মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, রবীন্দ্রনাথ; আমাদের জীবনচর্যার প্রিয় বিষয়গুলোকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ তার ২০০৯ থেকে ২০২৪-এর ৫ অগাস্ট পর্যন্ত ফ্যাসিজমের চিহ্নের মতো অপব্যবহার করে; নতুন প্রজন্মের মাঝে একটা নেতি তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের জনমানুষের স্মৃতিতে নিজ নিজ এলাকায় রবীন্দ্র-নজরুল জন্মজয়ন্তী একসঙ্গে পালিত হবার কথা নিশ্চয়ই মনে আছে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের কালচারাল অনুষ্ঠানগুলোতে রবীন্দ্র ও নজরুল সংগীত উদযাপিত হয়েছে নিয়মিত। বাংলাদেশের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের জন্ম জয়ন্তীতে জাতীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠান আয়োজন করে এসেছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে নিয়ে আয়োজন নিঃসন্দেহে বেশি। অবশ্য নিবিড় চর্চা ও অধ্যবসায়ের মাঝ দিয়ে গায়কীতে মুন্সীয়ানা পশ্চিমবঙ্গেই বেশি লক্ষ্য করা যায়।
রবীন্দ্র সংগীতের গায়কীতে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালনের চেষ্টা করতে দেখা গেছে পশ্চিমবঙ্গে শান্তি নিকেতনকে; বাংলাদেশে ছায়ানটকে। কিন্তু কলকাতায় জোড়াসাঁকোর পোশাক পরে; পূজা পর্বের গানের আঙ্গিকে রবীন্দ্র সংগীত গাওয়ার অনুশাসন মানেনি নতুন প্রজন্ম। খুব সম্ভব আন্তর্জাতিকতাবাদ এক্ষেত্রে কলকাতাকে সাহায্য করেছে।
কিন্তু ঢাকার ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা যেহেতু শান্তিনিকেতনের কৃতি ছাত্রী ছিলেন; তিনি পোশাকে-চলনে বলনে এমনকী গায়কীতে কড়া অনুশাসন আরোপ করেছেন। ফলে রবীন্দ্র সংগীত চর্চা রবীন্দ্র ধর্ম চর্চায় রুপ নিয়েছে। এ কারণে ছায়ানটের অনুষ্ঠানের গায়ক-গায়িকার অনুকরণে দর্শককেও জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের মতো পোশাক পরে আসতে হয়। গান গাওয়া ও গান শোনার অভিব্যক্তিতে প্রগাঢ় ভক্তি থাকতে হয়।
রবীন্দ্রনাথ একেশ্বরবাদী ব্রাহ্মধর্ম অনুসরণ করতেন। রাজা রামমোহন রায় ১৮২৮ সালের ২০ আগস্ট কলকাতায় এই আন্দোলনের সূত্রপাত করেন। কিন্তু বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথকে হিন্দু জমিদার হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছে। এতে করে রবীন্দ্রনাথের গরীব অনুসারীরা নিজেদের জমিদার কল্পনা করতে পারে। আর সেই কল্পনা দেখে ক্ষিপ্ত প্রজারা রবীন্দ্রনাথের গীবত করতে পারে।
রবীন্দ্রনাথ বিশ্ববীক্ষার মানুষ ছিলেন। ঠাকুর পরিবারটি ব্যবসা বানিজ্যসূত্রে বৃটিশের কাছাকাছি থাকায়; বৃটিশদের আমন্ত্রণ রক্ষার তাগিদে ঠাকুর পরিবারের নারী সদস্যদের জন্য বোম্বে থেকে শাড়ি আনিয়ে কুঁচি দিয়ে সেটা পরা প্রচলন করা হয়। বৃটিশদের পার্টিগুলোতে প্রিন্সলি স্টেটের নারী সদস্যরা যোগ দিতেন। হিন্দু ও ব্রাহ্ম পরিবারের মেয়েরা কপালে টিপ পরতেন; আর মুসলিম পরিবারের মেয়েরা টিকলি পরতেন।
ঠাকুর পরিবারের মাধ্যমে কলকাতার আধুনিক সমাজ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার সাহিত্য ও সংগীত সৃজনের সময়; একটি আধুনিক সমাজের রুপকল্প তৈরি করেছেন। ইউরোপের সংগীতের সুর ও মিউজিক্যালের আঙ্গিক সংগ্রহ করে নতুন কিছু উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন।
