একজন ইউনুসেক্সুয়ালের রাষ্ট্রচিন্তা

১০৯ পঠিত ... ৪ ঘন্টা ৪৩ মিনিট আগে

 

আকাশে মেঘ জমেছে। বৈশাখী মেঘ নয়, কেমন যেন একটা ফ্যাকাসে ছাই-রঙের মেঘ। মাজেদ বসে আছে তার বারান্দায়। তার সামনে এক প্লেট মুড়ি মাখানো আর দুই কাপ চা। মাজেদ একা হলেও চা দুই কাপ, কারণ একটু পরেই তার পরম বন্ধু আনিস আসবে। আনিস লোকটা অদ্ভুত। দুনিয়ার সব বিষয়ে তার অগাধ পাণ্ডিত্য, বিশেষ করে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানের প্রতি তার ভালোবাসা হিমালয়সমান।

আনিস আসতেই মাজেদ বলল, বস আনিস। চা ঠান্ডা হচ্ছে।

আনিস চেয়ার টেনে বসে গম্ভীর গলায় বলল, দেখলে মাজেদ? একেই বলে মাস্টারস্ট্রোক। ৯ই ফেব্রুয়ারি ইতিহাসে লেখা থাকবে।

মাজেদ মুড়িতে একটা বড়সড় কামড় দিয়ে বলল, কোন ইতিহাস? ওই যে নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে গোপনে এনডিএ সই করে দেশটাকে ট্রাম্পের পকেটে ঢুকিয়ে দিলে, সেই ইতিহাস?

আনিস চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে পরম তৃপ্তিতে চোখ বুজল। তারপর ফিসফিস করে বলল, তুমি বুঝবে না মাজেদ। তুমি তো সাধারণ মানুষ। এটাকে বলে ‘রেসিপ্রোকাল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট’। ট্যারিফ ২০% থেকে ১৯%-এ নেমেছে। এক পারসেন্ট মানে বোঝো? বিলিয়ন ডলারের মামলা!

মাজেদ হাসল। তবে সেই হাসিতে কিছুটা তিতা ভাব ছিল। সে বলল, আনিস, তোমার অবস্থা দেখে মাঝে মাঝে আমার মায়া হয়। এই যে তুমি দিনরাত লোকটার গুণগান করো, একে কী বলে জানো? একে বলে ‘ইউনুসেক্সুয়াল’ আকর্ষণ। তুমি তো ভাই সাধারণ ভক্ত না, তুমি হয়ে গেছ ইউনুসেক্সুয়াল!

আনিস ভুরু কুঁচকাল। ইউনুসেক্সুয়াল? এটা আবার কী?

এটা একটা মানসিক অবস্থা, মাজেদ বুঝিয়ে বলল, যেখানে মানুষ যুক্তি-তর্ক, লাভ-ক্ষতি সব ভুলে গিয়ে একজন ব্যক্তির লবিং আর চাণক্য-বুদ্ধিকে পূজা করতে শুরু করে। আচ্ছা আনিস, এই যে ১% ট্যারিফ কমানোর বদলে আমরা যে ৬,৭১০টা মার্কিন পণ্যে শুল্ক ছাড় দিলাম, এটা কি তোমার মাথায় ঢুকছে? ১,৬০০ পণ্যের বিপরীতে ৬,৬০০ পণ্য! একে তুমি বলছ মাস্টারস্ট্রোক?

আনিস হাত নেড়ে উড়িয়ে দিল। আরে ভাই, বড় কিছু পেতে হলে ছোট কিছু ছাড় দিতে হয়। আমেরিকা আমাদের বন্ধু। সম্পর্ক মজবুত হচ্ছে না?

মাজেদ সোজা হয়ে বসল। সম্পর্ক না আনিস, এটাকে বলে সাবঅর্ডিনেশন। ১৪টা বোয়িং বিমান কেনার আবদার, ১৫ বিলিয়ন ডলারের এলএনজি আমদানির গ্যারান্টি, এই সব বোঝা কার ঘাড়ে চাপবে? আর ওই যে চুক্তি করলে যে ৬০ দিন পর কার্যকর হবে, তখন তো উনি ক্ষমতায় থাকবেন না। নতুন সরকারের ঘাড়ে এই দায় চাপানো কি নৈতিক?

আনিস কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, সবই জাতীয় স্বার্থে। উনি যা করেন, দেশের ভালোর জন্যই করেন।

মাজেদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, তুমি সত্যিই একটা খাঁটি ইউনুসেক্সুয়াল, আনিস। দেশের সার্বভৌমত্ব যেখানে প্রশ্নের মুখে, সেখানে তুমি খুঁজছ লবিংয়ের সার্থকতা। সাতশ কোটি টাকা খরচ করে যে লবিস্ট নিয়োগের গুঞ্জন উঠল, সেটার হিসাব কি কোনোদিন পাওয়া যাবে?

বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। আনিস বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকল, যেন বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটায় সে নতুন কোনো অর্থনৈতিক তত্ত্ব খুঁজছে।

 

বৃষ্টির বেগ বেড়েছে। বারান্দার কোনায় রাখা মাজেদের টবের অপরাজিতা গাছটা বাতাসে পাগলের মতো দুলছে। মাজেদ দ্বিতীয় কাপ চা শেষ করে সিগারেট ধরাল। আনিস তখনো গভীর চিন্তায় মগ্ন, যেন সে মনে মনে আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি মেলাচ্ছে।

মাজেদ ধোঁয়া ছেড়ে বলল, আনিস, চুপ করে আছ কেন? জেনেশুনে বিষ পান করাকে কি তোমরা বিপ্লব বলো? এই যে চুক্তিতে বলা আছে, মার্কিন ন্যাশনাল সিকিউরিটি মেজারে বাংলাদেশ কমপ্লিমেন্টারি মেজার নিতে বাধ্য, এর মানে বোঝো?

আনিস নড়েচড়ে বসল। এর মানে হলো নিরাপত্তা সহযোগিতা। বিশ্বায়নের যুগে একা চলা যায় না।

ভুল, মাজেদ টেবিল চাপড়ে বলল।

এর মানে হলো, কাল যদি আমেরিকা বলে যে চীন বা রাশিয়ার সঙ্গে তোমরা ডিজিটাল বা ট্রেড ডিল করতে পারবে না, তবে তোমরা হাত-পা বাঁধা। সার্বভৌমত্ব জিনিসটা কি এখন কেবল মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে? ডিজিটাল আর ট্রেড পলিসি যদি ওয়াশিংটন থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়, তবে আমাদের এই তথাকথিত স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির কী হবে?

আনিস বিরক্ত হয়ে বলল, তুমি সবসময় নেতিবাচক চিন্তা করো, মাজেদ। এই যে আমাদের গার্মেন্টস সেক্টর বেঁচে গেল, সেটা নিয়ে কিছু বলো না কেন?

মাজেদ একটু বাঁকা হাসল। বেঁচে গেল, না কি জিম্মি হলো? ২০% ট্যারিফ থেকে কমিয়ে ১৯% করা হয়েছে। মাত্র এক পারসেন্ট! অথচ বিনিময়ে আমরা কী দিচ্ছি দেখো—মার্কিন স্ট্যান্ডার্ডের এফডিএ বা ইউএসডিএ নিয়ম সরাসরি মানতে হবে। আমাদের নিজস্ব টেস্টিং ল্যাব বা লেবেলিংয়ের কোনো গুরুত্ব থাকবে না। এমনকি রিম্যানুফ্যাকচার্ড পণ্য বা পুরোনো পার্টস আমদানির ওপর থেকেও নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হয়েছে। বাংলাদেশ কি এখন আমেরিকার জঞ্জাল ফেলার ভাগাড় হবে?

আনিস কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, দেখো, এই যে ৬০ দিন পর কার্যকর হওয়ার শর্ত দিয়েছেন, এটা তো বুদ্ধিমানের কাজ। বর্তমান সরকার এসে চাইলে রিভিউ করতে পারবে।

মাজেদ হাসল। তবে এবার হাসিটা করুণ। আনিস রে, আন্তর্জাতিক চুক্তি কি পাড়ার মুদি দোকানের বাকি খাতা, যে চাইলেই ছিঁড়ে ফেলা যায়? একবার সই হয়ে গেলে তার একটা আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। উনি যে লবিংয়ের জোরে ট্রাম্পের সঙ্গে ডিনারে গিয়ে ছবি তুলে আসলেন, সেই ছবির ফ্রেমের দাম আমাদের পুরো জাতিকে আগামী ১৫ বছর দিতে হবে। ১৫ বিলিয়ন ডলারের এলএনজি আর ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের সয়াবিন-তুলা কেনার বোঝা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে মেটানো হবে।

আনিস এবার খানিকটা উত্তেজিত।

তুমি বলতে চাচ্ছো, উনি দেশের ক্ষতি করেছেন? ট্রাম্পকে ব্যক্তিগত চিঠি লিখে যে ৩ মাসের স্থগিতাদেশ উনি এনেছিলেন, সেটা কি লবিং ছাড়া সম্ভব হতো?

মাজেদ শান্ত গলায় বলল, সম্ভব হতো না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই লবিং কি দেশের জন্য ছিল, নাকি নিজের গদি বা ইমেজ রক্ষার জন্য? তুমি একজন নিখুঁত ইউনুসেক্সুয়াল বলেই উনার এই সূক্ষ্ম চালাকিটাকে মাস্টারস্ট্রোক মনে করছ। অথচ দেশের শিল্প আর কৃষির ওপর যে খড়গ নেমে এল, সেটা তোমার চোখে পড়ছে না। বায়োটেক বা জিএমও পণ্য যখন কোনো বাধা ছাড়াই আমাদের বাজারে ঢুকবে, তখন আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার কী হবে?

