মানুষের স্মৃতি বড্ড অদ্ভুত। আমরা যা ভুলে যেতে চাই, সেটাই বারবার ফিরে আসে। আর যা মনে রাখা দরকার, তা হয়তো ধুলোবালিতে চাপা পড়ে যায় কোনো পুরোনো আলমারির কোণে। এই যে ‘সতলুজ’ নামে একটা মুভি নিয়ে ইদানীং খুব শোরগোল শোনা যাচ্ছে। অনেকেই বলছে, এটি নাকি এক অস্থির সময়ের দর্পণ। মুভিটা আমি দেখিনি, সম্ভবত দেখবও না। কিছু গল্প দেখার চেয়ে অনুভব করা বেশি কষ্টের।
পাঞ্জাবের সেই নব্বইয়ের দশকের কথা মানুষ ভুলে যেতে চায়। একটা সময় ছিল, যখন রাত নামলে বাতাসের শব্দেও বন্দুকের গুলির আওয়াজ পাওয়া যেত। মানুষ নিখোঁজ হতো। সকালে ঘুম থেকে উঠে জানা যেত, প্রতিবেশীর ছেলেটা আর নেই। কেন নেই? উত্তর নেই। কোথায় গেল? সেটাও অজানা। এই যে ‘অজানা’ শব্দটা, এর পেছনে কত গভীর হাহাকার লুকিয়ে থাকে, তা কেবল তারাই জানে, যারা সেই নিঃসঙ্গতাটুকু বয়ে বেড়িয়েছে।
শোনা যাচ্ছে, এই মুভিটি নাকি একজন মানুষের গল্প বলছে; যিনি এক সাধারণ ব্যাংকের কর্মচারী ছিলেন। কিন্তু মানুষের বিপদে মানুষ যখন এগিয়ে আসে, তখন তার আর সাধারণ থাকা হয় না। তিনি কোনো বড় যোদ্ধা ছিলেন না, তিনি কেবল সত্যের খোঁজ করতে চেয়েছিলেন। অথচ সত্যের খোঁজ করাটা কি এতই সহজ? আমরা সবাই জানি, সত্য বড্ড তেতো। আর সেই সত্য যখন কারও ক্ষমতার চেয়ারকে নড়বড়ে করে দেয়, তখন সেই সত্যকে কবরের অন্ধকারেই পাঠিয়ে দেওয়া নিরাপদ।
মুভিটা নাকি এখন দেখাও যাচ্ছে না। নিষিদ্ধ? নাকি হারিয়ে গেছে? আজকাল অনেক কিছুই হারিয়ে যায়। কখনো সেন্সর বোর্ডের কাঁচিতে, কখনো অদৃশ্য কোনো ইশারায়। মানুষ বলে, এটা নাকি ইতিহাস। কিন্তু আমার মনে হয়, ইতিহাস অনেকটা সেই পুরোনো বইয়ের মতো, যার অনেক পাতা ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। সতলুজ সম্ভবত সেই ছিঁড়ে ফেলা পাতারই এক টুকরো আখ্যান। নদীর নাম তো সতলুজ। নদী বয়ে যায়, সব ময়লা ধুয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা, কিন্তু কিছু স্মৃতি নদীর স্রোতেও মোছে না। সেগুলো হাড়ের মতো জেগে থাকে বালুচরে।
যাই হোক, মুভিটি নিয়ে যে বিতর্ক শোনা যাচ্ছে, তা আরও অদ্ভুত। বারো শতের বেশি কাঁচির কোপ নাকি চেয়েছিল কর্তৃপক্ষ! একটা গল্প বলার জন্য এত কাঁচি কেন প্রয়োজন হয়, তা আমার মাথায় ঢোকে না। হয়তো কোনো কোনো দৃশ্য দেখলে মানুষের ঘুম ভেঙে যায়, আর মানুষ ঘুম থেকে জেগে উঠলে চারপাশের শান্ত পরিবেশটা একটু বেশিই অস্থির হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র চায় সবাই শান্ত থাকুক, আর সত্যের ফেরিওয়ালারা চায় সবাই জেগে উঠুক। এই দুই চাওয়ার লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জেতে কে? ইতিহাস বলে, শেষ পর্যন্ত জেতে সময়।
শুনেছি, মুভিটি নাকি মাত্র ৪৮ ঘণ্টা দেখা গিয়েছিল। তারপরই উধাও। ঠিক যেন জাদুর কোনো খেলা! একটা চলচ্চিত্র আসে, মানুষের হৃদয়ে হাহাকার জাগিয়ে তোলে, আর তারপরই কোনো এক অদৃশ্য জাদুকর তার হাত সরিয়ে নেয়। কেন সরানো হলো? নিরাপত্তার ভয়? নাকি সত্যের ভয়? আমার ধারণা, ভয়টা অন্য কোথাও। যখন আমরা কোনো কিছুকে আড়াল করতে চাই, তখনই আমরা বেশি করে সেটার দিকেই তাকিয়ে থাকি। নিষিদ্ধ জিনিস দেখার একটা অদ্ভুত নেশা আছে মানুষের মধ্যে।