ঊনবিংশ শতকের আধুনিকতা খুব স্বাভাবিকভাবেই একবিংশের কলকাতার আধুনিকতা নয়। ফলে রবীন্দ্র সংগীতে পাশ্চাত্যের যন্ত্রানুষঙ্গ ব্যবহৃত হয়, রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পকে চলচ্চিত্রে রুপ দিতে তা ডিকন্সট্রাক্ট করেন চলচ্চিত্রকার, নারী শিল্পীরা বেশ জিনস টি শার্ট পরে রবীন্দ্র সংগীত পরিবেশন করেন। রবীন্দ্রনাথকে জেনজি ও জেন আলফা প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে এই যে রুপান্তর; তা খুবই স্বাভাবিক। গ্রিক নাট্যকার সফোক্লিস কিংবা বৃটিশ নাট্যকার শেক্সপীয়ারকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পুরোনো আঙ্গিক ভেঙ্গে নতুন আঙ্গিকে পরিবেশন করা হয়।
কিন্তু ঢাকার রবীন্দ্রনাথ যেহেতু পূজার দেবতা বিশেষ; ফলে ঊনবিংশ শতকের পোশাক পরে ভক্তিরসে সিক্ত হতে হয়; ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে রবীন্দ্র সংগীত গাইতে হয়। যেন কেউ একজন মারা গেছে, তার শেষকৃত্যে শোক জানাতে শিল্পী ও দর্শকেরা উপস্থিত।
কলকাতায় যখন প্রথম প্রথম কথিত ভদ্রলোক তৈরি হচ্ছিলো; তখন গাম্ভীর্য্য ছিলো ব্যক্তিত্বের স্মারক। অথচ সে সময়েও রবীন্দ্রনাথ প্রাণ খুলে হাসতেন। তিনি জীবনটাকে কেঁদে ভাসিয়ে না দিয়ে, হেসে উড়িয়ে দিতে চেয়েছেন।
ঢাকায় ভদ্রলোক তৈরির কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২১ সালে। সেই থেকে হাসতে হাসতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ডিগ্রি নিয়েই গম্ভীরমুখে বের হয়ে আসা শুরু হলো। ১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর যেমন যেরকম গম্ভীর ভদ্রলোক তৈরি শুরু হয়েছিলো। কলকাতার গম্ভীর লোকেরা যেমন কলকাতার মানুষের দুই কাঁধে কালচার বয়ে চলার ভারী পাথর বেঁধে দিয়েছিলো; ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর গম্ভীর লোকেরা তেমনি ঢাকার মানুষের কাঁধে কালচার বয়ে চলার ভারী পাথর বেঁধে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময়ের ব্যবধানের কারণেই খুব সম্ভব কলকাতার রবীন্দ্রনাথ যখন থেকে গাম্ভীর্য ছেড়েছেন; ঢাকার রবীন্দ্রনাথকে গাম্ভীর্য ছাড়তে তার চেয়ে দেরী করতে হচ্ছে। একই কারণে কলকাতার রবীন্দ্র চর্চায় আড়ম্ভর নেই; আছে সাহজিকতা। আর ঢাকার রবীন্দ্র চর্চা মানেই আড়ম্ভর আর ভক্তির আতিশয্য।
রবীন্দ্রনাথের দুর্ভাগ্য তিনি এমন এক জনপদে জন্মেছেন; যেখানে তার সবচেয়ে অপছন্দের লোকেরা তাকে ব্যবহার করে একটু ভদ্রলোক সাজতে চেষ্টা করে। উগ্র হিন্দুত্ববাদী নরেন্দ্র মোদী কভিডকালে রবীন্দ্রনাথের মতো দাড়ি রেখেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুত্ববাদী নেতা শুভেন্দু অধিকারী রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের দুর্ভাগ্য ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা রাতে ক্রসফায়ারের নির্দেশ দিয়ে ভোরবেলা রবীন্দ্র সংগীতের লাইভ শোতে ফোন করে ভীষণ ভদ্রমহিলা সেজে যান। শেখ হাসিনা ২০২৪-এর জুলাই মাসে যখন নির্বিচারে শিশু-কিশোর-তরুণ হত্যা করছিলেন; তখন তাকে অন্ধভাবে সমর্থন করেছিলেন, রবীন্দ্র অনুসারী নতুন ভদ্রলোক সোসাইটি। এরা কালচারাল উইং নামে পরিচিত।
সমাজের খল নায়কেরা যখন রবীন্দ্র মুখোশ পরে মানবতাবিরোধী অপরাধ করে ও তা সমর্থন করে; তখন রবীন্দ্রনাথের ভাবমূর্তিতে চোট লাগে। নতুন প্রজন্ম ভাবতে শুরু করে, রবীন্দ্রনাথ ওদের মানস গঠন করেছে বলেছে দাবি করছে খুনিরা; সেই রবীন্দ্রনাথ তাহলে আমার হবে কি করে!
