বিশ্বকাপ শুরু হতেই আমার চেনা-পরিচিত সবাই যেন কেমন ‘বল-বান’ হয়ে উঠল। আমি চিরকালই একটু অলস প্রকৃতির মানুষ, অর্থাৎ যাকে বলে ‘ফুট-অবল’। মানে, পায়ে হেঁটে বেশি দূর যাওয়ার বল বা শক্তি আমার নেই। অথচ সারা দুনিয়া নাকি মেতেছে ফুটবলে!
আমার মেজো মামা, যিনি নিজে জীবনে কোনো দিন একটা মশারির দড়িও ঠিকঠাক বাঁধতে পারেননি, তিনি টিভির সামনে বসে এমন চেল্লাচ্ছেন, যেন আর্জেন্টিনার ডিফেন্সের দড়িটা তাঁর পরামর্শেই বাঁধা হয়েছে। মামা বললেন,
— কী রে শিবু, এবার কাপটা কার ঘরে যাবে বলে তোর মনে হয়?
আমি হাই তুলে বললুম,
— কাপ যার ঘরেই যাক, মামা, ডিশটা কিন্তু আমাদের ঘরেই ভাঙবে। যেভাবে গিন্নি টিভির আওয়াজ শুনে বাসন আছড়াচ্ছেন, তাতে মনে হচ্ছে ফাইনাল আসার আগেই আমাদের কাপ-প্লেট সব শেষ হয়ে যাবে।
আসলেই গিন্নির গরম মেজাজ আমাদের হাতে দেওয়া তাঁর বানানো চায়ের কাপের তাপ যেন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কখন না জানি বিনা মেঘে বজ্রপাত শুরু হয়!
খেলা দেখতে দেখতে রাত দুটো বেজে গেল। কমেন্টেটর গলা ফাটিয়ে বলছেন,
— অসাধারণ শট! কিন্তু বলটা পোস্টে লেগে ফিরে এল! ওহ, হোয়াট আ মিস!
আমি মামাকে বললুম,
— মামা, এই ‘মিস’দের ফুটবল মাঠে কেন আনা হয় বলো তো? এরা এলেই তো প্লেয়ারদের মন উচাটন হয়ে যায়। এই যে ভদ্রলোক এত কষ্ট করে লাথি মারলেন, আর বলটা নাকি ‘মিস’ হয়ে গেল! মিস না হয়ে যদি ‘মিসেস’ হতো, তবে কি বলটা জালের ভেতর সংসার পাতত?
মামা আমার দিকে এমন চোখে তাকালেন, যেন একটা জলজ্যান্ত ফাউল দেখতে পেয়েছেন। বললেন,
— তোর ওই আজেবাজে রসিকতা রাখ, শিবু। আমার চোখ জড়িয়ে যাচ্ছে ঘুমে। একটু চায়ের ব্যবস্থা কর তো।
আমি পরম আহ্লাদে রান্নাঘরে গিয়ে চমৎকার এক কাপ চা বানানোর চেষ্টা করে চায়ের লিকার খুঁজে না পেয়ে বাধ্য হয়ে এক কাপ কফি বানিয়ে নিয়ে এলাম। মামার হাতে দিতেই মামা খেপে লাল!
— এ কী রে? আমি বিশ্বকাপ ফুটবলের ‘কাপ’ নিয়ে টেনশন করছি, আর তুই আমাকে কফির কাপ ধরাচ্ছিস? চা কই?
আমি বিনীতভাবে বললুম,
— আহা, মামা, ও কাপ তো কাতার বা আমেরিকায় ঘুরে বেড়ায়, কপালে না থাকলে ছোঁয়া যায় না। আর এই কাপ তো একেবারে তোমার হাতের মুঠোয়! চুমুক দিয়ে দেখো, ফিফার কাপের চেয়ে এর ‘কিক’ অনেক বেশি! আই সোয়্যার!
