রবীন্দ্রনাথ যখন লিখলেন ‘সখী, ভালোবাসা কারে কয়’

১০৮ পঠিত ... ১৪:১৩, জুন ০৬, ২০২৬

১৯-২০ বছরের একটা খ্যাপাটে তরুণ একা একা ঘরের ভেতর পায়চারি করছে। বাইরে হয়তো তখন ঝুম বৃষ্টি, কিংবা মনকেমন-করা এক চিলতে জোছনা। কোলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির সেই ঘরটায় তখন একটা অদ্ভুত অস্থিরতা। তরুণটির নাম রবি। বয়সটা এমন, যখন বুকের ভেতর উথালপাথাল হাওয়া বয়, অথচ সেই হাওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট নাম দেওয়া যায় না। চারপাশে সবাই সারাক্ষণ একটা ভারী শব্দ নিয়ে মেতে আছে, 'ভালোবাসা'। অথচ তরুণের মনে হচ্ছে, এই যে সবাই দিন-রাত ভালোবাসা ভালোবাসা করে মুখে ফেনা তুলছে, তারা আসলে কীসের পেছনে ছুটছে? ভালোবাসা কি শুধুই চোখের জল? শুধুই কি বুকের গভীর থেকে টেনে আনা একটা দীর্ঘশ্বাস?

১৮৮০ সালের দিকে কিশোর আর তরুণের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা সেই কবি প্রথম আবিষ্কার করলেন, মানুষ আসলে ভালোবাসার নামে এক ধরণের মধুর যাতনাকে উদযাপন করতে পছন্দ করে। কিন্তু তাঁর তরুণ মন এই চিরন্তন দুঃখবিলাসের তত্ত্বটা পুরোপুরি মেনে নিতে পারল না। তাঁর মনে হলো, এই ব্রহ্মাণ্ডে এত যে আলো, এত যে ফুল ফুটছে, এত যে পাখির গান— এগুলো তো যন্ত্রণার কথা বলে না। যদি ভালোবাসা সত্যি হতেই হয়, তবে তা কেবলই একটা কান্নার গল্প হবে কেন? এই যে নিজের ভেতরের একটা মৃদু প্রতিবাদের মতো করে, এক ধরণের কৌতূহলী বিস্ময় নিয়ে তিনি খাতার পাতায় আঁচড় কাটলেন। জন্ম নিল একটা অমর প্রশ্ন: সখী, ভাবনা কাহারে বলে? সখী, যাতনা কাহারে বলে?

গানটা কিন্তু হুট করে কোনো খামখেয়ালিতে লেখা হয়নি। পর্দার আড়ালে একটা বড় ক্যানভাস তৈরি হচ্ছিল। তরুণ রবি তখন হাত দিয়েছেন তাঁর 'ভগ্নহৃদয়' নামের একটি নাট্যকাব্য রচনায়। চারপাশের চেনা জগতের প্রেম, বিরহ আর মন ভাঙার খেলাগুলোকে তিনি খুব কাছ থেকে দেখছিলেন। নাটকের চরিত্রদের মুখের সংলাপ হিসেবেই মূলত এই গানটির অবতারণা। সখীদের আড্ডায়, হাসাহাসি আর খুনসুটির ছলে এক চিরন্তন সত্যকে খোঁজার চেষ্টা। গানটির সুরের জন্য তিনি বেছে নিলেন বেহাগ আর খাম্বাজের একটা অদ্ভুত মিশ্রণ, তাল দিলেন একতাল। তখনকার দিনে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের যে ভারী পাথর-চাপা নিয়মকানুন ছিল, তরুণ কবি যেন আলতো করে সেই নিয়মকে পাশ কাটিয়ে নিজের মতো একটা সহজ সুরের নদী তৈরি করলেন। ১৮৮১ সালে 'ভারতী' পত্রিকায় যখন এটি প্রথম ছাপা হলো, তখন হয়তো খোদ কবিও জানতেন না, উনিশ শতকের এক তরুণের এই ব্যক্তিগত জিজ্ঞাসা আগামী দেড়শো বছর ধরে কোটি কোটি বাঙালির প্রেমের প্রথম পাঠ্যবই হয়ে থাকবে।

 

