বিশ্বকাপ, আর্জেন্টিনা, বাবা

১৫ পঠিত ... ১৮ ঘন্টা ৭ মিনিট আগে

লেখা: সুচিস্মিতা তিথি 

খেলাধুলা নিয়ে কোনোকালেই আমার কোনো আগ্রহ ছিলো না। শুধু আমার না, আমার বাসার কারোই কোনো আগ্রহ নাই।

ঘটনা ২০১০ সালের। আমি তখন ক্লাস সেভেনে।

একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি আশেপাশের সবখানে সারি সারি পতাকা ঝুলতেছে। আর যেদিকে যাই সেদিকেই ‘ওয়াকা ওয়াকা’ না হয় ‘গিভ মি ফ্রিডম’ বাজতেছে। বুঝলাম, ফুটবল বিশ্বকাপ আসছে। স্কুলে গিয়ে দেখি সব বান্ধবীরা আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল দু’দলে ভাগ হয়ে গেছে। ফুটবল নিয়ে উত্তেজনার শেষ নাই কারও।

এমনিতে আমরা কেউই কখনো পেপার-টেপার পড়ি না। কিন্তু বিশ্বকাপ আসার পর থেকে সবাই ঘুম থেকে উঠে ব্রাশ করার আগেই পেপার নিয়ে বসতাম। ফুটবল নিয়ে যত রকম জিনিসপত্র দেয়া থাকতো সব মুখস্থ করতাম। স্কুলে যাওয়ার পর শুরু হতো পরীক্ষা—কে প্লেয়ারদের সম্পর্কে কত বেশি জানে! মেসির হাইট কত, রোনালদোর কয়টা গার্লফ্রেন্ড, কাকার বউ দেখতে কী রকম সব আমাদের মুখস্থ ছিল।

আমার বান্ধবীরা ড্রয়ার ঘেটে ঘেটে, মা বাবার সাথে ঘ্যান ঘ্যান করে—কোনোরকমে সবাই একটা করে ডায়েরি করে ফেলল। ডায়েরির ভেতর থাকতো প্রিয় প্লেয়ারদের ছবি (পেপার কেটে কেটে নেওয়া হতো) আর ছবির নিচে লেখা থাকতো বিভিন্ন রংয়ে বিভিন্ন ঢংয়ে ‘আই লাভ ইউ’ টাইপ কথাবার্তা। কয়েকজন সুন্দরী মাখন টাইপ বান্ধবী আবার অতি উৎসাহে স্কেল দিয়ে হাতের ওপর কেটে কেটে প্লেয়ারদের নামের প্রথম অক্ষর লিখছিল (বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই M, K আর R দেখা যেত)। আমিও মহা উৎসাহে ড্রয়ার ঘেঁটে ঘেঁটে আর্জেন্টিনার পতাকাটা বের করে, ডিটারজেন্ট দিয়ে ধুয়ে, পরিষ্কার করে বাসার সামনে টানায়ে দিলাম।

আমরা যখন এই বাসাটায় উঠি তখন আমি এই পতাকাটা খুঁজে পাইছিলাম। আমাদের আগে এই বাসায় কয়েকজন ব্যাচেলর ছেলে থাকত। পতাকাটা তাদেরই ফেলে যাওয়া। পতাকাটা ভুল মাপে সেলাই করা ছিল। নীল অংশের পরিমাণ বেশি।

রাতের বেলা বাবা এসে দেখল বাসার সামনে ভুলভাল আর্জেন্টিনার পতাকা। বাসার কারও সাথেই বাবার খুব একটা খাতির নাই। শুধু আমিই বাবাকে কোনোরকম পাত্তা না দিয়ে মুখে মুখে কথা বলতাম। পতাকা দেখে বাবাও বুঝে গেছে যে এটা আমার কাজ। আমাকে ডেকে জিগ্যেস করছে, তুমি আর্জেন্টিনা সাপোর্ট করো?

আমি গর্বের সঙ্গে বললাম, হ্যাঁ।

বাবা ভুরু কুচকায়ে জিজ্ঞেশ করছে, কেন?

সাথে সাথে আমি কাঁচুমাচু হয়ে গেলাম। আসলে তো কোনোটাই সাপোর্ট করি না। বাসায় আর্জেন্টিনার পতাকা ছিল তাই টানায়ে দিছি। ব্রাজিলের পতাকা থাকলে ব্রাজিলের পতাকা টানাতাম। 

আমার চেহারা দেখে বাবা হেসে ফেলল, আর্জেন্টিনার পতাকা লাগাতে কে বলছে? ক্লাসের বান্ধবীরা?’

