১
পৃথিবীর মানচিত্রটা তখন মানুষের হাতের মুঠোয় আসেনি। মানুষ তখন অজানাকে জানার নেশায় পাগল। আমাদের বাংলা তখন সুলতানি আমলের জৌলুসে ভরা—ধান, নদী আর মসলিনের দেশ। আকাশ-বাতাসে সোঁদা মাটির ঘ্রাণ। সেই শান্ত সময়ে বঙ্গোপসাগরের নীল জল চিরে একদল অদ্ভুত মানুষ এসে হাজির হলো চট্টগ্রাম বন্দরে। তাদের জাহাজগুলো দেখতে ছিল বিশাল, পালগুলো ছিল অনেকটা ডানা মেলে দেওয়া পাখির মতো।
তাদের গায়ের রঙ আমাদের মতো নয়, পোশাকেও কেমন যেন একটা অদ্ভুত আভিজাত্য, আবার সেই সঙ্গে এক ধরনের রুক্ষতা। স্থানীয় মানুষ অবাক হয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল। কেউ বলল, ‘এরা কারা?’ নাম দেওয়া হলো ‘ফিরিঙ্গি’। তারা এল মসলিন, মসলা আর রেশমের টানে। কিন্তু আসার কিছুদিনের মধ্যেই বোঝা গেল, এরা কেবল বণিক নয়। তারা চট্টগ্রাম বন্দরের এক কোণে নিজেদের আস্তানা গেড়ে বসল, সুলতানের অনুমতি নিয়ে তৈরি হলো ছোট ছোট কুঠি।
কে জানত, সেই ছোট কুঠিগুলোই একদিন হয়ে উঠবে এক নতুন ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু। তারা শুধু পণ্য নিল না, সঙ্গে করে নিয়ে এল এক নতুন জীবনধারা। তাদের জাহাজের নোঙর ফেলার শব্দের সঙ্গেই যেন বাংলার শান্ত প্রকৃতিতে এক অস্থিরতার শুরু হলো। তারা সঙ্গে করে নিয়ে এল অদ্ভুত সব জিনিস, আনারস, পেঁপে আর আলু। সেই সময়ে আমরা জানতাম না, এই আনারস বা আলুর নামটা আমাদের দেশি কোনো শব্দ নয়। কিন্তু সময়ের স্রোতে এই শব্দগুলো আমাদের ভাষার অন্দরে এমনভাবে মিশে গেল যে, আজ আমরা ভাবতেই পারি না, এগুলো একদিন বিদেশি কোনো নাবিকের মুখ থেকে শোনা শব্দ ছিল।
মানুষ তখন জানত না, এই ফিরিঙ্গিরা কেবল বাণিজ্য করতে আসেনি, তারা এসেছে বাংলার ইতিহাসের পাতায় একটা গভীর দাগ কেটে দিতে। সেই দাগটা এখনো আছে, আমাদের বাজারের ফর্দ থেকে শুরু।
২
পর্তুগিজরা তখন আর শুধুই অতিথি নেই, তারা হয়ে উঠেছে এই ভূখণ্ডের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কার্ণফুলী নদীর তীরে ‘ফিরিঙ্গি বাজার’ তখন এক অদ্ভুত জায়গা। পর্তুগিজ নাবিক, বণিক আর স্থানীয় বাঙালিরা মিলেমিশে তৈরি করল এক নতুন পৃথিবী। মানুষের সঙ্গে মানুষের পরিচয় হয় ভাষার মাধ্যমে। যখনই কোনো নতুন মানুষ কোনো নতুন এলাকায় আসে, তারা সঙ্গে করে নিয়ে আসে তাদের নিজেদের কিছু শব্দ। আর এই শব্দগুলোই বাতাসের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা যে শব্দগুলো ব্যবহার করি, যেমন—‘চাবি’, ‘জানলা’, ‘আলমারি’—আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি এগুলো এসেছে কোত্থেকে? পর্তুগিজ নাবিকরা যখন তাদের বিশাল জাহাজ থেকে নামত, তাদের হাতে থাকত চাবির গোছা। তারা হয়তো স্থানীয়দের বলত, ‘চাবি’ (chave), আর আমাদের মানুষরাও সেই শব্দটা লুফে নিল। একইভাবে তাদের বাড়ির ‘জানলা’ (janela) দেখে আমরাও জানলাকে জানলা বলতে শিখলাম। তাদের ব্যবহৃত ভারী কাঠের ‘টেবিল’ (mesa) কিংবা ‘আলমারি’ (armário) আমাদের ঘরের আসবাব হয়ে গেল।
শুধু আসবাবের নাম নয়, তারা আমাদের রান্নার স্বাদও বদলে দিল। ‘আলু’ (batata) বা ‘পেঁপে’র মতো সবজিগুলো তারা যখন প্রথম এ দেশে নিয়ে এল, তখন স্থানীয়দের কাছে সেগুলো ছিল বিস্ময়ের বস্তু। তারা আমাদের শিখিয়ে দিল কীভাবে রান্না করতে হয়, কীভাবে মশলা ব্যবহার করতে হয়। সেই স্বাদ আর সেই শব্দগুলো আমাদের খাবারের টেবিলে পাকাপাকিভাবে জায়গা করে নিল।
