১
বিকেলের আকাশটা আজ অদ্ভুত রকমের নীল। শান্তিনিকেতনের আম্রকুঞ্জের ছায়াগুলো লম্বা হতে শুরু করেছে। আমি একটা আরামকেদারে বসে ছিলাম। হাতে আধখাওয়া একটা চুরুট। বাতাসের গন্ধটা আজ ভারী, কেমন যেন অন্য সময়ের ঘ্রাণ লেগে আছে তাতে। হঠাৎ মনে হলো, আমার ঠিক সামনে শূন্য থেকে একটা আলো এসে পড়ল। কৌতূহলী হওয়ার বয়স অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে, তাই আমি খুব একটা অবাক হলাম না। আলোর ঝিলিক থেকে একটা লোক বেরিয়ে এলো। পরনে অদ্ভুত রকমের কাপড়, কিন্তু চোখ দুটোয় কেমন যেন একটা ভয়ের ছাপ।
লোকটি আমার দিকে তাকিয়ে আমতা-আমতা করে বলল, আপনিই কি... মানে, আপনি কি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর?
আমি চুরুটে একটা টান দিয়ে ধীরস্থির গলায় বললাম, নামটা তো তাই। কিন্তু তুমি এভাবে আকাশ ফুঁড়ে এলে কেন? মেঘের বাড়িতে কি জায়গা নেই?
লোকটি ঘামছে। তার কপালে বিন্দু বিন্দু জল। সে বলল, আমি অনেক দূর থেকে আসছি। অনেক পরের সময় থেকে। একটা ভুল ভাঙাতে এসেছি। লোকে বলে, আপনি নাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় বলেছিলেন— মূর্খের দেশে আবার কিসের বিশ্ববিদ্যালয়!
আমি মৃদু হাসলাম। আমার এই হাসিটা লোকে ভয় পায়, অথচ এতে ভয়ের কিছু নেই। আমি বললাম, মানুষের কাজই হলো বানিয়ে বলা। আমি মূর্খের দেশে বিশ্ববিদ্যালয় চাইনি— একথা যারা রটায়, তারা কি ভেবে দেখেছে, আমি নিজেও তো মানুষ গড়ার কারিগর? মূর্খতা দূর করার জন্যই তো সারাজীবন লিখলাম, গান বাঁধলাম। আর ঢাকা... ঢাকা তো আমার নিজেরই শহর। সেখানকার মানুষগুলোর সাথে আমার আত্মার সম্পর্ক। তাদের আমি মূর্খ বলব?
লোকটি যেন একটু আশ্বস্ত হলো। সে এবার নিচের দিকে তাকিয়ে বলল, মানুষের স্মৃতি খুব অদ্ভুত। তারা সত্য ভুলে মিথ্যার ওপর তিলক পরাতে ভালোবাসে।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। চারপাশটা একবার দেখে নিলাম। আমগাছগুলো যেন আমার কথাগুলো শুনছে। আমি বললাম, তুমি তাহলে সেই ভবিষ্যৎ থেকে এসেছ যেখানে ইতিহাস নিয়ে খুব কাটাছেঁড়া করা হয়? আচ্ছা, তুমি কি চাও না আমি ওদের বলি, শিক্ষার আলো যেখানেই জ্বলে, সেখানেই আমার আশীর্বাদ থাকে? বিশ্ববিদ্যালয়ের ইট-কাঠ-পাথরের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেখানে তৈরি হওয়া মানুষের বিবেক।
লোকটি আমার চোখের দিকে তাকাল। তার চোখে জল চিকচিক করছে। সে বোধহয় এমন উত্তর আশা করেনি। আমি চুরুটের ছাই ঝেড়ে বললাম, তুমি এসো, আমার সাথে একটু হাঁটো। গোধূলির আলোয় শান্তিনিকেতন দেখতে দেখতে আমরা বরং ঢাকা নিয়ে গল্প করি। আমার তো মনে পড়ে সেইসব দিনগুলোর কথা, যখন পদ্মার ঢেউয়ের শব্দে আমার কবিতার ছন্দ তৈরি হতো।