আমি জানি, পাঞ্জাবের সেই সময়কার কথা বলতে গেলে অনেকেরই বুকের ভেতরটা একটু কেঁপে ওঠে। পুলিশের বন্দুক আর নিরপরাধ মানুষের কান্নার মধ্যে কোনো ব্যবধান ছিল না তখন। মুভিটি নাকি সেই হাড়কাঁপানো সত্যকেই খুব নিরাসক্তভাবে দেখিয়েছে। তারা নাকি দেখিয়েছে, কীভাবে একটা কাগজপত্রের স্তূপ থেকে হাজার হাজার মানুষের নিখোঁজ হওয়ার প্রমাণ খুঁজে পাওয়া যায়। ব্যাংকের কর্মচারীটি যখন হিসাব মেলাচ্ছিলেন, তিনি কি জানতেন যে এই হিসাব মেলাতে গিয়ে তাঁর নিজের জীবনের হিসাবটাই একদিন শেষ হয়ে যাবে? অদ্ভুত ব্যাপার, মানুষ নিজের জন্য নয়, অন্যদের জন্য বিপদে পড়ে। আর সেই বিপদ যখন সামনে আসে, তখন সে হাসিমুখে মৃত্যুকে বরণ করে নেয়। যে সাহস আমাদের নেই, সেই সাহস আমরা পর্দায় দেখি। দেখে মনে মনে ভাবি, "বাহ, কী অসাধারণ!" কিন্তু বাস্তবে? বাস্তবে আমরা সবাই নিভৃতে নিজের চায়ে চুমুক দিয়ে খবর দেখি, আর বলি, "উফ, কী ভয়ানক সময় ছিল!"
শেষ পর্যন্ত কী থাকে? সব নাটক তো শেষ হয়। সব সিনেমাও একদিন শেষ হয়। সিনেমার পর্দায় নায়ক যখন মারা যান, তখন দর্শক হাততালি দিয়ে হল থেকে বেরিয়ে আসে। কিন্তু যে নায়ক বাস্তবের জমিনে হারিয়ে যান, তাঁর জন্য কোনো হাততালি থাকে না। থাকে কেবল শূন্যতা। এই মুভিটা নিয়ে এত যে হইচই, এত যে সেন্সরশিপ, এর সবটুকুর পেছনে হয়তো একটাই সত্য লুকিয়ে আছে: মানুষ সত্যকে ভয় পায়। আমরা জানি, একদিন আমাদেরও সেই সত্যের মুখোমুখি হতে হবে, যেখানে সব হিসাব কড়ায়-গণ্ডায় মিলিয়ে নিতে হয়।
কিছু মানুষ বলে, এটা নাকি প্রপাগান্ডা। কেউ বলে, এটা নাকি ইতিহাস। আমার কাছে মনে হয়, এটা কোনো প্রপাগান্ডাও না, ইতিহাসও না। এটা একটা দীর্ঘশ্বাস। আমাদের অনেকের বুকের ভেতর এমন হাজারো দীর্ঘশ্বাস জমা হয়ে আছে, যা আমরা কোনো দিনও কাউকে বলতে পারিনি। নিখোঁজ হওয়া মানুষগুলোর নাম হয়তো সরকারি কোনো খাতায় লেখা নেই, কিন্তু তারা আমাদের স্মৃতির আয়নায় ঠিকই ভেসে ওঠে। মুভিটা না দেখলেও আমি জানি, সেখানে কী দেখানো হয়েছে। সেখানে দেখানো হয়েছে মানুষের অসীম অসহায়ত্ব আর সেই অসহায়ত্বের ভেতর জন্ম নেওয়া অদ্ভুত এক সাহসের গল্প।
অনেকে প্রশ্ন করে, মুভিটা কেন নিষিদ্ধ হলো? এর সহজ উত্তর হয়তো কারও কাছেই নেই। নিষিদ্ধ করা মানেই কি ধামাচাপা দেওয়া? না, নিষিদ্ধ করা মানে হলো বিষয়টাকে মানুষের মগজে চিরস্থায়ী করে দেওয়া। যেটা নিষিদ্ধ হয়, সেটা মানুষের মনে আরও গভীরভাবে গেঁথে যায়। সতলুজ নদী বয়ে যাবে, তার জল হয়তো ঘোলা হবে, কিন্তু নদী কখনো তার গতিপথ বদলাবে না। এই মুভিটিও হয়তো কোনো দিন কারও চোখের সামনে ধরা দেবে, কিংবা হয়তো হারিয়ে যাবে ইতিহাসের অতল গহ্বরে। তাতে কিছু আসে যায় না। সত্যের একটা নিজস্ব গতি আছে, সে কারও জন্য অপেক্ষা করে না। আমরা যারা বেঁচে আছি, তারা কেবল তাকিয়ে থাকি। কখনো সিনেমার পর্দায়, কখনো খোলা আকাশের নিচে, ঠিক যেমন এখন আমি তাকিয়ে আছি এক টুকরো বৃষ্টির দিকে, আর ভাবছি সেই মানুষটির কথা, যিনি চেয়েছিলেন কেবল হিসাব মেলাতে। দিনশেষে, আমাদের সবারই কি কিছু না কিছু হিসাব মেলানো বাকি থেকে যায় না?



পাঠকের মন্তব্য