ফুরে ফুরে বোজু

১০ পঠিত ... ২ ঘন্টা ১৩ মিনিট আগে

 

কাজুমি অনেকক্ষণ ধরে জানালার সাথে চেপে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ খোলা আকাশে। চোখে ঝিঁঝিঁ লাগা রোদ্দুর চারদিকে। চোখ লাল হয়ে এসেছে, তবুও কাজুমি আকাশ থেকে চোখ সরাচ্ছে না। কোথাও যদি একফোঁটা কালো মেঘের সন্ধান পাওয়া যায়! কিন্তু আকাশ ঝকঝকে। মেঘের ছিটেফোঁটাও নেই।

কাজুমি পড়ে ওসাকা প্রিফেকচার হাইস্কুলে। তাদের ক্লাস টিচার রিনা ম্যাম বলেছেন, এই হপ্তার শেষে তারা স্কুল ট্রিপে যাবে, যদি বৃষ্টি না হয় তবে। তার ক্লাসের সবাই এই কথায় হইহই করে উঠল। স্কুল ট্রিপ মানেই মজার শেষ নেই। তারা কোনো না কোনো নতুন জায়গায় যাবে ট্রেন বা বাসে চেপে। সারাদিন বিভিন্ন দর্শনীয় জিনিস আর জায়গা দেখবে, নতুন অনেক কিছু শিখবে, বন্ধুরা মিলে আড্ডা দেবে, প্রচুর ছবি তুলবে, একসাথে পিকনিকের মতো দুপুরের খাবার খাবে, আবার মজা করতে করতে দিনশেষে ফিরে আসবে।

উত্তেজনায় বাকি সবার মতো কাজুমিরও ঘুম হারাম! কিন্তু কাজুমির উত্তেজনার সাথে সাথে কিছু চিন্তাও যুক্ত হয়েছে। কাজুমির বাবা নেই। তাদের সংসারে আছে সে, তার মা মেই আর মায়ের এক দূরসম্পর্কের কাজিন রিওতা চাচা। তাদের একটি বড় জমি আছে, যেখানে মেই আর রিওতা ভাড়াটে কর্মচারীদের সাথে মিলে ফসল ফলান। এখন গ্রীষ্মের দিন। তরমুজের সময়। সারাদিনই মা আর রিওতা চাচা মাঠেই থাকেন। সে পরশু দেখে এসেছে, সারামাঠ ভরে গেছে বিশাল বিশাল তরমুজে। এই তরমুজগুলো সুন্দরভাবে পেকে গেলে মাঠ থেকে তুলে বাজারে বিক্রি করা হবে। তবেই কাজুমিদের সংসারখরচ আসবে। তাহলে সে স্কুল ট্রিপের টাকা দিতে পারবে আর সবার সাথে আনন্দ করতে যেতে পারবে।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এখন তরমুজের খুব বৃষ্টির প্রয়োজন। তাহলে ওগুলো সুন্দরভাবে পাকবে, লাল টসটসে হবে আর মানুষ পছন্দ করে কিনবে। ওদিকে দেখো, আকাশে মেঘের কোনো বার্তা নেই। মেই আর রিওতার মতো কাজুমিও মুখ কালো করে ঘুরছে। কী যে হবে!

হঠাৎ করে কাজুমির মুখে এক চিলতে হাসি দেখা গেল। সে জানালা থেকে এক দৌড়ে তার পড়ার টেবিলের কাছে গেল। কিছু কাগজ, কলম নিল। তারপর মায়ের সেলাইয়ের বাক্স থেকে কিছু সাদা টুকরো কাপড়, কালো টুকরো কাপড়, তুলা, সুতা, কাঁচি, সুঁচ ইত্যাদি নিয়ে নিল। খোলা দরজার কাছে এসে পা ছড়িয়ে বসে পড়ল। এখানে বসলে গায়ে কিছু বাতাস লাগে। যা গরম পড়েছে! তারপর সে আস্তে আস্তে কাপড়ের টুকরোগুলোর ভেতরে তুলা, কাগজ ঢুকিয়ে সুতো দিয়ে বেঁধে নিল। হয়ে গেল সুন্দর কিছু মাথাওয়ালা ভুত। সে কলম দিয়ে ভুতগুলোর হাসি-হাসি চোখ-মুখ বসিয়ে দিল। ব্যস, হয়ে গেল তার ‘তেরু তেরু বোজু’ বা রৌদ্রমুনি পুতুল!

