ফেনীর বন্যায় যা দেখেছিলাম

পঠিত ... ১ ঘন্টা ৪২ মিনিট আগে

একটা বন্যা একটা মানুষের কাছ থেকে ঠিক কতটা কেড়ে নিতে পারে? একটা বাড়ি? নাকি একটা পুরো শৈশব? এই প্রশ্নের উত্তর আমি ২০২৪ সালের আগস্টে নিজের জীবন থেকে শিখেছিলাম। 

তখন কেবল রাজনীতি নিয়ে নতুন নতুন জানতে শুরু করেছি। এর মধ্যে একদিন ফেসবুকে কেউ একজন পোস্ট করল—এই উত্তাল সময়ে ঘরে বসে কী কী বই পড়বেন, তার একটা পিডিএফ লিস্ট। তালিকায় প্রথম বইটার নামই ছিল ‘রাজনীতির একশ বছর’। কৌতূহল নিয়ে ড্রয়িংরুমের বুকশেলফটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। তাকিয়ে দেখি, দ্বিতীয় তাকের ঠিক সবার প্রথমে সাজানো রয়েছে ওই বইটা। শুধু তা-ই নয়, লিস্টের দশটা বইয়ের মধ্যে পাঁচ-পাঁচটা বই-ই দেখি আমাদের নিজেদের বাসায় আছে!

মুহূর্তেই আব্বু আর আম্মুকে নিয়ে একটা তীব্র গর্ববোধ হলো আমার মনে। অস্বীকার করার উপায় নেই, ছোটবেলা থেকে আমি বড় হয়েছি বইয়ের গন্ধ শুঁকে, বইয়ের পাতায় হাত বুলাতে বুলাতে। জীবনের একটা লম্বা সময় পর্যন্ত আমার একটা অন্ধ বিশ্বাস ছিল, জগতের সব মানুষই বুঝি আমার মতোই শুধু দিন-রাত বই পড়ে কাটায়। এই বিশ্বাসটা জন্মেছিল মূলত আমার বাবা-মায়ের বইয়ের বিশাল কালেকশন দেখে। ছয় তাকের বিশাল দুই-দুটো বুকশেলফ ছিল আমাদের বাসায়। কী বই ছিল না সেখানে! সাহিত্যের ক্লাসিক থেকে শুরু করে সমকালীন রাজনীতি—ইউ নেম ইট অ্যান্ড ইউ উইল ফাইন্ড ইট হেয়ার। বিষয়টা ঠিক এমনই হয়ে গিয়েছিল।

এর মধ্যেই জুলাই মাস থেকে থেমে থেমে বৃষ্টি হতো। আর যতবার বৃষ্টি হতো, আমাদের বাসার সামনের রাস্তায় পানি উঠে যেত। স্বভাবতই সেই পানি আবার কিছুক্ষণ পর নেমেও যেত। আমাদের গলির মধ্যে মোট ছয়টা বিল্ডিং, যার মধ্যে তিনটা বিল্ডিং-ই একতলা। আমাদের বাসাটাও ছিল একতলা। ৫ আগস্ট যখন স্বৈরাচারের পতন হলো, দেশ নতুন করে স্বাধীন হলো, সেদিনও আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামছিল। আমরা সেই বৃষ্টিতে ভিজেই স্বাধীনতা উদযাপন করেছিলাম।

এভাবে দেখতে দেখতে আগস্টের ২০ তারিখ চলে আসে। ওই কয়েকদিন ধরে বৃষ্টির বেগ যেন আরও বেড়ে গেল। দিন নেই, রাত নেই—ক্রমাগত ঝুম বৃষ্টি। আমরা তিন ভাইবোন—আমি, পঞ্চম আর বিদিত। আমি আর পঞ্চম পিঠাপিঠি হলেও বিদিত আমাদের থেকে অনেক ছোট। আর বিদিত হচ্ছে স্পেশাল চাইল্ড, আমাদের ভীষণ আদরের।