লোকটি আমার পাশে পাশে হাঁটা শুরু করল। তার চলার ছন্দে অদ্ভুত এক অস্থিরতা। আমি মনে মনে ভাবলাম, সময় মানুষকে কত কীই না ভুলিয়ে দেয়। কিন্তু সত্য তো আর নদী নয় যে শুকিয়ে যাবে। সত্য হলো বাতাসের মতো— তাকে ধরা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায়।
আমি বললাম, চলো, চা খেতে খেতে তোমাকে ঢাকা নিয়ে আমার ভাবনার কথা বলি। ওই শহরের মাটিতে আমার অনেক ভালোবাসা মিশে আছে।
লোকটি অবাক হয়ে আমার দিকে চাইল। মনে হয়, সে এমন একজন রবীন্দ্রনাথকে খুঁজে পায়নি, যে কিনা তার সমালোচনাকেও হাসিমুখে গ্রহণ করে। বিকেলের সূর্যটা তখন দিগন্তের ওপারে ডুবছে। দূরে কোথাও একটা পাখি ডাকছে— একদম যেন আমার কোনো গানের সুরের মতো।
২
চা খেতে খেতে লোকটার সাথে কথা হচ্ছিল। সে খুব মন দিয়ে আমার কথা শুনছিল, মাঝে মাঝে নোটবুক বের করে কিছু একটা টুকে নিচ্ছে। আধুনিক মানুষেরা সব কিছু লিখে রাখতে পছন্দ করে, যেন স্মৃতি তাদের ওপর ভরসা করতে ভয় পায়। আমি বললাম, তুমি কি খুব ক্লান্ত? এই শান্তিনিকেতনে তো অনেক শান্তি। এখানে মানুষ সময়ের কথা ভুলে যায়।
লোকটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আমি শান্তির খোঁজে আসিনি রবীন্দ্রনাথবাবু। আমি এসেছি একটা দীর্ঘস্থায়ী অপবাদ মোচন করতে। আপনি জানেন না, একশ বছর পর আপনার নামে কী রটনা ছড়ানো হয়েছে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে আপনার নাকি দা-কুমড়া সম্পর্ক।
আমি হাসলাম। আমার এই হাসির শব্দে একটা শুকনো পাতা ঝরে পড়ল। আমি বললাম, দা-কুমড়া সম্পর্ক! যারা আমার লেখা পড়ে, তারা তো জানে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কতটা পক্ষে ছিলাম। কিন্তু মানুষের মন বড় অদ্ভুত জায়গা। তারা যেটা বিশ্বাস করতে চায়, সেটাই তারা সত্য হিসেবে ধরে নেয়। আমি কি অতই সংকীর্ণমনা যে শিক্ষার আলোর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকব?
লোকটি বলল, মানুষ তো যুক্তি বোঝে না। তারা শুধু আবেগ বোঝে। রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে আপনার নাম ব্যবহার করে তারা অনেক কিছু হাসিল করে ফেলে।
আমি আমার চশমাটা খুলে পরিষ্কার করতে করতে বললাম, তুমি কি ঢাকা শহর দেখেছ? ওই শহরের মানুষেরা খুব আবেগপ্রবণ, খুব সহজ-সরল। তাদের তো আমার প্রতি কোনো ক্ষোভ থাকার কথা নয়। বরং আমি তো চেয়েছিলাম ঢাকার ছেলেমেয়েরা শিক্ষার সুযোগ পাক, বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখুক। আমার শান্তিনিকেতন তো সেই স্বপ্নই দেখেছে।
হঠাৎ দূরে একটা গান ভেসে এল। বাতাসটা যেন সুরের ভেলায় চড়ে আসছে। আমি বললাম, শোনো, একটা কথা তোমাকে বলি। ইতিহাস সব সময় লেখকদের হাতের অস্ত্র হয় না। ইতিহাস কখনো কখনো নিস্পৃহ দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। সে দেখে কে কাকে নিয়ে মিথ্যে অপবাদ দিচ্ছে, আর কে নীরব থেকে সব সহ্য করে যাচ্ছে।