'ভগ্নহৃদয়' নাট্যকাব্য প্রকাশের পর গানটি যখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ফিরতে শুরু করল, তখন কলকাতার উচ্চবিত্ত সমাজ থেকে শুরু করে সাধারণ মধ্যবিত্তের বৈঠকখানায় একটা মৃদু গুঞ্জন তৈরি হয়েছিল। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ওস্তাদরা হয়তো কিছুটা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়েছিলেন, এ কেমন গান, যা চেনা রাগ-রাগিণীর ব্যাকরণ পুরোপুরি মানছে না, অথচ শুনলে বুকের ভেতরটা কেমন যেন খামচে ধরে! তরুণ রবি কিন্তু তখন সুরের এক আশ্চর্য জাদুকর। তিনি বেহাগ আর খাম্বাজের ক্ল্যাসিকাল কাঠামোর মধ্যে আলতো করে মিশিয়ে দিলেন বাংলার মাটির বাউল সুরের একটা সহজ টান। এই যে মাটির কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা, এটাই গানটিকে সাধারণ মানুষের খুব আপন করে তুলল। পরবর্তীতে ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী যখন এই গানের সুরটিকে পরম যত্নে স্বরলিপির পাতায় বন্দী করলেন, তখন তা চিরকালের জন্য একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়ে গেল।

কিন্তু গানটার আসল ম্যাজিকটা লুকিয়ে ছিল এর একেবারে শেষের দিকটায়। তৎকালীন বাংলা সাহিত্যে প্রেমের গল্প মানেই ছিল বিরহ, অবহেলা আর আত্মাহুতির এক অন্ধকার অধ্যায়। রবীন্দ্রনাথ যেন এক ঝটকায় সেই অন্ধকার ঘরের জানলাগুলো খুলে দিলেন। তিনি বললেন, ফুল তো হাসতে হাসতে ঝরে যায়, জোছনা তো হেসে হেসেই মিলিয়ে যায়, তবে মানুষ কেন ভালোবাসার নামে শুধু কাঁদবে? গানের শেষ লাইনে এসে কবি সবাইকে ডেকে বললেন, আয় সখী, আয় আমার কাছে,  সুখী হৃদয়ের সুখের গান শুনিয়া তোদের জুড়াবে প্রাণ।

দুঃখের সাগরে হাবুডুবু খাওয়া বাঙালিকে তিনি এক পরম আশাবাদের গল্প শোনালেন। এটাই ছিল উনিশ শতকের চেনা ধ্যানধারণার বিরুদ্ধে এক ১৯ বছরের তরুণের এক দুর্দান্ত, মৃদু ও নান্দনিক বিদ্রোহ।

কালক্রমে এই গানটি থিয়েটারের মঞ্চ ছেড়ে, শান্তিনিকেতনের আম্রকুঞ্জ পেরিয়ে বাঙালির জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠল। ১৯৭২ সালে শ্রীমান পৃথ্বীরাজ চলচ্চিত্রের মতো বড় পর্দায় এর ব্যবহার গানটিকে নতুন প্রজন্মের কাছে আরও জনপ্রিয় করে তোলে। দেবব্রত বিশ্বাসের সেই উদাত্ত কণ্ঠ, সুমিত্রা সেনের দরদ কিংবা লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠের মায়ায় এই গানটি যুগের পর যুগ ধরে বাঙালির কান্নার দিনে যেমন সান্ত্বনা দিয়েছে, তেমনি প্রেমের প্রথম দিনটিতে জুগিয়েছে সাহস। আজ প্রায় দেড়শত বছর পেরিয়ে এসে, প্রযুক্তির এই আধুনিক যুগে যখন কোনো তরুণ বা তরুণী ইউটিউবের পর্দায় গানটি শোনে, তখন তাদের অজান্তেই তারা সেই ১৮৮০ সালের জোড়াসাঁকোর বৃষ্টিভেজা ঘরের একলা তরুণের মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়ায়। ভালোবাসার সংজ্ঞা হয়তো বদলেছে, কিন্তু সখী, ভালোবাসা কারে কয়, এই আকুল জিজ্ঞাসার গভীরতা আজও বিন্দুমাত্র কমেনি

১০৮ পঠিত ... ১৪:১৩, জুন ০৬, ২০২৬

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top