২৩ তারিখ সকালটার কথা আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে। সকালে ঘুমটা ভাঙল ঝুম বৃষ্টির শব্দে। আব্বু আর পঞ্চম তখন ঢাকায়, আর ফেনীর এই বাসায় আমি, মা, বিদিত আর দাদু। আমাদের যৌথ পরিবার। পাশের ফ্ল্যাটেই থাকে আমার চাচার ফ্যামিলি। হঠাৎ ওখান থেকে আমার চাচাতো ভাইদের চিল্লাচিল্লি শুনতে পেলাম। বারান্দায় গিয়ে দেখি, বাসার সামনে থইথই পানি। তবে এই পানি এবার আর শুধু রাস্তায় আটকে নেই, বাসার ভেতর ঢুকে একদম সিঁড়ি ছুঁইছুঁই করছে।

মা তখন ছিলেন কলেজে। পরিস্থিতি দেখে তাড়াতাড়ি মাকে ফোনে আপডেট দিয়ে বললাম, যত দ্রুত সম্ভব বাসায় চলে আসতে। ঘণ্টাখানেক পর যখন মা বাসায় পৌঁছালেন, ততক্ষণে রাস্তার পানি উঠে গেছে হাঁটু সমান। আর আমাদের সিঁড়ির সামনের পানি খুব আস্তে আস্তে বাড়ছিল।

তখনো আমরা বিন্দুমাত্র টের পাচ্ছিলাম না সামনে ঠিক কী ভয়ানক দুর্যোগ অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। আমরা ভাবতেই পারছিলাম না প্রকৃতির কী নৃশংস রূপ দেখতে যাচ্ছি। এর মধ্যে তাকিয়ে দেখি, চাচি হন্তদন্ত হয়ে ঘরের কাপড়চোপড় সব গুছিয়ে ফেলছেন। আমরা হালকা অবাকই হলাম—এই সাধারণ বৃষ্টিতে মানুষ এভাবে তড়িঘড়ি করে কাপড় গুছায় কেন?

আমি ঢাকায় পঞ্চমকে কল দিয়ে বাসার সব আপডেট জানালাম। শুনে ও বুদ্ধি দিল—সিঁড়ির সামনে সিমেন্ট দিয়ে কোনোভাবে পানি আটকানোর ব্যবস্থা করা যায় কি না দেখতে। লাকিলি, আমাদের বাসায় কিছুটা সিমেন্ট জমা ছিল। মা কোনো রকমে সেই সিমেন্ট দিয়ে সিঁড়ির সামনে পানি আটকানোর একটা মরিয়া চেষ্টা করতে লাগলেন।

এরমধ্যে ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেলো ঘড়িতে তখন ঠিক বিকেল চারটা। আমি কেবল একটু জিরিয়ে নেওয়ার জন্য নিজের রুমে ঢুকেছি, অমনি দেখি বাথরুমের কমোড থেকে স্রোতের মতো ময়লা পানি ফুঁসে উঠছে। বুঝতে আর বাকি রইল না যে পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যে একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। আমাদের বাসার ঠিক পেছনেই ফুফুর বাসা, যেটা দোতলা। ফুফুরা সবাই তখন ঢাকায় থাকেন, বাসাটা খালি। সিদ্ধান্ত হলো—কোনোমতে ওখানে গিয়ে একটা রাত আমরা কাটাব।

একটা রাত যে চোখের পলকে জলবন্দি ৩০টা রাতে পরিণত হবে, সেটা যদি সেদিন জানতাম! যা-ই হোক, ততক্ষণে আমাদের একতলার বাসায় হাঁটু সমান পানি উঠে গেছে। মা শুধু পরবর্তী একটা রাত চলার মতো জরুরি অল্প কিছু জিনিসপত্র হাতড়ে একটা ব্যাগে তুলে নিলেন। চেনা ঘরটা ছেড়ে তখন আমাদের বের হতেই হলো।

আর আমি আমার প্রিয় বইগুলো বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছিলাম তখন। চেষ্টা করলাম নিচের তাকের সব বই পড়ার টেবিলে রাখতে এতটুকু বিশ্বাস পড়ার টেবিলে তো আর পানি উঠবেনা! অথচ কেবল টেবিল না পুরো বুকশেলফ ই পানির নিচে চলে যাবে এক রাতে সেটা কি আমি কল্পনা করতে পেরেছিলাম?

