আমাদের দেশে প্রথম যেবার বিশ্বকাপ দেখতে পারল মানুষ খানিকটা আরাম আয়েস করে, রঙিন টিভিতে। বাংলাদেশের মানুষ যখন প্রথমবারের মতন আকাশি-সাদা ডোরাকাটা জার্সি দেখতে পেল, সেই বছর খর্বাকার এক তরুণ বাকি পৃথিবীর সাথে সাথে বঙ্গোপসাগরের উত্তর প্রান্তেও যেন এক জলোচ্ছ্বাস বইয়ে দিল। একের পর এক ট্যাকেল টপকে গিয়ে যে পৌঁছে যেতে পারত প্রতিপক্ষের গোলপোস্টে। পুরো মাঠ নাচিয়ে যিনি অ্যালেক্সান্ডার দ্য গ্রেটের মতো করে এগিয়ে যেতে পারতেন, কিংবা ইশ্বরের মতোই হয়ত, কে জানে! ফুটবল খেলাটাকে যিনি অস্পৃশ্য এক উচ্চতায় নিয়ে যেতে পেরেছিলেন, সেই ম্যারাডোনার খেলোয়াড় জীবনের শেষটা নায়কোচিত হয়নি। পরবর্তী জীবনটা যেন নায়কের চাইতেও অনেক বেশি ‘এন্টিহিরো’ হয়ে রইলেন।
সেই ম্যারাডোনার জীবনে ২০১০ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা দলের কোচ হয়ে যাওয়াটা মোটেই সুখকর ছিল না। তবে এই অসুখী সময়েই ম্যারাডোনা নিজের মতো করেই আমোদিত করেছেন ফুটবল বিশ্বকে। ফুটবলার ম্যারাডোনাকে নিয়ে চাইলে অসংখ্য বই লিখে ফেলা যায়, অথবা স্রেফ এক লাইনেই বলে দেয়া যায় ‘ফুটবলের ইশ্বর’। সেদিক থেকে কোচ ম্যারাডোনা অনেকটাই নিস্প্রভ। ম্যারাডোনার কোচিং জীবনের কিছু ‘মজার’ ঘটনা আজ থাকছে eআরকির পাঠকদের জন্য।