লোকটি কৌতূহলী হয়ে তাকিয়ে রইল। আমি চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে বললাম, ঢাকা নিয়ে আমার অনেক পরিকল্পনা ছিল। অনেক স্বপ্ন ছিল। আমি জানি না সেসব কতটুকু পূরণ হয়েছে। তবে এটা জানি, শিক্ষার চেয়ে বড় কোনো ধর্ম নেই। আর সেই ধর্ম যখন যেখানে পালিত হয়, আমি তার পক্ষে।
সে আমার দিকে একটা ছোট্ট যন্ত্র বাড়িয়ে দিল। ওটার ভেতরে নীল রঙের আলো জ্বলছে। সে বলল, আপনি যদি কিছু বলতেন, আমি রেকর্ড করে নিয়ে যেতাম। ভবিষ্যতে মানুষ এটা শুনলে হয়তো বিশ্বাস করত।
আমি মাথা নেড়ে বললাম, “আমার কথা মানুষের কানে পৌঁছানোর জন্য কোনো যন্ত্রের প্রয়োজন নেই। আমার কবিতা, আমার গানই যথেষ্ট। মানুষ যদি মিথ্যে বিশ্বাস করতে চায়, তবে আমার কন্ঠস্বরও তাদের মন বদলাতে পারবে না। তবে তুমি যখন এত দূর থেকে এসেছ, তখন নিশ্চয়ই একটা উদ্দেশ্য আছে। সেই উদ্দেশ্য কি সফল হবে?
লোকটি মাথা নিচু করল। আমি বুঝলাম, তার মনে অনেক প্রশ্ন এখনো জমা হয়ে আছে। আমি তাকে বললাম, কাল ভোরে যখন কুয়াশা সরবে, তখন তুমি আম্রকুঞ্জের ওই বড় গাছটার নিচে এসে দাঁড়াবে। সেখানে জীবনের অনেক কঠিন প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়। এখন যাও, আজ রাতে বরং স্বপ্ন দেখো— এমন এক ঢাকার, যেখানে প্রতিটি মানুষের হাতে একটা করে বই আছে।
সে চলে যাওয়ার সময় পিছু ফিরে চাইল। তার চোখে যেন একটা অতৃপ্তি। আমি জানালার পাশে বসে আকাশের দিকে তাকালাম। অনেক নক্ষত্র জ্বলছে। তাদের মধ্যে কোনটি ঢাকা শহরের মাথার ওপর? আমি জানি না। আমি কেবল জানি, অন্ধকার কোনোদিন আলোর গন্তব্য ঠেকাতে পারে না।
৩
ভোরের কুয়াশা এখনো কাটেনি। আম্রকুঞ্জের গাছগুলো যেন এক একটা রহস্যময় ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি গিয়ে দেখলাম, ছেলেটি সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনের অদ্ভুত কাপড়টা শিশিরে ভিজে গেছে। সে আমাকে দেখেই একটু হাসল। ওই হাসিতে কোনো ক্লান্তি নেই, আছে এক গভীর বিষণ্নতা।
আমি ওর কাঁধে হাত রেখে বললাম, ফেরার সময় হয়েছে?
সে মাথা নাড়ল। বলল, হ্যাঁ, ফেরার সময় হয়েছে। কিন্তু আমি কী নিয়ে ফিরব? আমার কাছে তো কোনো দলিল নেই, কোনো প্রমাণপত্র নেই যা দিয়ে আমি আপনার বিরুদ্ধে ওঠা অপবাদ ধুয়ে ফেলতে পারি।
আমি চুরুট ধরানোর চেষ্টা করলাম, কিন্তু দেশলাইয়ের কাঠিটা বারবার নিভে যাচ্ছে। আমি বললাম, প্রমাণের চেয়েও বড় হলো মানুষের বোধ। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে ছিলাম না— এই সত্যটা কি তোমার মনের ভেতরে খুব শক্ত করে গাঁথা?