ঘর থেকে যখন বের হলাম, বুকটা ধক করে উঠেছিল। উঠোনের সেই চেনা পথটা ততক্ষণে উধাও, সেখানে থইথই করছে কোমর সমান নোংরা ও ঠান্ডা পানি। মা বিদিতকে শক্ত করে ধরেছেন, আর আমার চাচাতো ভাইয়েরা মিলে দাদুকে ধরে কোনো রকমে সেই জলের তীব্র স্রোত ভেঙে পেছনের ফুফুর বাসায় গিয়ে উঠলাম। ফুফুর দোতলার ফ্ল্যাটটা অন্ধকার, সুনসান। ওরা সবাই ঢাকায় থাকায় পুরো বাড়িটা খালি পড়ে ছিল। আমরা আর চাচার ফ্যামিলি মিলে যখন সেখানে আশ্রয় নিলাম, তখনো ভাবছি—এ আর এমন কী, কাল সকালেই তো জল নেমে যাবে, আবার নিজেদের ঘরে ফিরে যাব।

কিন্তু প্রকৃতি ততক্ষণে তার আসল রূপ দেখাতে শুরু করেছে। ফুফুর বাসার দোতলায় উঠে প্রথম যে ধাক্কাটা খেলাম—সেখানকার বাথরুমে কোনো পানি নেই! অথচ চারপাশে শুধু পানি আর পানি। প্রকৃতির কী নির্মম পরিহাস! বাথরুম ব্যবহার করতে বাধ্য হলাম বন্যার সেই নোংরা, ঘোলা পানি দিয়ে।

এরপর শুরু হলো এক অন্তহীন রাত। সারারাত ধরে বাইরে শুধু বৃষ্টির দানবীয় শব্দ। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে বুক কেঁপে উঠত। যত সময় যাচ্ছে, বৃষ্টির বেগ বাড়ছে, আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিচে পানির স্তর তরতর করে ওপরে উঠে আসছে। অন্ধকারে বন্দি আমরা কজন মানুষ শুধু আতঙ্কে একে অপরের মুখের দিকে চেয়ে রইলাম। কেউ কারও সঙ্গে কথা বলার মতো মানসিক অবস্থায় ছিলাম না।

পরদিন সকালবেলা যখন একটু আলো ফুটল, নিচে নেমে দেখলাম চারপাশটা যেন একটা অতল সমুদ্র। তখনও জানিনা কালকে যে পানি ছিলো গোড়ালি সমান এখন তা একরাতে হয়ে গেছে  কোমর সমান। নিচে নেমে বাসার দিকে এগিয়ে গেলাম ভয়ংকর পানির স্রোতে দিকে তাকিয়ে দেখি, ঘরের ভেতর তখন গলা সমান পানি! জানালাগুলো ডুবে গেছে। বাসায় উঁকি দিয়ে দেখলাম, আমাদের ভেতরের ফ্রিজটা অবলীলায় পানির ওপরে ভাসছে সাথে সোফা, ডাইনিং টেবিল। সব খেলনা নৌকার মতো ভাসছে নোংরা জলে। 

এসব দৃশ্য দেখে মা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। আমাকে জড়িয়ে ধরে ভেউভেউ করে কেঁদে উঠলেন। মায়ের সেই কান্না দেখে আমার মনে হলো, চোখের সামনে পুরো পৃথিবীটা বুঝি ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। এক নিমেষে আমরা যেন পথের ফকির হয়ে গেলাম। ঘরের ভেতর আমাদের সব রয়ে গেছে—কাপড়, দলিল, হাজারও স্মৃতি। কোনো রকম বুক বেঁধে, কোমর পানি ভেঙে নিজের আর বিদিতের কয়েকটা জামাকাপড় উদ্ধার করে আবার ফুফুর বাসার সেই দোতলায় ফিরে এলাম।