এই মুশকিল হয়েছিলো জার্মান দার্শনিক ফ্রিডেরিখ নিতসেকে নিয়ে। নিতসে মারা যাবার পর তার দর্শন অপব্যবহার করে আডলফ হিটলার তার নাতসি বাহিনীর মাঝে খেলনা শ্রেষ্ঠত্বের বোধ জন্ম দিয়েছিলেন। রবীন্দ্র পূজা করে দিল্লি সমর্থিত হাসিনা আর তার খুনে বাহিনী খেলনা আভিজাত্যের ভং ধরেছিলো। পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদের বিজয়ে ঢাকার যে হিন্দুত্ববাদী ও কথিত গেরুয়া প্রগতিশীল মহল উল্লাসে ফেটে পড়েছিলো; তারাই আবার ফেসবুকে রবীন্দ্র পূজা করে বেড়াচ্ছে।
অথচ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উগ্র জাতীয়তাবাদের তীব্র সমালোচক ছিলেন। ঘরে বাইরে উপন্যাসে 'বন্দে মাতরম' শ্লোগান দেয়া উগ্র জাতীয়তাবাদিদের 'দেশ সেবা'-র নামে লুন্ঠন ও নৈরাজ্যের কঠোর সমালোচনা করেছেন। রবীন্দ্র সাহিত্য যাদের হিপোক্রেসি তুলে ধরেছে; সেই হিপোক্রেটরা রবীন্দ্রনাথের ছবি ঝুলিয়ে 'বড্ড কালচার্ড' সাজতে চাইলে; সেটা তো জটিল এক রসায়ন তৈরি করে।
সাহিত্যের ছাত্র হিসেবে একজন লেখকের টেক্সট আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে হিটলার ফ্রিডেরিখ নিতসের ছবি ঝুলালে কিংবা মোদী-হাসিনার রবীন্দ্রপূজা দেখে আমার বিশেষ বিচলন হয় না। মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, রবীন্দ্রনাথকে উগ্র বাঙালি জাতীয়তাদের ফ্যাসিজমের টুল হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেখলে; বিষাদ আসে; কিন্তু কতগুলো উপমানব তাদের মাংসের কারবারের সাইনবোর্ডে মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, রবীন্দ্রনাথের ছবি ব্যবহার করলে; রবীন্দ্রনাথের 'প্রশ্ন' কবিতাতেই এর উত্তর খুঁজি।
ভগবান, তুমি যুগে যুগে দূত, পাঠায়েছ বারে বারে
দয়াহীন সংসারে,
তারা বলে গেল ক্ষমা করো সবে, বলে গেল ভালোবাসো–
অন্তর হতে বিদ্বেষবিষ নাশো’।
বরণীয় তারা, স্মরণীয় তারা, তবুও বাহির-দ্বারে
আজি দুর্দিনে ফিরানু তাদের ব্যর্থ নমস্কারে।
আমি-যে দেখেছি গোপন হিংসা কপট রাত্রিছায়ে
হেনেছে নিঃসহায়ে,
আমি-যে দেখেছি প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে
বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে
আমি-যে দেখিনু তরুণ বালক উন্মাদ হয়ে ছুটে
কী যন্ত্রণায় মরেছে পাথরে নিষ্ফল মাথা কুটে।
কণ্ঠ আমার রুদ্ধ আজিকে, বাঁশি সংগীতহারা,
অমাবস্যার কারা
লুপ্ত করেছে আমার ভুবন দুঃস্বপনের তলে,
তাই তো তোমায় শুধাই অশ্রুজলে–
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো।



পাঠকের মন্তব্য