ফকল্যান্ডের রক্ত থেকে ‘হ্যান্ড অব গড’—ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার প্রতিশোধের গল্প

৪৭ পঠিত ... ১৫ ঘন্টা ২৬ মিনিট আগে

মানুষের মনের ভেতরের ক্ষোভ আর রাগ বড় অদ্ভুত জিনিস। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে সব শান্ত, কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা কয়লার আগুন ধিকধিক করে জ্বলতে থাকে। আর্জেন্টিনা আর ইংল্যান্ডের মধ্যকার রেষারেষিটাও ঠিক সেরকম। আমরা যারা দূর থেকে শুধু ফুটবল খেলা দেখি, তারা ভাবি—আহা, সবুজ মাঠে এ তো কেবলই একটা এগারো বনাম এগারো জনের লড়াই! একটু ড্রিবলিং, একটু পাস, আর জালে বল জড়িয়ে গেলেই উল্লাস। কিন্তু না, ব্যাপারটা এত সহজ নয়। কিছু কিছু খেলার পেছনে আস্ত একটা দেশের ইতিহাস, কান্না আর অপমানের গল্প লুকিয়ে থাকে। ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে দিয়েগো মারাদোনা যখন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওই বিখ্যাত দুটি গোল করেছিলেন, তখন আর্জেন্টিনার সাধারণ মানুষের কাছে ওটা কেবল কোয়ার্টার ফাইনাল জেতা ছিল না। ওটা ছিল একটা প্রতিশোধ। মাঠের সবুজ ঘাসকে তারা বানিয়ে ফেলেছিল যুদ্ধক্ষেত্র। কেন জানেন? কারণ, তার ঠিক চার বছর আগে, ১৯৮২ সালে, দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের এক কোণে ঘটে গিয়েছিল এক রক্তক্ষয়ী কাণ্ড। গল্পটা ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের। আর্জেন্টিনার মানুষ একে ডাকে মালভিনাস। আর্জেন্টিনার কোল ঘেঁষে থাকা এই দ্বীপগুলোতে বাস করত মাত্র হাজার দুয়েক মানুষ, যাদের বেশির ভাগই ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত। আর্জেন্টিনা ভাবত, এ তো আমাদের ঘরের পাশের জমি, আমাদেরই হবে।" আর সাগরের ওপার থেকে ব্রিটেন বলত, খবরদার! ওখানে আমাদের পতাকা উড়ছে, ওটা আমাদেরই। ১৯৮২ সালের শুরুর দিকে আর্জেন্টিনার ভেতরে চলছিল প্রচণ্ড অশান্তি। দেশের সাধারণ মানুষ সরকারের ওপর ক্ষ্যাপা, চাল-ডালের দাম আকাশছোঁয়া, চাকরি নেই। ঠিক এই সময় আর্জেন্টিনার তখনকার সামরিক শাসক এক অদ্ভুত বুদ্ধি খাটালেন। মানুষের চোখ আসল সমস্যা থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য তিনি দেশপ্রেমের তাস খেললেন। সিদ্ধান্ত হলো—আক্রমণ করে ফকল্যান্ড দ্বীপ দখল করে নিতে হবে। তাহলে দেশের মানুষ সব দুঃখ ভুলে খুশিতে নাচবে। যেমন ভাবনা, তেমন কাজ। ১৯৮২ সালের ১৯ মার্চ, একদল আর্জেন্টিনীয় কর্মী সাউথ জর্জিয়া দ্বীপে গিয়ে নিজেদের দেশের পতাকা উড়িয়ে দিল। ব্যস, বারুদে আগুন লেগে গেল। ২ এপ্রিল আর্জেন্টিনার বিশাল সৈন্যদল গিয়ে ফকল্যান্ড দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিল। দ্বীপে পাহারায় থাকা অল্প কয়েকজন ব্রিটিশ সৈন্য আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলো। আর্জেন্টিনার রেডিও-টেলিভিশনে ঘোষণা হলো—মালভিনাস আমাদের! দেশের মানুষ খুশিতে রাস্তায় নেমে এলো। তারা ভাবতেও পারেনি, সাগরের ওপার থেকে ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী, যাকে দুনিয়া 'লৌহমানবী' নামে চেনে, তিনি এই অপমান মুখ বুজে সহ্য করার পাত্রী নন। ব্রিটেনের সম্মান বাঁচাতে তিনি এক বিশাল নৌবহর পাঠানোর নির্দেশ দিয়ে দিলেন। হাজার হাজার মাইল দূর থেকে যুদ্ধজাহাজ রওনা হলো ফকল্যান্ডের দিকে। আকাশে তখন মেঘ জমছে, আর সাগরের জল কেটে এগিয়ে আসছে এক প্রলয়।

