জোড়াসাঁকোর এক বর্ষণমুখর দিনে জন্ম নেয় 'কেন মেঘ আসে হৃদয়-আকাশে'

৪৩ পঠিত ... ১৮ ঘন্টা ১৭ মিনিট আগে

 

বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি। শ্রাবণের মেঘলা দুপুরে চারপাশটা কেমন যেন আবছা অন্ধকার হয়ে এসেছে। জোড়াসাঁকোর এই বড় বাড়িটার দোতলার ঘরে একলা বসে আছেন চব্বিশ বছর বয়সী এক যুবক।

তিনি ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছেন। কোলে একটা মোটা খাতা, হাতে ফাউন্টেন পেন। চশমাটা নাকের ডগায় নেমে এসেছে। জানালার বাইরে তাকালে দেখা যায়, বাগানের কদম গাছটা ভিজছে। পাতা বেয়ে টপ টপ করে জল পড়ছে মাটিতে। এই রকম দিনে মানুষের মন কেমন যেন উচাটন হয়ে যায়। বিষণ্ণতা আর এক অদ্ভুত আনন্দ একসঙ্গে এসে ভিড় করে বুকে।

তিনি খাতার পাতায় কলম ছোঁয়ালেন। কিন্তু কিছু লিখলেন না। তাঁর মনে হচ্ছিল, ঘরের কোণে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। অবয়বহীন, ছায়ার মতো। অথচ চেনা। যেন খুব চেনা কেউ। কিন্তু যেই ভালো করে তাকাতে যাচ্ছেন, অমনি সেই ছায়া মিলিয়ে যাচ্ছে বৃষ্টির অন্ধকারে।

তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এই বয়সেই তিনি ব্রাহ্মসমাজের গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন। চারদিকে শুধু ব্রহ্মসংগীত, উপাসনা আর আধ্যাত্মিকতার চর্চা। কিন্তু মন কি আর সবসময় এক জায়গায় স্থির থাকে? মানুষের মনটা আসলে একটা আকাশ। সেই আকাশে কত মেঘ জমে! মোহ, মায়া, জাগতিক সব চিন্তা এসে ভেতরের আসল আলোটাকে ঢেকে দেয়। যখন একটুখানি আধ্যাত্মিক আলো দেখা যায়, চোখের পলকে আবার তা হারিয়ে যায়। তখন বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে—এই বুঝি সব হারিয়ে গেল! হারানোর ভয়টাই সবচেয়ে বড় ভয়।

তিনি বিড়বিড় করে বললেন, কেন মেঘ আসে হৃদয়-আকাশে? তোমারে দেখিতে দেয় না...

কলমের নিব থেকে কালির ফোঁটা খাতার পাতায় পড়ল। তিনি লিখতে শুরু করলেন। মনের গভীর থেকে উঠে আসা এই ব্যাকুলতা সাধারণ কোনো ছন্দে প্রকাশ করা যাবে না। এর জন্য চাই কীর্তনের সেই চেনা দোলা। মাথায় গুনগুন করে উঠল ‘কাফি’ রাগের সুর। যে সুর উত্তরপ্রদেশ-বিহারের লোকগান থেকে উঠে এসে মানুষের মনে ভক্তি আর বিরহের এক মায়াবী জাল বনে দেয়।

দরজায় টোকা দিয়ে যে ভেতরে ঢুকল, সে আর কেউ নয়—জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির এক চেনা অনুগত ভৃত্য। কাঙ্গালীচরণ বাবু তখনো আসেননি, যিনি পরে এই গানের স্বরলিপি তৈরি করবেন। ভৃত্যটি একটি পিতলের রিকাবিতে করে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা আর দুটো সন্দেশ নিয়ে এসেছে।

তিনি কলমটা খাতার ওপর রেখে চশমাটা ঠিক করলেন। তরুণের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে কেমন যেন এক ধরনের প্রশ্রয় ছিল। ভৃত্যটি চায়ের কাপটা টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে বলল, ছোটবাবু, বাইরে যা বৃষ্টি! আজ মাঘোৎসবের বাকি গানগুলোর তদারকিতে ওদিকের বাড়িটায় যাওয়া হবে না বুঝি?