সে দৃঢ় গলায় বলল, হ্যাঁ। আমি এখন নিশ্চিত।
আমি হাসলাম। বললাম, তাহলে ওটাই যথেষ্ট। ইতিহাস যখন ভারী হয়ে যায়, তখন তাকে হালকা করার জন্য সত্যের চেয়ে বড় কোনো সাবান নেই। তুমি ফিরে গিয়ে শুধু এটুকু বলো, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে নন, তিনি মূর্খতার বিরুদ্ধে। তিনি সেই সব মানুষের বিরুদ্ধে, যারা জ্ঞানকে ছোট করে দেখে।
সে পকেট থেকে একটা ছোট্ট ডায়েরি বের করল। ওতে কিচ্ছু লেখা নেই, শুধু একটা পাতায় আমার একটা ছবি আঁকা। আমি পাতাটা উল্টে দিলাম। দেখলাম সেখানে ঢাকা শহরের মানচিত্রের ওপর হালকা করে একটি অটোগ্রাফ দিয়ে দিয়েছি। সে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল।
আমি বললাম, এটা কোনো দলিল নয়, এটা একটা স্মৃতি। ঢাকা আমার কাছে সব সময় একটা স্বপ্নের নাম। আমার লেখা কবিতাগুলো যেন ওই শহরের অলিগলিতে হেঁটে বেড়ায়, এটাই আমি চাই।
হঠাৎ বাতাসটা জোরালো হয়ে উঠল। আম্রকুঞ্জের পাতাগুলো একসাথে শব্দ করে উঠল— ঠিক যেন কোনো হারমোনিয়ামের বাদ্য। ছেলেটির শরীরটা ধীরে ধীরে আবছা হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে সে কুয়াশার সাথে মিশে যাচ্ছে। সে যাওয়ার আগে শুধু বলল, আপনি অমর, রবীন্দ্রনাথবাবু। আপনার কোনো অপবাদই আপনাকে স্পর্শ করতে পারবে না।
আমি কিছুই বললাম না। সে অদৃশ্য হয়ে গেল। শুধু তার দাঁড়িয়ে থাকা জায়গাটুকুতে ঘাসের ওপর কিছু শিশিরবিন্দু চকচক করছে। আমি আরামকেদারায় ফিরে এসে বসালাম। সূর্য উঠছে। সোনালী আলোয় শান্তিনিকেতন জেগে উঠছে।
আমার মনে হলো, পৃথিবীটা বড় অদ্ভুত। মানুষ বেঁচে থাকতে একেকজনকে একেকভাবে বিচার করে। মরে যাওয়ার পরও কি সেই বিচার চলে? বোধহয় চলে। তবে তাতে রবীন্দ্রনাথের কিছু যায় আসে না। আমার কাজ তো কবিতা লেখা, গান গাওয়া আর মানুষের সাথে হৃদয়ের বন্ধন তৈরি করা।
আমি একটা লম্বা টান দিলাম চুরুটে। দূর থেকে ছেলেদের পড়ার শব্দ ভেসে আসছে— ওঁ সহ নাববতু...।
শান্তির মন্ত্র। এই মন্ত্রই তো সব মিথ্যে অপবাদের চেয়ে শক্তিশালী। আমি চোখ বুজলাম। ঢাকা শহরটা যেন আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল— বুড়িগঙ্গার জল, ভিড় রাস্তা, আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে হেঁটে চলা তরুণ-তরুণী। তারা আমার গান গাইছে।
আমার মনে হলো, মিথ্যা অপবাদগুলো বাতাসের মতো উড়ে যাচ্ছে। আর পড়ে থাকছে শুধু সত্য— আমি ঢাকার বন্ধু, শিক্ষার বন্ধু।
সব কিছুই শেষ পর্যন্ত সুন্দর। শেষ পর্যন্ত সত্যেরই জয় হয়। আমার ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু হাসি ফুটে উঠল। কুয়াশা কেটে গেছে। এখন শুধুই পরিষ্কার আকাশ।



পাঠকের মন্তব্য