এরপর চারপাশজুড়ে বিভীষিকা। বিদ্যুৎ নেই, বিশুদ্ধ পানির কোনো ব্যবস্থাও নেই। চারপাশে পানি, কিন্তু এক ফোঁটা খাওয়ার পানি নেই। বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। সৌভাগ্যবশত ফ্রিজ ডুবে যাওয়ার আগে কয়েক প্যাকেট গরুর মাংস বের করা গিয়েছিল, এবং সেই গরুর মাংস দিয়ে আমরা টানা সাতটা দিন পার করলাম। বিষয়টা এমন যে এই জিনিসের প্রতি এত বাজে ভাবে রুচি  উঠলো যে মাংস দেখলেই বমি আসা শুরু করত একটা সময়ে। ভাগ্য ভালো যে, আমাদের সিলিন্ডার গ্যাস ছিল। সেখানে মাংস বারবার সিদ্ধ করে করে কোনোমতে পচন থেকে বাঁচিয়ে রেখেছিলাম। এভাবে একটানা শুধু মাংস খেতে খেতে মুখের রুচি একদম নষ্ট হয়ে যায়। সাত দিন পর মুখের স্বাদ বলতে আর কিচ্ছু অবশিষ্ট ছিল না। মানুষের জীবন যে এত দ্রুত এতটা জরাজীর্ণ হয়ে যেতে পারে, না দেখলে বিশ্বাস করা অসম্ভব।

মোমের চরম স্বল্পতা ছিল আমাদের। তাই একটুখানি আলো জ্বালিয়েই আবার নিভিয়ে দিতে হতো। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত আমরা এক অন্ধকার ও আতঙ্কের মাঝে বন্দি হয়ে কাটিয়েছি। এরই মধ্যে আকাশে শুরু হলো এক নতুন শব্দ। মাথার ওপর দিয়ে অনবরত হেলিকপ্টার উড়ে যাওয়ার আওয়াজ পেতাম। বুঝতাম, ত্রাণ আসছে। জীবনে কোনো দিন দূরতম কল্পনাতেও ভাবিনি যে, আমাদের মতো একটা পরিবারকে কখনো ত্রাণের আশায় বসে থাকতে হবে, মানুষের দেওয়া ত্রাণ নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে! কিন্তু ভাগ্য আমাদের সেই দিনটাও দেখাল।

ত্রাণ তো আসছে কিন্তু নেব কীভাবে? আমা্র বাসা মেইন রোডে হলেও ফুফুর বাসা ছিলো পিছের দিকে এবং মেইন রোডে যাওয়ার যে রাস্তা সেটা ছিল পানির নিচে। শেষমেষ একটা অপশন বের হলো আমাদের ছাদে যাওয়া তাহলে ত্রাণ নিতে পারবো কিন্তু সেখানে যাওয়ার পথটাও সহজ ছিল না। ফুফুদের বাসা থেকে ছাদে যাওয়ার পথে একটা লোহার শক্ত গ্রিল আটকানো ছিল। সেই দুর্যোগের দিনে ছেনি-হাতুড়ি দিয়ে পালাবদল করে পিটিয়ে, অমানুষিক কষ্ট করে আমরা সেই গ্রিলটাও ভাঙলাম। গ্রিল ভেঙে যখন ছাদে গিয়ে দাঁড়ালাম, তখন আমরা প্রথম বারের মত বন্যা দেখতে পেলাম চারদিকের শুধু পানি আর পানি সবাই কারেন্টের তার ধরে হেটে হেটে সামনে আগাচ্ছে! এই উকিলপাড়া, আমাদের চেনা গলি, চেনা গাছপালা—সব, সব ডুবে গেছে। আমরা যেন এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপে বন্দি কয়টা মানুষ।