লন্ডন থেকে যখন ব্রিটেনের যুদ্ধজাহাজগুলো রওনা হলো, তখন আর্জেন্টিনার সামরিক শাসকেরা একটু নড়েচড়ে বসলেন। তারা হয়তো ভেবেছিলেন, এত দূরের কয়েকটা ছোট দ্বীপের জন্য ব্রিটেন বুঝি আর লণ্ডভণ্ড হতে আসবে না। কিন্তু হিসাবটা যে কতটা ভুল ছিল, তা বোঝা গেল এপ্রিলের শেষ দিকে এসে। দক্ষিণ আটলান্টিকের ওই দিকটায় তখন প্রচণ্ড শীত নামছে। কনকনে ঠান্ডা হাওয়া, চারদিকে কুয়াশা আর উত্তাল সমুদ্র। ২৫ এপ্রিল ব্রিটিশ সেনারা সাউথ জর্জিয়া দ্বীপটি অনায়াসে নিজেদের দখলে ফেরত নিল। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার লন্ডনে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, just rejoice (শুধু আনন্দ করুন)। কিন্তু আসল আনন্দ বা বিষাদ কোনোটাই তখনও শুরু হয়নি। আসল ধ্বংসলীলা শুরু হলো মে মাসের শুরুতে। ২ মে, ১৯৮২ সাল। সমুদ্রের নিচে ওত পেতে বসে ছিল ব্রিটেনের একটি পরমাণু চালিত সাবমেরিন। তার রাডারে ভেসে উঠল আর্জেন্টিনার এক বিশাল যুদ্ধজাহাজ—জেনারেল বেলগ্রানো। জাহাজটি তখন যুদ্ধক্ষেত্রের সীমানার ঠিক বাইরেই ভাসছিল। কিন্তু ব্রিটিশ সাবমেরিন থেকে ছোঁড়া হলো দুটো টর্পেডো। প্রচণ্ড বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল চারপাশ। মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে সাগরের বরফশীতল কালো জলে তলিয়ে গেল বিশাল জাহাজটি। এক নিমেষে মারা গেলেন ৩২৩ জন আর্জেন্টিনীয় তরুণ সেনা। এই ঘটনাটি আর্জেন্টিনার মানুষের বুকে তীরের মতো বিঁধল। যুদ্ধ আর কেবল দ্বীপ দখলের রাজনীতি রইল না, ওটা হয়ে উঠল স্বজন হারানোর গভীর বেদনা। আর্জেন্টিনাও চুপ করে বসে থাকার পাত্র ছিল না। তাদের বিমানবাহিনীর পাইলটরা ছিলেন প্রচণ্ড সাহসী। ৪ মে, আর্জেন্টিনার একটি যুদ্ধবিমান থেকে ছোঁড়া হলো ফরাসি প্রযুক্তির মারাত্মক এক্সোসেট মিসাইল। সাগরের বুক চিরে সেই মিসাইল গিয়ে আঘাত করল ব্রিটেনের আধুনিক ডেস্ট্রয়ার এইচএমএস শেফিল্ড-এ। আগুন ধরে গেল জাহাজে। ব্রিটিশদের অহংকার ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে শেফিল্ড সাগরে ডুবে গেল, মারা গেলেন ২০ জন ব্রিটিশ ক্রু। দুই পক্ষই বুঝতে পারল, খেলা এবার জমে উঠেছে। সাগরের নীল জল এখন আর নীল নেই, তা লাল হতে শুরু করেছে। মে মাসের ২১ তারিখ, ব্রিটিশ সৈন্যরা মূল ফকল্যান্ড দ্বীপের 'সান কার্লোস' নামের এক জায়গায় সাগরে ভেসে এসে জল-স্থলের যৌথ আক্রমণ চালাল। আর্জেন্টিনার যুদ্ধবিমানগুলো ঝাঁকে ঝাঁকে এসে উপর থেকে বোমা ফেলতে লাগল। চারদিকে শুধু গোলার শব্দ, ধোঁয়া আর আগুনের লেলিহান শিখা। ব্রিটিশরা সেখানে পা তো রাখল, কিন্তু তাদের বেশ কয়েকটি দামি যুদ্ধজাহাজ আর্জেন্টিনার বিমান হামলায় ধ্বংস হয়ে গেল। দূর আকাশে তখন যুদ্ধবিমানের গর্জন, আর নিচে ঠাণ্ডা দ্বীপে তখন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দুই দেশের হাজার হাজার সেনা। সাগরের যুদ্ধ শেষ, এবার শুরু হবে মাটির ওপর আসল লড়াই।

