সংসদ অধিবেশন চলছে। স্পিকারের ডান পাশে দাঁড়িয়ে আছেন মাননীয় সংসদ সদস্য মোদাব্বের আলী। তিনি একটি বিশেষ দাবি নিয়ে দাঁড়িয়েছেন। 'মাননীয় স্পিকার,' মোদাব্বের আলী একটু গলা ঝেড়ে বলতে শুরু করলেন। 'সরকার আমাদের যে ফ্ল্যাট দিয়েছে, তা বেশ সুন্দর। কিন্তু সেখানে কিছু জরুরি জিনিসের অভাব আছে। গত সপ্তাহে আমি ওয়াশিং মেশিন আর ওভেন চেয়েছিলাম। এবার আরও কিছু জিনিস দরকার। ফ্ল্যাটে গিয়ে বুঝলাম, শুধু ওভেন দিয়ে তো আর ভাত-তরকারি রান্না করা যায় না। তাই আমার ফ্ল্যাটের জন্য এক সেট উন্নত মানের রান্নার হাঁড়িপাতিল দরকার।'
পুরো সংসদ ভবন জুড়ে পিনপতন নীরবতা। সবাই ভাবছেন, এখন হয়তো তিনি তার এলাকার ভাঙা রাস্তা বা নতুন স্কুলের জন্য কিছু বলবেন। কিন্তু মোদাব্বের আলী পকেট থেকে একটি লম্বা কাগজের ফর্দ বের করলেন। 'ফ্ল্যাট পরিষ্কার রাখতে একটি উন্নত মানের ঝাড়ু দরকার। সেই সঙ্গে ময়লা ফেলার ঝুড়িও লাগবে। আর রান্নার পর গরম হাঁড়ি ধরার জন্য 'লুসনি' অত্যন্ত জরুরি। এগুলো ছাড়া একজন সংসদ সদস্যের জীবন অচল।'
স্পিকার সহাস্যে বললেন, একদম ঠিক বলেছেন, মাননীয় সদস্য। এত সামান্যে জীবন চলে? আর কিছু চাই না?
উৎসাহ পেয়ে সংসদ সদস্য আবার শুরু করলেন, 'মাননীয় স্পিকার, তালিকা আরও আছে।' তিনি চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে পড়তে লাগলেন। 'ফ্ল্যাটের বাথরুমে যাওয়ার জন্য প্লাস্টিকের স্যান্ডেল লাগবে। দরজার সামনে পাতার জন্য ভালো মানের পাপোশ দরকার। আর টয়লেট পরিষ্কার রাখার জন্য সরকারি খরচে 'হারপিক' দেওয়া হোক। না হলে তো জীবাণু ছড়াবে!'
সংসদের পেছনের বেঞ্চ থেকে একজন তরুণ এমপি হেসে বললেন, ভাই, মশার কামড়ে রাতে ঘুমানো যায়? ওটার ব্যবস্থা করেন!
মোদাব্বের আলী মাথা নেড়ে বললেন, ধন্যবাদ মাননীয় সদস্যকে। স্পিকার মহোদয়, ফ্ল্যাটে মশার খুব উপদ্রব। মশা মারার রিচার্জেবল ব্যাট তো লাগবেই, সঙ্গে রাতে খাটে টাঙানোর জন্য একটা ভালো মশারীও দরকার। শুধু মশা নয়, সেখানে ইঁদুরেরও আনাগোনা আছে। তাই জরুরি ভিত্তিতে ইঁদুর মারার বিষ বরাদ্দ দেওয়া হোক।
তিনি একনাগাড়ে বলে চললেন, রান্নার পর গরম হাঁড়ি ধরার জন্য 'লুসনি', ঘর সাফ করার ঝাড়ু আর ময়লা ফেলার ঝুড়িও এই তালিকায় আছে। আর হ্যাঁ, একা হাতে এত কাজ করা অসম্ভব। তাই একজন দক্ষ কাজের বুয়াও সরকারি খরচে নিয়োগ দেওয়া হোক।
এবার একজন সিনিয়র সংসদ সদস্য আর সহ্য করতে পারলেন না। তিনি টেবিল চাপড়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে দাঁড়িয়ে গেলেন।
'মাননীয় স্পিকার!' তিনি চিৎকার করে বললেন। 'এই সংসদ কোনো শপিং মল নয়! দেশের মানুষ আমাদের ভোট দিয়ে এখানে পাঠিয়েছে তাদের অভাব-অভিযোগের কথা বলতে। আমরা এখানে আসি নিজ নিজ এলাকার ভাঙা রাস্তা মেরামত, নতুন স্কুল-কলেজ তৈরি আর জনগণের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য বাজেট ও বরাদ্দ চাইতে। নিজের ঘরের ইঁদুর মারার বিষ আর বাথরুমের স্যান্ডেল চাওয়ার জন্য মানুষ আমাদের এই পবিত্র সংসদে পাঠায়নি। এটি অত্যন্ত লজ্জাজনক!'
পুরো সংসদে তখন হাসির রোল আর তুমুল শোরগোল পড়ে গেল। স্পিকার মহোদয় বারবার হাতুড়ি পিটিয়ে সবাইকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু মোদাব্বের আলী মোটেও লজ্জিত হলেন না। তিনি বিমর্ষ মুখে, অত্যন্ত বিষণ্ণ মনে নিজের আসনে বসে পড়লেন। কপালে হাত দিয়ে গভীরভাবে ভাবতে লাগলেন। তার মাথায় কিছুতেই ঢুকছে না, সবাই এভাবে হাসল কেন? আজব তো! এতে হাসার কী আছে?
তার মনটা খারাপ হয়ে গেল।
তিনি মনে মনে ভাবলেন, আমি দেশের জন্য এত বড় দায়িত্ব পালন করি। দিন-রাত জনগণের কথা চিন্তা করি। অথচ সরকার যদি আমার নিজের একটু সেবা না করে, আমার থাকার ফ্ল্যাটটায় যদি একটা বাথরুমের স্যান্ডেল বা ইঁদুর মারার বিষও না দেয়, তবে আমি শান্তিতে ঘুমাব কীভাবে? আর ঘুম যদি ঠিকমতো না হয়, তবে আমি দেশের সেবা কীভাবে করব? মানুষের এই আজব আচরণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না!



পাঠকের মন্তব্য