বিশেষ করে ২০২৪-এর সেই ভয়ংকর শুক্রবারের কথা আমি কোনোদিন ভুলব না। সেদিন চারদিকের ছাদ, আশপাশের বাসা থেকে একটু পানি আর শুকনা খাবার পেতে কত চেষ্টাটাই  না করছিল।সেদিন হুজুর শেষবারের মত আজান দিয়েছিলো এরপর মসজিদেও জেনারেটর বন্ধ হয়ে গেলো।

চারপাশে থইথই পানির সমুদ্র, অথচ তৃষ্ণা মেটানোর মতো এক ফোঁটা জল নেই। ঘরে যেটুকু পানি অবশিষ্ট ছিল, তা শেষ হয়ে যাওয়ার ভয়ে বুক কাঁপত। এক চুমুক পানি একটু বেশি খেয়ে ফেললেই মনে মনে তীব্র অনুশোচনায় ভুগতাম, অপরাধবোধ হতো—কেন এই কঠিন সময়ে এতটা পানি নষ্ট করলাম! সেবারই বুঝেছিলাম, এক গ্লাস পানিও মানুষের জীবনে কতটা স্বস্তি আর শান্তি এনে দিতে পারে। 

একটু পর পর দূর থেকে এক-একটা ত্রাণের নৌকা আসত, আর মানুষ পাগলের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ত একটুখানি পানির জন্য। ফেনীর প্রতিটা মানুষেরই যথেষ্ট সামর্থ্য ছিল, অনেকেরই ঘরে অনেক কিছু ছিল। তবুও সেদিন প্রকৃতির নিষ্ঠুরতায় সব সমীকরণ বদলে গিয়েছিল। ত্রাণের নৌকা দেখলেই মানুষ হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে যেত, যদি একটা বোতল পানি বেশি পাওয়া যায়! তখন একটা আস্ত পানির বোতল চোখের সামনে দেখলেও যে মনের ভেতর কী অসীম শান্তি লাগগত, তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব।

এর মধ্যে জানি না পঞ্চম আর আব্বুর খবর তবে পরে ওর বন্ধুরা যারা ত্রাণ নিয়ে আসতো ওদের থেকে জানলাম বন্যার শুরুতেই আমার ভাই ঢাকা থেকে ত্রাণ নিয়ে কোনো রকমে ফেনীর উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল এবং ফেনী পৌঁছে ও নিজে অন্য এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার এবং ত্রাণের কাজে সাহায্য করছিল তবে আমাদের এলাকায় পানি এত বেশি ছিল যে ও চাইলেই আমাদের কাছে আসতে পারছিল না।চারদিকে তখন পানি আর পানি। প্রথম এক-দুই দিন ও আমাদের এই উকিলপাড়ার গলির ভেতরেই ঢুকতে পারল না। বাসা থেকে অল্প দূরেই ভাই ছিল, অথচ আমরা কেউ কারও কাছে যেতে পারছি না। এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে! এরপর পানি কিছুটা কমার পর পঞ্চম যেদিন বাসায় আসতে পারল, আমাকে জড়িয়ে ধরে ওর কী কান্না।

যা-ইহোক, ওই পরিস্থিতিতে ত্রাণ নেওয়া যে কত বড় এক ঝামেলার কাজ, তা সেদিন হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলাম। মানুষ একটা বোতল পানির জন্য কীভাবে হাহাকার করে, তা নিজের চোখে দেখলাম। বাজারে যে কত রকমের পানির কোম্পানি আছে, একের পর এক অদ্ভুত সব নামের পানির বোতল দেখে সেদিন প্রথম তা জানলাম। পিপাসের মুখে জলের বোতলের গায়ে লেখা ব্র্যান্ডের নাম দেখার কোনো অর্থ থাকে না, শুধু এক ঢোক গিলে তৃষ্ণা মেটানোর আকুতিটুকুই তখন সত্যি।