সান কার্লোসের মাটিতে পা রাখার পর ব্রিটিশ সৈন্যদের সামনে ছিল মাইলের পর মাইল কর্দমাক্ত, পাথুরে আর বরফশীতল রাস্তা। মে মাসের শেষ দিকে ফকল্যান্ডের শীত তখন জাঁকিয়ে বসেছে। আবহাওয়া এতটাই খারাপ যে হাত-পা জমে বরফ হয়ে যাওয়ার জোগাড়। এই প্রতিকূল পরিবেশেই শুরু হলো যুদ্ধের সবচেয়ে কঠিন অংশ—স্থলযুদ্ধ। ২৮ মে ঘটে গেল এই যুদ্ধের প্রথম বড় স্থল লড়াই, যা 'গুস গ্রিন' যুদ্ধ নামে পরিচিত। ব্রিটিশ প্যারাশুট রেজিমেন্টের সেনারা আর্জেন্টিনার শক্ত ঘাঁটির দিকে এগিয়ে গেল। আর্জেন্টিনার সেনারা সংখ্যায় বেশি ছিল এবং বাঙ্কার তৈরি করে ওত পেতে ছিল। কিন্তু ব্রিটিশদের ছিল উন্নত প্রশিক্ষণ আর রাতের অন্ধকারে যুদ্ধ করার আধুনিক কৌশল। সারারাত ধরে চলল তীব্র গোলাগুলি। বাঙ্কারে বাঙ্কারে গ্রেনেড ফাটল, চলল বেয়নেটের লড়াই। শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার সেনারা সেখানে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলো। এই হারের পর আর্জেন্টিনার তরুণ ও অপ্রশিক্ষিত কনস্ক্রিপ্ট (বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে আসা তরুণ) সেনাদের মনোবল পুরোপুরি ভেঙে গেল। তাদের কাছে পর্যাপ্ত শীতের পোশাক ছিল না, খাবার এবং গোলাবারুদের সরবরাহও ফুরিয়ে আসছিল। অন্যদিকে ব্রিটিশ বাহিনী একের পর এক পাহাড় নিজেদের দখলে নিয়ে রাজধানী পোর্ট স্ট্যানলির দিকে এগোতে লাগল। জুনের শুরুতে পোর্ট স্ট্যানলিকে ঘিরে থাকা পাহাড়গুলোতে—যেমন টু সিস্টার্স, মাউন্ট লংডন আর টাম্বলডাউন—শুরু হলো চূড়ান্ত যুদ্ধ। রাত হলেই আকাশ আলো করে কামান আর মর্টারের গোলা ছুটতে থাকত। কান পাতলেই শোনা যেত কামানের গর্জন আর আহত সেনাদের আর্তনাদ। ব্রিটিশ সেনারা রাতের আঁধারে একের পর এক পাহাড়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আর্জেন্টিনার বাহিনীকে চারদিক থেকে কোণঠাসা করে ফেলল। অবশেষে এলো সেই দিন—১৪ জুন, ১৯৮২ সাল। আর্জেন্টিনার কমান্ডার জেনারেল মারিও মেনেন্দেজ বুঝতে পারলেন, আর লড়াই করার কোনো উপায় নেই। হাজার হাজার তরুণ সেনার জীবন বাঁচানোর জন্য তিনি ব্রিটিশ বাহিনীর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করলেন। মাত্র ৭৪ দিনের মাথায় ফকল্যান্ডের আকাশে আর্জেন্টিনার পতাকা নেমে গেল, আবার উড়ে উঠল ব্রিটেনের ইউনিয়ন জ্যাক। যুদ্ধ তো শেষ হলো, কিন্তু রেখে গেল সাড়ে নয়শরও বেশি তরুণের লাশ আর দুই দেশের মানুষের মনে কখনো না ঘোঁচা এক দীর্ঘশ্বাস।