তারা যখন স্থানীয় মেয়েদের বিয়ে করে সংসার পাতল, তখন সেই পরিবারগুলোতে কথা বলার জন্য এক নতুন ভাষার জন্ম হলো, যাকে বলা হতো 'ক্রেওল'। সেটি ছিল পর্তুগিজ আর বাংলার এক অদ্ভুত মিশেল। তারা তাদের ভাষায় কথা বলত, কিন্তু তাতে থাকত বাংলার ছোঁয়া। একসময় সেই ভাষা হারিয়ে গেল, কিন্তু রয়ে গেল আমাদের মুখে মুখে ফেরা সেই হাজারো পর্তুগিজ শব্দ। তারা চলে গেল ঠিকই, কিন্তু রেখে গেল তাদের ব্যবহারের ছোট ছোট টুকরো শব্দগুলো—যা আমাদের প্রতিদিনের যাপনের অংশ হয়ে রইল।
যেন কোনো এক জাদুকরের মতো তারা আমাদের ভাষার ভেতর লুকিয়ে আছে, আমরা তাদের নাম জানি না, কিন্তু তাদের দেয়া শব্দ ছাড়া আমাদের দিন চলে না।
৩
সবকিছুরই এক সময় শেষ হয়। সেই ফিরিঙ্গিদের দাপট, সমুদ্রের ওপর তাদের একক আধিপত্য, কিংবা কার্তাজ দিয়ে জাহাজ আটকে রাখার ক্ষমতা—কোনোটাই চিরস্থায়ী হলো না। মুঘলদের নজরে যখন এল যে এই আগন্তুকরা কেবল বাণিজ্য করছে না, বরং স্থানীয় মানুষের ওপর অত্যাচার করছে এবং তাদের দাস বানিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তখন সময় বদলাতে শুরু করল। ১৬৩২ সালে হুগলিতে এবং পরবর্তীতে ১৬৬৬ সালে চট্টগ্রামে মুঘল সুবেদারদের হাতে তাদের সেই অঘোষিত রাজত্ব ধূলিসাৎ হয়ে গেল।
পর্তুগিজরা চলে গেল, কিন্তু তারা কি সত্যিই পুরোপুরি হারিয়ে গেল? তা কি সম্ভব? মানুষ চলে যায়, কিন্তু রেখে যায় তার ছাপ। চট্টগ্রামের অলিগলিতে আজও কিছু পুরনো গির্জার ধ্বংসাবশেষ দাঁড়িয়ে আছে। মানুষের চেহারায়, চোখের কোণে, কিংবা পদবিতে—গমেজ, ডি’কস্তা বা রোজারিও নামের ভেতর আজও সেই পুরনো পর্তুগিজ রক্ত খুঁজে পাওয়া যায়। তারা যখন চলে যাচ্ছিল, তখন তাদের সেই তৈরি করা ‘ক্রেওল’ ভাষাও আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হয়ে গেল। ব্রিটিশরা এল, তারা সব কিছু নতুন করে সাজাল। সেই পুরনো পর্তুগিজ শব্দগুলো আমাদের ভাষার গভীরে এমনভাবে শেকড় গেড়ে বসেছিল যে, ইংরেজরাও সেগুলো সরাতে পারল না।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমরা যখন বলি, ‘দরজাটা বন্ধ করে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নে’, তখন আমরা ভুলে যাই, ‘দরজা’, ‘সাবান’—এই শব্দগুলোর জন্ম হয়েছিল এক দূর সমুদ্রের ওপারের দেশ থেকে আসা মানুষের মুখে। তারা যখন এসেছিল, আমরা তাদের অদ্ভুত চোখে দেখেছিলাম। আর আজ, তারা আমাদের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ইতিহাস আসলে খুব অদ্ভুত এক জিনিস। কোনো কোনো মানুষ আসে জয় করতে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা জয় করে না, তারা কেবল মিশে যায়। তারা আমাদের ভাষার ভাঁজে ভাঁজে, আমাদের খাবারের স্বাদে, আর আমাদের পুরনো স্মৃতির অন্দরে চিরকাল রয়ে যায়। কোনো এক বিকেলে কার্ণফুলী নদীর তীরে দাঁড়িয়ে যদি খুব নিঝুম হয়ে শোনা যায়, তবে হয়তো এখনো শোনা যাবে সেই পুরনো নাবিকদের অস্পষ্ট ফিসফিসানি। তারা হারিয়ে গেছে, কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া শব্দগুলো আমাদের বেঁচে থাকার সাথেই বেঁচে আছে।
এই হলো ইতিহাস। মানুষের আসা-যাওয়ার খেলা, আর শব্দের রয়ে যাওয়া।



পাঠকের মন্তব্য