আনিস গুম হয়ে বসে রইল। বারান্দার টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ এখন ড্রাম বাজানোর মতো শোনাচ্ছে। আনিসের মনে হচ্ছে, বৃষ্টির শব্দের চেয়ে মাজেদের যুক্তিগুলো কানে বেশি জোরে বাজছে।

 

মাজেদ মুড়ির বাটিটা সরিয়ে রেখে বলল, আনিস, চুপ করে থাকলে তো হবে না। এই যে ধরো, ট্রাম্পের সঙ্গে ডিনারে উনি মেয়েকে নিয়ে গেলেন, ছবি তুললেন। এতে দেশের চেয়ে উনার ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিং বেশি হলো না? লবিস্ট ফার্মকে কয়েকশ কোটি টাকা দেওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, সেই টাকাটা কি জনগণের ট্যাক্সের ছিল না?

আনিস এবার ধরা গলায় বলল, সম্পর্ক তো হয়েছে, মাজেদ। আমেরিকার মতো পরাশক্তি এখন আমাদের পাশে।

পাশে না, আনিস—কাঁধের ওপর, মাজেদ শুধরে দিল।

যখন দেখবে আমাদের নিজস্ব সাবসিডি বা স্থানীয় শিল্পকে সাপোর্ট দেওয়ার ক্ষমতা এই চুক্তির কারণে সীমিত হয়ে গেছে, তখন বুঝবে ‘পাশে থাকা’ কাকে বলে। সার্বভৌমত্ব মানে শুধু একটা পতাকা না; সার্বভৌমত্ব মানে হলো নিজের দেশের বাজার আর নীতি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা। উনি তো যাওয়ার আগে সব চাবিকাঠি ওয়াশিংটনের ড্রয়ারে রেখে দিয়ে গেলেন।

আনিস দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, হয়তো তুমি ঠিক। কিন্তু উনি তো নোবেল বিজয়ী, আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত। উনি কি সত্যিই দেশের এত বড় ক্ষতি করতে পারেন?

মাজেদ হাসল। খুব বুদ্ধিমান মানুষরা যখন ভুল করে, তখন সেই ভুলটা হয় হিমালয়সমান। উনি লবিং আর আন্তর্জাতিক ইমেজের নেশায় পড়ে গিয়ে হয়তো ভুলেই গেছেন যে বাংলাদেশের কৃষকের সয়াবিন ক্ষেত আর আমেরিকার সয়াবিন লবি এক নয়। তুমি একজন ইউনুসেক্সুয়াল বলে উনার মোহময় চশমা দিয়ে দুনিয়া দেখছ। কিন্তু চশমাটা খুললেই দেখবে, আমরা একটা অসম যুদ্ধের ময়দানে দাঁড়িয়ে আছি।

আনিস উঠে দাঁড়াল। তার চা শেষ, বৃষ্টিও কিছুটা কমে এসেছে। সে ধীর পায়ে বারান্দা থেকে বের হতে হতে বলল, আমি চলি, মাজেদ। কাল আবার আসব।

মাজেদ পিছন থেকে ডাক দিয়ে বলল, কাল আসার সময় একটু ভেবে এসো তো, যে চুক্তি এনডিএ-র আড়ালে গোপনে করতে হয়, সেটা কি আদৌ জনগণের জন্য? নাকি সেটা শুধু ক্ষমতা আর ইমেজের এক গোলকধাঁধা?

আনিস কোনো জবাব দিল না। সে অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল। মাজেদ বসে রইল তার নিঝুম বারান্দায়। তার মনে হলো, আনিসের মতো অনেক ইউনুসেক্সুয়াল মানুষ এখন এই গোলকধাঁধায় বন্দি। তারা লবিংয়ের সাফল্য উদযাপন করছে, অথচ দেশের অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের কফিন যে তৈরি হয়ে গেছে, তা টের পাচ্ছে না।

আকাশের ছাই-রঙের মেঘগুলো এখন আরও কালো হয়েছে। মাজেদ বিড়বিড় করে বলল, হিমালয়সমান ভুল যখন ধসে পড়ে, তখন তার নিচে সাধারণ মানুষই চাপা পড়ে। নোবেল পদক দিয়ে সেই আর্তনাদ ঢাকা যায় না।

বাইরে আবার ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। যেন প্রকৃতির কান্নায় আজ কোনো লুকোছাপা নেই।

১০৯ পঠিত ... ৪ ঘন্টা ৪৩ মিনিট আগে

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

গল্প

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top