তিনি কোনো উত্তর দিলেন না। ১২৯১ বঙ্গাব্দের এই মাঘের দিনগুলোয় চারদিকে ব্রাহ্মসম্মিলনের ধুম। তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় লেখা পাঠাতে হবে, নতুন ব্রহ্মসংগীত তৈরি করতে হবে। অথচ এই বৃষ্টির দুপুরে তিনি নিজেকে এক অদ্ভুত গোলকধাঁধায় আবিষ্কার করলেন।

তিনি হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপটা তুলে নিলেন। গরম চায়ের প্রথম চুমুকটা দিতেই তাঁর মনে হলো, এই যে স্বাদ, এই যে মাটির পাত্রের গন্ধ, এই যে বৃষ্টির শব্দ—এসবই তো জাগতিক বন্ধন, যাকে শাস্ত্র বলে 'বিষয়বাসনা'। মানুষ এই বন্ধনগুলোকেই আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। অথচ, এর বাইরেও একটা অসীম শূন্যতা কিংবা পূর্ণতা আছে, যা মানুষকে প্রতিনিয়ত টানে। কিন্তু মনের ভেতর যখনই সেই পরমেশ্বরের আলো এসে পড়ে, জাগতিক মোহের মেঘ এসে আবার চোখ দুটোকে অন্ধ করে দেয়।

তিনি খাতার দিকে তাকালেন। যেখানে কাফি রাগের সুরে মাত্র কয়েকটা লাইন জন্ম নিয়েছে। কাফি রাগটি ভারি অদ্ভুত। সন্ধ্যা নামার মুখে এই রাগ গাইলে মন কেমন যেন উদাস হয়ে যায়। হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এই রাগটি যেমন ধ্রুপদ-খেয়ালে চলে, তেমনি বাংলার কীর্তনের সঙ্গেও এর নাড়ির টান।

তিনি মৃদু স্বরে গুনগুন করে গেয়ে উঠলেন, ক্ষণিকে আলোকে আঁখির পলকে তোমায় যবে পাই দেখিতে, হারাই-হারাই সদা হয় ভয়, হারাইয়া ফেলি চকিতে...

গানের সুরটা জানালার বাইরে আছড়ে পড়া বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে মিশে ঘরের ভেতর এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করল। ভৃত্যটি মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো, ছোটবাবুর এই কণ্ঠ শুধু গান নয়, এ যেন এক আত্মার ফিসফিসানি, ঈশ্বরের কাছে এক যুবকের চিরন্তন আর্তি।

হঠাৎ করেই মেঘের ডাক ছাপিয়ে একটা তীব্র বজ্রপাতের শব্দ হলো। চারপাশটা এক মুহূর্তের জন্য তীব্র আলোয় চকমক করে উঠল, আর ঠিক তখনই ঘরের ভেতরের আলো-ছায়ার খেলাটা বদলে গেল।

তিনি জানালার দিকে চেয়ে রইলেন। তাঁর চোখে তখন এক অদ্ভুত তৃষ্ণা—কী করলে সেই পরম সত্ত্বাকে চিরদিনের জন্য আঁখিতে আঁখিতে রাখা যাবে?