১# স্মেলস লাইক 'টিম' স্পিরিট
২০১০ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনা তখন আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের কোচ। এক ট্রেনিং সেশনে পুরো দল দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে ম্যাচ খেলছে। ম্যারাডোনা জানিয়ে দিলেন, যারা ম্যাচ হেরে যাবে অন্য দলের সবাই তাদের গায়ে বল শুট করবে। ম্যাচ শেষে যখন ‘হারু পার্টির’ সবাই গোলপোস্টে যখন সতীর্থদের কিকের অপেক্ষায়, তখন দেখা গেল ম্যারাডোনা নিজেও গিয়ে হেরে যাওয়া দলের সাথে দাঁড়িয়েছেন গোলবারের নিচে শুটের মুখোমুখি।
যদিও সেবার আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে ভালো করতে পারেনি, তবুও কোচের এমন টিম স্পিরিট নিশ্চয়ই বেশ উপভোগ্য ছিল!
২# কাদাপানিতে উল্লাস!
কোচ ম্যারাডোনার অধীনে আর্জেন্টিনা দল খুব একটা সুখের সময় পার করেনি। ২০১০ বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব খুব কঠিন সময় ছিল দলটির জন্য। বাছাইপর্বের শেষদিকে এক বাঁচা-মরার ম্যাচে পেরুর মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনা। ম্যাচটি না জিততে পারলে বড়সড় বিপদ অপেক্ষা করছিল।
বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে হিগুয়েনের গোলে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। ম্যাচ জয় যখন প্রায় নিশ্চিত, তখনই ঠিক ৯০ মিনিটে গোল শোধ দিয়ে বসে পেরু। ম্যাচের ফলাফল ড্র থেকে গেলে আর্জেন্টিনা তো বিপদে পড়ে যেতই, ম্যারাডোনার চাকরি নিয়েও টানাটানি পড়ে যেত। তখনই স্বস্তি নিয়ে এলেন মার্টিন পালের্মো।
ম্যারাডোনার ইচ্ছায় প্রায় এক দশক পর জাতীয় দলে ডাক পাওয়া পালের্মো ম্যাচটিতে নেমেছিলেন বদলি হয়ে। পালের্মোই ৯৩ মিনিটে গোল করে দলের জয়কে যেন ছিনিয়ে আনলেন।
আর ম্যারাডোনা? তাকে দেখা গেল মাঠে কাদাপানির মাঝে ডাইভ দিয়ে বুকে ভর করে স্লাইড করছেন ঠিক একজন উল্লাসরত ফুটবলারের মতোই।
৩# হুমকি নাকি প্রতিশ্রুতি?
কাদাপানির মাঠে যে কোচ এভাবে আনন্দচিত্তে স্লাইড করতে পারেন, তিনি আরও অনেক অবিশ্বাস্য কিছুও করতে পারেন।
বিশ্বকাপ শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগে ম্যারাডোনা এক রেডিও সাক্ষাৎকারে বলে বসেন, ‘যদি আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতে যায় তাহলে আমি বুয়েন্স আইরেসের রাস্তায় নগ্ন হয়ে দৌড়াব!’
এটা হুমকি নাকি অঙ্গিকার ছিল, তা নিয়ে অনেকে রসিকতা করলেও, আর্জেন্টাইন মিডিয়া কিন্তু নিশ্চিত ছিল বিশ্বকাপ জিতে গেলে ম্যারাডোনা এমনটা করবেনই। এর অনেক আগে ‘এল গ্রাফিকো’ ম্যাগাজিনের জন্য নগ্ন হয়ে ছবি তুলেছিলেন ম্যারাডোনা।
‘সৌভাগ্য’ কিংবা ‘দুর্ভাগ্যক্রমে’ আর্জেন্টিনা দল ব্যাপারটি ঘটতে দেয়নি।
৪# স্বপ্নে পাওয়া ফুটবলার!
আবারও সেই ২০১০ বিশ্বকাপ। নানা চরাই উৎরাই পেরিয়ে আর্জেন্টিনা যখন বিশ্বকাপে সুযোগ পেল, তখন সবার অপেক্ষা ছিল দল নির্বাচনে কোচ ম্যারাডোনা নতুন কোন চমক দিবেন কি না তার অপেক্ষায় ছিলেন সবাই। রিকুয়েলমের দলে না থাকাটা অপ্রত্যাশিত হলেও চমক ছিল না। কারণ তার কিছুদিন আগেই তিনি কোচের সাথে মনোমালিন্যে একেবারে অবসরই নিয়ে ফেলেছিলেন।
তবে সত্যিকারের ‘চমক’ ছিল ৩০ বছর বয়সী ডিফেন্ডার এরিয়েল গার্সে। সেই ২০০৩ সালে আর্জেন্টিনার হয়ে দুটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে মাঝে ৭ বছরের বিরাট বিরতি। নেই কোন উল্লেখযোগ্য পারফরম্যান্স। এই এরিয়েল গার্সে সম্ভবত স্বপ্নেও কখনো বিশ্বকাপ দলে জায়গা পাবার কথা ভাবেননি। দলে জায়গা পেলেও দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে এক মিনিটের জন্যেও মাঠে নামা হয়নি তার। কিন্তু একবারের জন্যেও নামাবেন না, তাহলে এমন বিস্ময়কর বাছাই কেন করেছিলেন ম্যারাডোনা?

গার্সে ছিলেন ম্যারাডোনার স্বপ্নে পাওয়া ফুটবলার। দল নির্বাচনের কিছুদিন আগে ম্যারাডোনা এক রাতে স্বপ্নে দেখেন আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতে গেছে এবং দল বিশ্বকাপ ট্রফি উচিয়ে উল্লাস করছে। আর মেসি, ডি মারিয়া, রিকুয়েলমেকে রেখে ম্যারাডোনা শুধু স্বপ্নের একটি চেহারাই মনে করতে পারছিলেন, সেটি হচ্ছে এরিয়েল গার্সে। এজন্যই তাকে দলে ফিরিয়ে আনা।
কে জানে, হয়ত গার্সেকে না নামানোর অভিশাপেই কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে অমন করে ছিটকে পড়তে হয়েছিল আর্জেন্টিনার।


পাঠকের মন্তব্য