এবার আর মামা কথা বাড়ালেন না। কফিতে চুমুক দিয়ে খেলায় মনোযোগী হলেন। আর আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। ভাগ্য যে গিন্নি জেগে থাকতে তাঁর কাছে আর এক কাপ চা চাইনি। বিশ্বকাপটাই হয়তো ছুড়ে মারতেন আমাকে।
টিভির দিকে তাকালাম। খেলায় রেফারি হঠাৎ পকেট থেকে একটা হলুদ প্লাস্টিকের টুকরো বের করে এক প্লেয়ারকে দেখালেন। কমেন্টেটর চেঁচালেন,
— ইয়েলো কার্ড!
আমি ভাবলুম, বাঃ! ফুটবলারদের তো দারুণ খাতির! মাঠের মধ্যে হলুদ রঙের বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র দেওয়া হচ্ছে। মানে, ফুট-অবল হলে যা হয় আরকি! একটু পরেই দেখলুম, আরেকজনকে দেওয়া হলো লাল কার্ড। আমি মামাকে বললুম,
— মামা, হলুদ কার্ডের পর লাল কার্ড? তার মানে বিয়েবাড়ি শেষ, এবার বুঝি বউভাতের নিমন্ত্রণ? তা প্লেয়ার ভদ্রলোক নিমন্ত্রণপত্রটা পেয়ে অমন তেলো হাঁড়ির মতো মুখ করে মাঠের বাইরে চলে যাচ্ছেন কেন?
মামা বড্ড প্রেসারে ছিলেন। দাঁত কিঁড়মিঁড় করে বললেন,
— ওটা নিমন্ত্রণ নয় রে হাঁদা! ওটা হলো বিদায়পত্র। মানে, তার আজকের মতো ‘খেল খতম, পয়সা হজম’।
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললুম,
— ফুটবল মাঠের নিয়ম তো তাও ভালো, মামা। একটা কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে খেদিয়ে দেয়। কিন্তু সংসদের মাঠে গিন্নি যখন আমাকে লাল চোখ দেখান, তখন তো আমি লাল কার্ড পেয়েও মাঠের বাইরে যেতে পারি না! সারাক্ষণ ঘরের ডিফেন্সে দাঁড়িয়ে গোল আটকানোর ডিউটি করতে হয়!
মামা আমার চিরকুমার। বুঝলেন না এ ব্যথা! শুধু মুখ বাঁকালেন একবার। পইপই করে বারণ করেছিলেন না করতে এ অকর্ম, আর আমি ধর্ম ভেবে এই রণক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়লাম।
সে যাক, খেলার একেবারে শেষ মুহূর্তে রেফারি পেনাল্টি দিলেন। ধারাভাষ্যকার বললেন,
— দিস ইজ আ গোল্ডেন অপর্চুনিটি!
আমি হিসেব কষে দেখলুম, একেই বলে শব্দের মহিমা। ‘পেনাল্টি’ শব্দটার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আসল রহস্য। প্রথম অংশটা হলো ‘পে’, অর্থাৎ টাকা দেওয়া, আর পরের অংশটা হলো ‘নাল্টি’ বা নালিশ। মানে, প্লেয়াররা মাঠে এতক্ষণ ধরে ফাউল করার যে নালিশ জানাচ্ছিলেন, তার জন্য এবার বিপক্ষ দলকে কড়া ‘পে’ বা মূল্য চোকাতে হবে।
শট নেওয়া হলো। বলটা সটান গিয়ে জালের এক কোণে আটকে গেল। চারদিকে তুমুল চিৎকার, ‘গোল! গোল!’
আমি চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে টিভিটার দিকে তাকিয়ে ভাবলুম, মানুষ কত বোকা! একটা বল জালের ভেতর আটকে গেল, আর তাই দেখে কোটি কোটি মানুষ আনন্দে আত্মহারা! অথচ প্রতিদিন বাজারে গিয়ে আলু-পটল কিনতে গিয়ে আমাদের পকেটে যে মস্ত বড় ‘গোল’ তৈরি হচ্ছে, তার খবরটা কে রাখে!
মামা বললেন,
— কী রে শিবু, কেমন দেখলি গোলটা?
আমি বললুম,
— গোলটা চমৎকার, মামা। তবে ওঁরা তো মারলেন পায়ে, আর আমার মাথা ঘুরছে গোল গোল। চললুম বিছানার দিকে, গোলমাল না করে এবার একটু গোল হয়ে শুয়ে পড়া যাক!



পাঠকের মন্তব্য