আমি—না না আমিই টানাইছি। আর্জেন্টিনা ভালো খেলে তাই।

বাবা—কে বলছে আর্জেন্টিনা ভালো খেলে? ভালো দল হচ্ছে জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন এগুলা। এগুলা সাপোর্ট করবা।

শুনে আমি ঠোঁট বাঁকায়ে চোখ ছোট ছোট করে বলছি, আপনি কেমনে জানেন? আপনাকে তো জীবনেও ফুটবল খেলা দেখতে দেখি নাই। সারাদিন তো খালি রেসলিং দেখেন।

আমার বাবা খুবই ভীতু টাইপ লোক। কখনো যদি অনেক দূরে রাস্তায় গাড়ির টায়ারও ফাটতো তাতেই বাবা তাড়াতাড়ি বাসার দরজা জানলা বন্ধ করে দিত। রিয়াজউদ্দিন বাজারে, যেখানে বাবার দোকান ছিল, সেখানে প্রায়ই মারামারি লাগত, আর মারামারি শুরু হলেই বাবা সোজা বাসা চলে আসত। কোথাও একটু জোরে চেচামেচি হইলেই যে বাবা পুরাই শঙ্কিত হয়ে যাইত সেই বাবাই সারাদিন বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমাদের পুরানো নষ্ট টিভিতে রেসলিং দেখতো! এইটা নিয়ে বাসার সবাই চুপি চুপি হাসাহাসি করলেও আমি উনার সামনেই হা হা হি হি করতাম!

ফুটবল নিয়ে যেহেতু আমি আর বাবা দুইজনেই খুব সিরিয়াস সেহেতু একদিন আমাদের দুজনের মনে হলো একটা ভালো টিভি কেনা দরকার। এই পুরান ফালতু টিভি দিয়ে আর কত! আমি নতুন টিভি কেনার প্রস্তাব নিয়ে মা’র কাছে রান্নাঘরে গেলাম। মা তো পুরাই রেগে আগুন—তোর বাবার যা মন চায় করুক গা। আমি কোনো টাকা পয়সা দিতে পারবো না।

সবকিছু শুনে বাবা আমাকে বলল যে উনি মাকে ম্যানেজ করবেন। ম্যানেজ অবশ্য করতে পারেন নাই। বাবা নিজের টাকা দিয়েই টিভি কিনে আনে।

বাবা আমাকে ফুটবল বিষয়ে বিভিন্ন জ্ঞান দেয়ার চেষ্টা করত কিন্তু আমি সেগুলা কানে নিতাম না। বাবার প্রিয় দল ছিল জার্মানি। আমি আর বাবা রাত জেগে খেলা দেখতাম। আর একজন আরেকজনকে শুকনা মুখে জ্ঞান দিতাম। ততদিনে বান্ধবী আর পেপারের কল্যাণে আমি মোটামুটি অনেক কিছু জানি। তবে আমার যাবতীয় জ্ঞান ওই প্লেয়ারদের প্রিয় খাবার, হাইট আর গার্লফ্রেন্ডের নামের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল।

তো আমি আর বাবা প্রতিদিন রাতে খাওয়া-দাওয়া করে খেলা দেখতে বসতাম। আমাদের ওই বাসাটায় অনেক মশা ছিলো। রাত জেগে খেলা দেখতে গিয়ে আমার আর বাবার মোটামুটি খবর হয়ে যাইত। তার ওপর মা'র ঘ্যানঘ্যানানি তো আছেই। কোনো এক অজানা কারণে মশারা আমাকে খুব একটা কামড়ায় না। বাবা বলত, আমাকে নাকি মশারা কামড়ায় ঠিকই আমিই নাকি টের পাই না।

খেলা দেখার সময় মাঝে মাঝে কারেন্ট চলে যাইতো। তখন আমি আর বাবা একজন আরেকজনের ওপর সব রাগ ঝাড়তাম! আমাদের ঝাড়াঝাড়ি শুনে মায়ের ঘুম ভেঙে যেত তারপর দুইজনই মায়ের গালিগালাজ শুনতাম।

যেদিন যেদিন আর্জেন্টিনার ম্যাচ থাকত ওইদিন আমি আর বাবা একটু বেশিই আয়োজন করে খেলা দেখতাম। আয়োজন বলতে মুড়ির সাথে চানাচুর মিশায়ে নিয়ে বসা। বাবা জীবনেও কখনো বাসায় চিপস-চকলেট আনেন নাই।