অবশেষে আরও কয়েকটা দিন কেটে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে পানি নামতে শুরু করল। দীর্ঘ এক বিভীষিকাময় অধ্যায়ের পর যখন বন্যা পরিস্থিতি ঠিক হলো, কাদা আর নোংরা আবর্জনায় মাখামাখি হয়ে আমাদের একতলার বাসাটা জেগে উঠল। আমরা তখন ফুফুর বাসা ছেড়ে নিজেদের চেনা আশ্রয়ে পা বাড়ালাম।

ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই বুকটা যেন চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। আমার সেই সাধের ছয় তাকের বিশাল দুটো বুকশেলফ তখন ধ্বংসস্তূপের মতো কাত হয়ে আছে। হাজার হাজার বই—যেগুলো আমার জীবনের চেয়েও প্রিয় ছিল, যেগুলো আমার অহংকার ছিল—সব নোংরা পানির নিচে পচে, গলে একাকার হয়ে গেছে। পৃষ্ঠাগুলো ফুলে-ফেঁপে একে অপরের সঙ্গে সেঁটে গেছে, অক্ষরের কালো রংগুলো ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গেছে। ‘রাজনীতির একশ বছর’ থেকে শুরু করে হুমায়ূন আহমেদ, জহির রায়হান, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়সহ সাহিত্যের কত শত অমূল্য সম্পদ, এক নিমেষে সব হারিয়ে গেল।

শুধু কি বই? ছোটবেলা থেকে পাওয়া মানুষের দেওয়া প্রতিটা ছোটখাটো গিফট, প্রতিটা স্মারক আমি খুব যত্ন করে গুছিয়ে রাখতাম। আমার ধারণা ছিল, এসব জিনিস হারিয়ে গেলে শৈশবের একটা অংশ হারিয়ে যায়। অথচ এই একটা মাত্র নিষ্ঠুর বন্যা আমার এত বছরের তিল তিল করে সাজানো সব স্মৃতি এক ঝটকায় ভাসিয়ে নিয়ে চলে গেল। 

দীর্ঘ ১০ দিন পর আমাদের এলাকায় কারেন্ট এলো। এতদিন পর আলো ফিরে আসায় মনে যে আনন্দ হওয়ার কথা ছিল, হলো তার উল্টো। আমরা এক অদ্ভুত ‘প্যারা’ খেলাম। মনে হচ্ছিল, এই চেনা আলোটাই যেন এখন আমাদের কাছে বড্ড অচেনা, বড্ড কৃত্রিম। এক ধাক্কায় স্বাভাবিক জীবনে ফেরার মানসিক প্রস্তুতিটুকুই যেন আমরা হারিয়ে ফেলেছিলাম।

সবকিছু ঠিক করে এরপর আমাদের বাসায় ফিরতে প্রায় এক মাসের মত সময় লেগেছিলো।

যতই বলি, যতই লিখি, সেই প্রলয়ংকরী বন্যা নিজের চোখে না দেখলে কেউ কোনোদিন বিশ্বাস করতে পারবে না যে কতটা ভয়ংকর আর নিষ্ঠুর ছিল সেই সময়টা। পানি নেমে গেছে ঠিকই, কিন্তু রেখে গেছে তার দাগ দেয়ালে। আপনি কখনো আমাদের বাসায় গেলে ই দেখতে পারবেন সেই দাগ। আমি যতবার এই দাগ দেখি এখনো আমার মনে হয় আমি দাঁড়িয়ে আছি গলা সমান পানির নিচে।আমাদের চেনা ঘরটাকে আর কখনো আগের মতো করে ফিরে পাওয়া যাবে না। এক বুক শূন্যতা আর বইয়ের গলিত পাতার গন্ধ বুকে নিয়ে আমি সেদিন বুঝেছিলাম—প্রকৃতির এই আগ্রাসনের সামনে মানুষের আজন্মের সঞ্চয় কতখানি ভঙ্গুর, কতখানি নগণ্য!

পঠিত ... ১ ঘন্টা ৪২ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top