যুদ্ধ শেষ হলেই কি সব শেষ হয়ে যায়? মানুষের মন থেকে কি এত সহজে অপমানের দাগ মুছে যায়? মোটেও না। ফকল্যান্ড যুদ্ধে হেরে যাওয়ার পর আর্জেন্টিনার সাধারণ মানুষের বুকে যে ক্ষত তৈরি হয়েছিল, তা এক বিশাল ক্ষোভে রূপ নিল। তারা দেখল, তাদের দেশের সামরিক শাসকেরা ক্ষমতার লোভে শত শত তরুণকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল, অথচ শেষ পর্যন্ত কিছুই পাওয়া গেল না। এই পরাজয়ের ধাক্কায় আর্জেন্টিনার সেই স্বৈরাচারী সরকারের পতন হলো এবং দেশটিতে আবার গণতন্ত্র ফিরে এলো। কিন্তু ফকল্যান্ড বা মালভিনাস হারানোর বেদনা রয়েই গেল। ঠিক এই কারণেই, যুদ্ধের ঠিক চার বছর পর, ১৯৮৬ সালে যখন মেক্সিকোর আজটেকা স্টেডিয়ামে ফুটবল বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা আর ইংল্যান্ড মুখোমুখি হলো, তখন সেই ম্যাচ আর কেবল খেলা রইল না। আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে ওটা ছিল তাদের হারিয়ে যাওয়া ভাইদের, তাদের অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার দিন। মাঠে নামার আগে দিয়েগো মারাদোনার দলের মাথায় ফুটবল ছিল না, ছিল দেশের মান-সম্মান। আর সেই ম্যাচেই মারাদোনা করলেন ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত দুটি গোল। প্রথম গোলটি করার সময় মারাদোনা তাঁর হাতের ছোঁয়া লাগিয়েছিলেন। রেফারি দেখতে পাননি। পরে মারাদোনা মুচকি হেসে বলেছিলেন, ওটা ছিল "ঈশ্বরের হাত"। আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে এই গোলটি ছিল এক ধরণের চতুর প্রতিশোধ—ব্রিটেন যেভাবে জোর করে দ্বীপ নিয়েছিল, মারাদোনাও যেন ছলে-বলে-কৌশলে তাদের হারিয়ে দিলেন। আর তার ঠিক চার মিনিট পর মারাদোনা মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে ইংল্যান্ডের একের পর এক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে শতাব্দীর সেরা গোলটি করলেন। ওটা ছিল বিশুদ্ধ জাদুকরী ক্ষমতা, যা দিয়ে তিনি প্রতিপক্ষকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিলেন। আজ ২০২৬ সাল। এতগুলো বছর পার হয়ে গেছে, সাগরের সেই দ্বীপগুলো এখনো ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণেই আছে। ওখানকার বাসিন্দারাও ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবেই থাকতে চায়। কিন্তু ফুটবল মাঠে যখনই এই দুই দল মুখোমুখি হয়, তখনই ফকল্যান্ড যুদ্ধের সেই পুরনো ইতিহাস, সেই সাগরের গর্জন আর বরফ জলের রক্তের স্মৃতি ঠিকই ফিরে আসে। মানুষ হয়তো যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসে, কিন্তু ইতিহাসের সেই ধিকধিক করে জ্বলতে থাকা আগুন কখনো পুরোপুরি নিভে যায় না। খেলার মাঠের সবুজ ঘাস তাই বারবার মনে করিয়ে দেয়—কিছু পরাজয়ের শোধ কেবল বুটের জাদুতেও নেওয়া যায়।

 

 

 

৪৭ পঠিত ... ১৫ ঘন্টা ২৬ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top