আর্জেন্টিনা যখন গোল খেত তখন বাবা আমার দিকে আড়চোখে তাকায়ে মুচকি মুচকি হাসত আর যখন আর্জেন্টিনা গোল দিত তখন আমি বাবার দিকে তাকায়ে মুচকি মুচকি হাসতাম। জার্মানির খেলা নিয়ে আমি অবশ্য কখনোই বাবার দিকে আড়চোখে তাকানো বা মুচকি মুচকি হাসি দেই নাই।

তারপর এলো সেই দিন—আর্জেন্টিনা ভার্সেস জার্মানি। বাবা তো সেই খুশি। আমাকে একেবারে বোল্ড আউট করে ছাড়বে সেই কনফিডেন্স নিয়ে খেলা দেখতে বসছে। আমিও জোর গলায় বললাম, গোল যখন দিয়েছি, গোল আরো দেব জার্মানিকে হারিয়ে ছাড়ব ইনশাল্লাহ!

দুই গোল খাওয়ার পর মোটামুটি আমার খেলা দেখার এনার্জি শেষ। কিছুক্ষণ বাবা মুচকি হাসি দিলেও পুরা খেলাটা আমাকে আর দেখতে দেয় নাই। ম্যাচ শেষ হওয়ার আগেই বাবা টিভি বন্ধ করে দিয়ে বলছে, যাও ঘুমাও।

বাবা পরদিন সকালে চুপিচুপি বাসার সামনে থেকে পতাকাটা খুলে নিয়ে আসছে, এই নাও যত্ন করে রাখো। আগামীবার আবার টানাইও।

স্কুলের ব্রাজেলিয়ান বান্ধবীরা টিফিন বক্সে মিষ্টি ভরে নিয়ে আসছিল আমাদেরকে খাওয়ানোর জন্য। আমার অন্যান্য আর্জেন্টাইন বান্ধবীরা রাগে-দুঃখে ওদেরকে গালিগালাজ করলেও আমি হাসিমুখেই মিষ্টিগুলি খাইছিলাম। মিষ্টি খাওয়ার কারণে অবশ্য আমাকে আর্জেন্টাইনরা নির্লজ্জ বলে গালিগালাজ দিছিল। এরপর ব্রাজিল, আর্জেন্টিনার বিদায়ের পর আমরা সবাই যখন মোটামুটি খেলা বুঝে গেছি তখন সবাই স্পেন হয়ে গেছি। বান্ধবীরা সব বুঝতে পারল আসলে মেসি কিংবা কাকা না, ক্যাসিয়াস আর ভিয়াই আসলে সবচেয়ে সুন্দর, হ্যান্ডসাম প্লেয়ার।

ওয়ার্ল্ডকাপ শেষ হওয়ার পর আমাদের সবার খুব খুবই মন খারাপ হইছিল। হুট করে আমরা আবিষ্কার করলাম যে এখন আবার সবাইকে পড়াশোনা শুরু করতে হবে। আমরা সবাই চোখ ছলছল করতে করতে বলাবলি করি, আগামি সপ্তাহ থেকে সেকেন্ড টার্ম পরীক্ষা—সিলেবাস কতদূর?

এরপর অবশ্য অভ্যাস মতো কয়েকদিন রাত জেগে বাবার সাথে রেসলিং দেখার চেষ্টা করতাম! কিন্তু একদিন বাবা এমন ধমক দিল যে রাগ করে এরপর থেকে ১০টা বাজলেই ঘুমায়ে যাওয়ার ভান করতাম। আমাদের আর কোনো নৈশ মুড়ি-চানাচুর ওয়াচ-পার্টি হয় নাই।

চার বছর অনেক লম্বা সময়। কয়েকদিন আগে একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখি এদিকে-সেদিকে পতাকা ঝুলতেছে। ফুটবল বিশ্বকাপ আসছে। ফেসবুক ভরে গেছে পতাকা, গালিগালাজ আর পরিসংখ্যানে। তবে ওই বিশ্বকাপ যে আর ফিরবে না এটা ভেবেই আমার মোটামুটি কষ্ট হচ্ছিল।

শাকিরার ওয়াকা ওয়াকা নাই।

কী যেন একটা থিম সং হইছে বটে কিন্তু সেটার এক দুই লাইনের বেশি আমার কানে আসে নাই।

ক্লাস সেভেন নাই।

মাখন টাইপের বান্ধবীরা নাই।

ওই ভুল মাপের আর্জেন্টিনার পতাকাটাও বহু আগেই হারায়ে গেছে।

এই বাসায় মশা নাই।

সবচেয়ে বেশি নাই যেটা সেটা হচ্ছে বাবার আর আমার ফুটবলের দিনগুলা।

মিস ইউ বাবা।

১৫ পঠিত ... ১৮ ঘন্টা ৭ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top