বজ্রপাতের শব্দটা আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল। বৃষ্টির বেগ এখন কিছুটা কমে এসেছে, কিন্তু একটানা রিমঝিম শব্দটা থামেনি।

তিনি চায়ের কাপটা টেবিলের একপাশে সরিয়ে রাখলেন। খাতার পাতাটার দিকে তাকালেন। কাফি রাগের সুরটা তাঁর বুকের ভেতর তখনো গুনগুন করছে। এই সুর যেন কোনো সাধারণ সুর নয়, এ যেন এক অনন্ত ব্যাকুলতা। মানুষ সারাজীবন ধরে কত কিছুর পেছনে ছোটে—যশ, খ্যাতি, বিষয়-আশয়। কিন্তু দিনশেষে যখন একা জানালার পাশে এসে দাঁড়ায়, তখন বুঝতে পারে, মনের ভেতরের আসল মানুষটি আসলে অন্য কিছু চাইছে। সে চাইছে এক চিরন্তন আশ্রয়।

তিনি আবার কলমটা হাতে নিলেন। খাতার শেষ লাইনে এসে তাঁর হাতটা সামান্য কেঁপে উঠল। ঈশ্বরের কাছে নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দেওয়ার জন্য মনে যে তীব্র আকুলতা দরকার, তা কি তাঁর আছে? তিনি নিজেকে প্রশ্ন করলেন, এত প্রেম আমি কোথা পাব না, তোমারে হৃদয়ে রাখিতে?

পরক্ষণেই এক দৃঢ় প্রত্যয় তাঁর মনে ভর করল। যদি সেই পরম সত্ত্বাকে পেতেই হয়, তবে এই পৃথিবীর সমস্ত মোহ, সমস্ত পিছুটান হেলায় ফেলে দেওয়া যায়। তিনি খাতার পাতায় শেষ শব্দগুলো লিখলেন—আর কারো পানে চাহিব না আর, করিব হে আমি প্রাণপণ— তুমি যদি বল এখনি করিব বিষয়বাসনা বিসর্জন।

লেখা শেষ করে তিনি কলমটা টেবিলে রাখলেন। একটা দীর্ঘ ও তৃপ্তির শ্বাস ফেলে জানালার বাইরে তাকালেন। দূর আকাশের মেঘগুলো এখন একটু আলগা হতে শুরু করেছে, মেঘের ফাঁক গলে বিকেলের এক চিলতে ম্লান আলো এসে পড়েছে বাগানের কদম গাছটার ওপর।

তাঁর মনে হলো, এই ক্ষণিকের আলোটুকুই পরম পাওয়া। একেই চোখের পলকে ধরে রাখতে হবে, আঁখিতে আঁখিতে রাখতে হবে।

এর কিছুদিন পরেই, ১২৯১ বঙ্গাব্দের মাঘ মাসে ব্রাহ্মসমাজের মাঘোৎসবে গানটি প্রথম গীত হলো। তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর গানটি স্থান পেল ‘রবিচ্ছায়া’ সংকলনে, আর শেষমেশ গীতবিতানের ‘পূজা’ পর্যায়ের এক অমূল্য রতন হয়ে রইল। কাঙ্গালীচরণ সেন যখন এই গানের স্বরলিপি বাঁধছিলেন, তিনিও হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন যে দাদরা তালের এই কীর্তনাঙ্গ সুরটি আগামী একশো-দেড়শো বছর ধরে লক্ষ লক্ষ মানুষের মনের মেঘ কাটানোর মন্ত্র হয়ে উঠবে। ১৯১৫ সালের দিকে মানদাসুন্দরী দাসীর কণ্ঠে যখন এটি প্রথম রেকর্ড করা হলো, তখন থেকেই এটি বাঙালির ঘরে ঘরে এক পরম শান্তির আশ্রয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাইরে তখন বৃষ্টি পুরোপুরি থেমে গেছে। শুধু পাতা থেকে টুপটুপ করে জল পড়ার শব্দ হচ্ছে। আর ঘরের ভেতর মায়াবী আলো-ছায়ায় মিশে আছে এক অদ্ভুত, পবিত্র নীরবতা। চব্বিশ বছর বয়সী সেই যুবকের খাতার পাতা থেকে জন্ম নেওয়া গানটি তখন যেন এক অদৃশ্য ডানায় ভর করে অনন্তকালের দিকে যাত্রা করেছে।

৪৩ পঠিত ... ১৮ ঘন্টা ১৭ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top