১
বাঙালি চিরকালই এক হুজুগে এবং আত্মবিস্মৃত জাতি; তারা নিজের ইতিহাস ভুলে যেতে ভালোবাসে বলেই বার বার অন্যের তৈরি খাঁচায় মাথা গলাতে এত ব্যাকুল হয়। ২০২৬ সালের ৪ জুলাই, তীব্র গুমোট এক দ্বিপ্রহরে, যখন দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম জন্মদিনের কেক কাটা হচ্ছিল, তখন মূলত কাটা হচ্ছিল এ দেশের আত্মমর্যাদার শেষ সুতোটি। ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন যখন মৃদু হেসে লুই কানের নকশার দিকে তাকিয়ে একে দুই দেশের বন্ধুত্বের ইট-পাথর বলে ঘোষণা করলেন, তখন কোনো প্রাজ্ঞ মানুষের বুঝতে বাকি থাকেনি যে, ওটা আসলে আমাদের সার্বভৌমত্বের কবরফলক।
১৯৭১ সালে যে পরাশক্তিটি তাদের সপ্তম নৌবহর পাঠিয়ে আমাদের রক্তস্নাত স্বাধীনতাকে টুঁটি চেপে ধরতে চেয়েছিল, ২০২৬-এর নতুন ক্ষমতার পালাবদলের পর এ দেশের ১০ জন সুযোগ সন্ধানী সংসদ সদস্য সেই ঘাতকের হাত থেকেই গণতন্ত্রের সুবাসিত পারফিউম কিনতে লাইনে দাঁড়িয়ে গেছেন। ডা. ওসমান ফারুকের নেতৃত্বে গঠিত এই ‘আমেরিকান ককাস’ আসলে কোনো সংসদীয় কূটনীতি বা ‘পার্লামেন্টারি ডিপ্লোম্যাসি’ নয়; এটি হলো দিল্লির দাদাবাবুদের জুতো থেকে পা সরিয়ে ওয়াশিংটনের বুটের নিচে মাথা পাতবার এক নির্লজ্জ রিয়েলপলিটিক। আগে যারা মস্কোর ট্রেনের টিকিট আর ভারতের মিষ্টির বাক্সে নিজেদের ভাগ্য খুঁজত, আজ তারা মার্কিন বাজারের লোভ আর লবিংয়ের মায়াজালে নিজেদের বিকিয়ে দিতে প্রস্তুত। এই পশ্চিমমুখী অন্ধ দৌড়কে যারা গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতীক বলছেন, তারা আসলে অন্ধ, কারণ মার্কিনদের এই ‘গণতন্ত্র আর মানবাধিকারের’ মোড়কটি কখনোই নিঃশর্ত আসে না; এর প্রতিটি ভাঁজে লুকিয়ে থাকে এ দেশের বাজার, সম্পদ আর সার্বভৌমত্বকে গিলে খাওয়ার এক একটি অদৃশ্য বারকোড, যা এ দেশের মেরুদণ্ডহীন শাসকেরা ক্ষমতার লোভে সানন্দে স্ক্যান করে নিচ্ছেন।
২
এ দেশের তথাকথিত শিক্ষিত সমাজ আর রাজনীতিকেরা মনে করে, পশ্চিমাদের একটা সার্টিফিকেট পেলেই বুঝি জাত রক্ষা হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির আসল সত্যটা বড় নির্মম। যেসব দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক ও সামরিক মেরুদণ্ড শক্ত—যেমন ব্রিটেন, জার্মানি, ফ্রান্স কিংবা জাপানের মতো রাষ্ট্র—তাদের কিন্তু ওয়াশিংটনের সুনজরে থাকার জন্য আমাদের মতো এভাবে আইনসভার ভেতরে পাড়ার ক্লাবের মতো ‘আমেরিকান ককাস’ বানিয়ে সাইনবোর্ড ঝোলাতে হয় না। তাদের সম্পর্ক চলে সরাসরি, টেবিলের ওপর বুক ফুলিয়ে; সেখানে ন্যাটো আছে, বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা চুক্তি আছে, আর আছে সমানে সমানে দেনদরবারের ক্ষমতা। তারা এক টেবিলে বসে কড়া পানীয়তে চুমুক দিতে দিতেই দুনিয়ার ভাগ্য নির্ধারণ করে ফেলে, কারণ তাদের নিজেদের একটা ওজন আছে।
আর আমাদের কেন এই ফর্মালিটির খাঁচায় স্বেচ্ছায় মাথা গলাতে হচ্ছে? কারণ আমাদের তো জনগণের শক্তির ওপর ভরসা নেই, আমাদের আছে কেবল ওয়াশিংটনে থাকা ‘ডায়াস্পোরা’ নামক একদলা আবেগ আর কিছু ভাড়াটে লবিস্টের ধোঁয়াশা। দেশের ভেতরের ক্ষমতার বাতাস যখনই একটু ওলটপালট হয়, যখনই দিল্লি কিংবা বেইজিংয়ের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে ওয়াশিংটনের একটু কৃপা পাওয়ার প্রয়োজন পড়ে, তখনই এ দেশের শাসকেরা তড়িঘড়ি করে এমন একটা ককাসের তালি মারতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। আমাদের একদল বুদ্ধিজীবী একে মার্কিন বাজারে লুঙ্গি-শার্ট বেচার বড় রাস্তা বলে জাবর কাটছেন, আবার কেউ কেউ একে ভাবছেন বড় সাহেবের ড্রয়িংরুমে ঢোকার পাসওয়ার্ড। কিন্তু আসল সত্য হলো—যার নিজের ঘরের খুঁটি দুর্বল, তাকেই ভিনদেশি প্রভুর দরবারে একটু বেশি সেলাম ঠুকে লাইনে দাঁড়াতে হয়। ইউরোপের দেশগুলো যেখানে কোনো ককাস ছাড়াই আমেরিকার সাথে সমানে সমানে সম্পর্ক রাখে, সেখানে আমাদের একদল সাংসদকে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে বলতে হচ্ছে—‘হে প্রভু, আমরাও লাইনে আছি’, যা আসলে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক দেউলিয়াত্ব আর হীনম্মন্যতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
৩
আমরা যখন বাংলাদেশের ১০ জন সংসদ সদস্য নিয়ে একটা পুতুল ককাস বানিয়ে খুশিতে বাকবাকুম করছি, তখন আমাদের চোখ ফেরাতে হবে ওয়াশিংটনের আসল মাফিয়া সাম্রাজ্যের দিকে—যার নাম ‘ইসরায়েল ককাস’ এবং তাদের লবিংয়ের প্রধান আড়ত ‘আইপ্যাক’ (AIPAC)। ভাইরে ভাই, এটি কোনো পাড়ার চায়ের দোকানের আড্ডা বা কূটনৈতিক ভদ্রতার চাদরে ঢাকা কোনো ফোরাম নয়, এটি হলো মার্কিন রাজনীতির অলিন্দে ছড়িয়ে থাকা এক কুৎসিত ও অজেয় মায়াজাল। সেই ১৯৫০-এর দশক থেকে এই চক্রটি ক্যাপিটাল হিল ও হোয়াইট হাউসের ঘাড়ের ওপর এমনভাবে জেঁকে বসেছে যে, সেখানে ডেমোক্র্যাট আসুক আর রিপাবলিকান—সবার পকেটেই এদের তৈরি করা দাসত্বের একেকটি চাবি গোঁজা থাকে। এদের লবিং এস্টেটটি চলে মূলত শত শত মিলিয়ন ডলারের পঙ্কিল পুঁজিতে; যারা এই টাকার জোরে মার্কিন নির্বাচনে নিজেদের পছন্দের ক্রীড়নকদের বসায়, আর যে মুক্তমনা বা প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ এদের এই একাধিপত্যের বিরুদ্ধে সামান্যতম টুঁ শব্দ করে, তাকে কোটি কোটি ডলারের নির্বাচনী প্রচারণায় এক ঝটকায় রাজনৈতিকভাবে হত্যা করে মাঠ থেকে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়।
এই চরম ও অন্ধ আনুগত্যের পুরস্কারস্বরূপ আমেরিকা প্রতি বছর নিয়ম করে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের মারণাস্ত্র আর করদাতার অর্থ কোনো শর্ত ছাড়াই এদের পকেটে ঢেলে দেয়, অথচ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের লক্ষ লক্ষ ক্ষুধার্ত ও আশ্রয়হীন মানুষের জন্য তাদের তহবিলে টান পড়ে। তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা একে ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ বা ‘গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের মেলবন্ধন’ বলে সুমিষ্ট জাবর কাটলেও, প্রাজ্ঞ মানুষেরা স্পষ্ট দেখতে পান যে এটি আসলে মার্কিন সার্বভৌমত্বের এক চরম অবমাননা, যেখানে স্বয়ং পরাশক্তিটিই এক অদৃশ্য সুতার টানে পুতুলের মতো নাচছে। আমাদের মতো একটি পরনির্ভরশীল দেশ যখন ক্ষমতার পালাবদলে টিকে থাকার জন্য বা বাজারে শার্ট-লুঙ্গি বেচার জন্য একটা ঠুনকো ককাস বানিয়ে লাইনে দাঁড়ায়, তখন সেই দৃশ্যটি যতই কৌতুককর হোক না কেন, তা ওই আন্তর্জাতিক মহাজনদের কুৎসিত খাতার হিসাবের কাছে নস্যি মাত্র। তবে এই বড় বড় খেলার পেছনে যে দীর্ঘমেয়াদি দাসত্ব ও সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেওয়ার ছক থাকে, তার ঝাঁজ টের পাওয়ার মতো কলিজা বা মগজ এ দেশের আত্মবিস্মৃত জাতির কখনোই ছিল না, আর আজও নেই।



পাঠকের মন্তব্য