ও, তেরু তেরু বোজু কী, তাই তো বলা হয়নি। সেই অনেককাল আগে, এডো পিরিয়ড থেকে জাপানিরা বৃষ্টি থামিয়ে রোদকে ডাকতে এই তেরু তেরু বোজুকে কাজে লাগিয়ে আসছে। মনে করা হয়, এই পদ্ধতিটি তারা নিয়েছে চীনা সংস্কৃতি ‘সৌসেইজৌ’ বা ‘ঝলমলে আবহাওয়ার সুন্দর মেয়ে’ থেকে, যার কাজ ছিল পচা আবহাওয়াকে উড়িয়ে দিয়ে রৌদ্রোজ্জ্বল দিন নিয়ে আসা।

জাপানিদের রৌদ্রমুনি অবশ্য দেখতে মেয়েদের মতো না। তাকে দেখতে লাগে হাসতে গিয়ে চোখ বুজে যাওয়া কোনো বৌদ্ধ সাধুর মতো। জাপানিরা একে ‘ছোট্ট সাদা ভুত’ও বলে থাকে। এই রৌদ্রমুনি পুতুলটা তারা প্রয়োজনীয় রৌদ্রোজ্জ্বল দিনের আগের দিন বানিয়ে জানালার সাথে বা পছন্দসই কোনো জায়গায় ঝুলিয়ে দেয়। আর আশা করে, তাদের দরকারি দিনটি অবশ্যই রোদমাখা হবে।

কিন্তু কাজুমির দরকার বৃষ্টি, রোদ নয়। সে সমস্যার সমাধানও আছে জাপানি সংস্কৃতিতে, ‘ফুরে ফুরে বোজু’ বা বৃষ্টি ডাকা পুতুল। মজা হচ্ছে, এটা বানানোর জন্য আলাদা কষ্ট করার দরকার পড়ে না। রোদমুনির মাথাটাকে নিচের দিকে দিয়ে ঝুলিয়ে দিলেই সেটা হয়ে যায় বৃষ্টিমুনি। অনেক সময় বৃষ্টির কালোমেঘ চাইবার জন্য বৃষ্টিমুনিদের কালো কাপড়ে মুড়েও বানানো হয়।

কাজুমিও কয়েকটি সাদা আর কয়েকটি কালো বৃষ্টিমুনি বানিয়ে জানালার সামনে ঝুলিয়ে দিল। আহ! এখন তার শান্তি শান্তি লাগছে। তার আর দুশ্চিন্তা করতে হবে না। যাদের কাজ, তারাই করবে। এটা সৌভাগ্যেরও প্রতীক। তাই অবশ্যই কাজুমির ইচ্ছাপূরণ হবে। সে খুশিমনে লাফাতে লাফাতে পাশের বাসায় তার বান্ধবী হানার সাথে খেলতে গেল।

রাতে কাজুমি ঘুমের মধ্যে টের পেল, শো শো শব্দে বাতাস বইছে। সে ঘুমের ঘোরেই খুশি হয়ে আরও বেশি মায়ের বুকের মধ্যে মিশে গেল। কিন্তু সকালে ঘুম থেকে উঠে সে দেখল, আকাশ আজও ঝলমলে। তার মুখ কালো হয়ে গেল।

কিন্তু বিকাল হতে হতেই কাজুমির মুখ দেখে বোধহয় আকাশের মুখও কালো হয়ে গেল। আর সন্ধ্যার পর থেকেই শুরু হলো ঘোর বর্ষণ। কাজুমিকে আর পায় কে! খুশিতে আটখানা সে! মা আর রিওতা চাচার মুখেও হাসি।

আজ কাজুমিদের স্কুল ট্রিপ। সারারাত ঘুম আসেনি তার। তবুও আঁধার কাটতে না কাটতেই সে উঠে পড়ে মায়ের সাথে নাশতা তৈরি করছে। একটু পরই তাকেও তৈরি হতে হবে। সে নিজের রুমে যাওয়ার সময় দেখল, বৃষ্টিমুনিগুলো উল্টো হয়ে ঝুলে থেকে তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। সে আলগোছে তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দিল। এদিক-ওদিক তাকিয়ে ওদের ন্যাড়া মাথায় একটা করে চুমুও খেয়ে ফেলল সে। ফিসফিসিয়ে বলল,

“আরিগাতো (ধন্যবাদ), ফুরে ফুরে বোজু!”

 

১০ পঠিত ... ২ ঘন্টা ১৩ মিনিট আগে

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top