কোনো টাইম ট্রাভেল মেশিনে চড়ে ভুল এক শতাব্দীতে এসে নেমেছি।
আমার মনে আছে, আমার দাদা যখন শেষ বয়সে বারান্দার ইজিচেয়ারে বসতেন, ওনার একটা ভারী চশমা ছিল। সেই চশমা মুছে উনি খবরের কাগজ পড়তেন আর বাবাকে ডেকে বলতেন, দ্যাখো দেখি, পাটের বাজারটা এবার কেমন পড়ে গেল! ওনাদের ভবিষ্যৎ ভাবনা ছিল মাটি ঘেঁষা, জমিজমা, ব্যাংকের ফিক্সড ডিপোজিট আর পেনশনের টাকা।
আর আমি যখন বুড়ো হব, তখন হয়তো কোনো মেটাভার্স চশমা চোখে দিয়ে বারান্দায় বসে থাকব। আমার সন্তান হয়তো পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলবে, তোমার ডিজিটাল মেমরির সাবস্ক্রিপশনটা কিন্তু এক্সপায়ার হয়ে যাচ্ছে, রিনিউ করে নাও।
ভবিষ্যতের প্যারেন্টিংটা কেমন হবে, তা ভাবলে এক তীব্র অলৌকিক রহস্যের গন্ধ পাই। আমাদের বাবারা আমাদের শিখিয়েছিলেন কীভাবে মানুষের সাথে মিশতে হয়, কীভাবে সমাজে ভদ্রলোক হয়ে বাঁচতে হয়। আর আমাদের শেখাতে হচ্ছে কীভাবে রোবটের সাথে চ্যাট করতে হয়, কীভাবে এআই-এর যুগে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হয়। যে বাবা একসময় সন্তানকে অক্ষর জ্ঞান দিতেন, সে এখন বসে বসে বোঝে অ্যালগরিদম।
একদিন রাতে লোডশেডিং হলো। চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। এই যান্ত্রিক শহরের বুকে অন্ধকার নামলে এক অদ্ভুত নীরবতা তৈরি হয়। আমি আর আমার সন্তান বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। আকাশটা মেঘলা, একটা তাড়াহুড়ো করা চাঁদ মেঘের আড়ালে লুকানোর চেষ্টা করছে।
আমি একটু আবেগপ্রবণ হয়ে বললাম, জানো, আমাদের ছোটবেলায় যখন এমন লোডশেডিং হতো, আমরা সবাই মিলে উঠোনে বা ছাদে বসতাম। মা গান গাইতেন, বাবা ভূত-প্রেতের গল্প বলতেন। সেই অন্ধকারগুলোর মধ্যেও একটা আলো ছিল।
সে অন্ধকারের মধ্যেই আমার দিকে তাকাল। তার চোখের মনিতে ফোনের স্ক্রিনের নীলচে আভা নেই, খাঁটি আকাশের অন্ধকার। সে মৃদু স্বরে বলল, গল্পটা তো সুন্দর। কিন্তু তোমরা কি তখন একাকীত্ব ফিল করতে না? ইন্টারনেট ছাড়া মানুষ কীভাবে কানেক্টেড থাকত?
আমি হাসলাম। চাঁদের আলোটা তখন তার মুখে পড়েছে। আমি বললাম, আমরা তখন স্ক্রিনে কানেক্টেড ছিলাম না রে, আমরা হৃদয়ে কানেক্টেড ছিলাম।
সে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর আমার কাঁধে হাত রাখল। জেন-জিদের এই এক গুণ, এরা হুট করে খুব পরিণত আচরণ করে ফেলে। সে বলল, আই গেট ইট। ইটস আ ডিফরেন্ট ভাইব। তবে তোমার এই এনালগ গল্পটা আমার কিন্তু বেশ লেগেছে।
আমার বুকটা কেমন যেন হালকা হয়ে গেল। মনে হলো, জেনারেশন যতই বদলাক, ফ্যাশন যতই ওভারসাইজড হোক আর ভাষা যতই বদলে যাক, বাপ-বেটার ভেতরের ওই অদৃশ্য সুতোটা আসলে একই থাকে। ওটা ভাঙার সাধ্য কোনো প্রযুক্তির নেই।
পৃথিবীর এই চাকা ঘুরতেই থাকবে। আজ যে ছেলে আমাকে এনালগ বলে হাসছে, সে-ও একদিন বাবা হবে। তার সন্তান হয়তো চুলে আরও অদ্ভুত কোনো রঙ মাখবে, বাতাসে ভাসমান স্ক্রিনে আঙুল চালাবে। সেদিন আমার এই ছেলেটি মাঝরাতে জেগে উঠে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলবে, হোয়াট আ ক্রিন্জ জেনারেশন! আমাদের আমলটাই কত সুন্দর ছিল!



পাঠকের মন্তব্য