যে উপন্যাসে 'জয় বাংলা' হয়ে উঠেছিল মুক্তির ভাষা

১২৬ পঠিত ... ২০:৫৯, জুন ৩০, ২০২৬

: জয় বাংলা!

একদল এক্কেবারে কুচো-চিংড়ির ঝাঁক দৌড়তে দৌড়তে এই বলে চিৎকার করে বেড়াচ্ছে! আসছে- যাচ্ছে, ফের আসছে। ওদের দেখে মলিন মুখে হাসছেন এক বাংলাদেশি যুবক।

পৃথিবীতে চলছে ১৯৭১ সাল, মে-জুন মাস। বাংলাদেশের মানচিত্রে বড়ই টানাপোড়েন। কারন, দেশটা পুরো জ্বলছে পাকিস্তানি মিলিটারিদের আগুনে। চারদিকে শুধু লাশ আর হাহাকার। হাহাকার আর লাশ! কলকাতার এক শরণার্থী শিবির। যুবক তার ঘরের বাইরে বসে আছে। অসহায় মুখখানি।

পরনে সাধারণ ফতুয়া, উসকোখুসকো চুল, পকেটে একটা ফুটো পয়সাও নেই, ঠিকমতো খাওয়া নেই। তার ওপর মাথার ভেতর দেশের মানুষের ওপর হওয়া অত্যাচারের নির্মম ছবি। এক গভীর ট্রমা আর তীব্র অর্থকষ্টের মধ্যে কাটছে তার দিন। তিনি সবার ছফা ভাই, আহমেদ ছফা।

মাথার ভেতরে অশান্তিতে ফেটে যেতে চায়! এই অবস্থা অসহায় মুখে বসে  থেকে দেখে যাওয়া তার কম্ম নয়। তিনি কি সাধারণ মানুষ, তিনি তো এক ডানপিটে জিনিয়াস! মাথা পুরো খারাপ হয়ে যাওয়ার আগেই তাকে কলম ধরতে হবে। তার তো ঐ একটাই অস্ত্র!

কলকাতার এক চিলতে ভাঙা ঘরে নিজেকে এক্কেবারে বন্দি করে ফেললেন ছফা ভাই। মাথার অশান্তি- বুকের ভেতরের জমে থাকা রাগ কমাতেই হবে। শুরু হলো এক অদ্ভুত সাধনা, এক বেপরোয়া পরীক্ষা। দিন আর রাতের তফাত গায়েব করে দিলেন তিনি।

ক্ষিদে পেলে হয়তো একবেলা ফুটিয়ে নিতেন, নয়তো আধপেটা খেয়েই কাটিয়ে দিতেন। শরীরের ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে যাচ্ছিল, চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছিল, কিন্তু তার মাথায় তখন মুক্তির নেশা! দমবন্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি।

এখানে আসার পথে তিনি দেখে এসেছিলেন কীভাবে একদম সাধারণ, রাজনীতি না বোঝা আমজনতাও দেশের টানে রাজপথে নেমে আসছিল। সেই ছবিই তাকে টেনে নিয়ে গেল কাগজে আঁকা এক অন্য পৃথিবীতে!

এক মধ্যবিত্ত পরিবার। তারই এক ছেলে বিয়ে করে এনেছে এক পরম রূপবতী বোবা মেয়েকে। ফুললি মিউট! তার ওপর বিয়ে হয়েছে এমন এক ফ্যামিলিতে, যাদের কাজই ছিল সারাদিন বড় বড় নেতাদের তেল মারা। বোরিং আর চাটুকারদের সেই দমবন্ধ খাঁচায় মেয়েটি যেন দিন দিন আরও চুপসে যাচ্ছিল।

কিন্তু জানালার ওপারেই তখন পুরো দেশ কাঁপছে। প্রতিদিন মেঠো পথ আর রাজপথ কাঁপিয়ে মিছিল যাচ্ছে- 'জয় বাংলা'! জানলার গ্রিল ধরে বোবা মেয়েটি প্রতিদিন সেই মিছিল দেখত। লাখ লাখ মানুষ যখন একসাথে বুক ফুলিয়ে চেল্লাতো, তখন মেয়েটার ভেতরেও কেমন যেন কাঁপন ধরে যেত! সে কথা বলতে পারে না তো কী হয়েছে, ‘জয় বাংলা’ শব্দের ভেতরের যে পাওয়ার, সেটা সে ঠিকই ফিল করতে পারত। খাঁচা ভেঙে উড়ে যাবার স্বপ্ন তার, কিন্তু ডানা আটকে গেছে খুঁটিতে!

এই বোবা মেয়েটি আসলে বছরের পর বছর ধরে শোষিত, মুখ বুঁজে সব সহ্য করা পরাধীন বাঙালি জাতির জীবন্ত প্রতীক! যে নিজের জীবন দিয়ে  নিজের বোবা আত্মার আহুতি দিচ্ছে!

দিন যেতে লাগল, দেশ আরও উত্তাল হল- সাথে সাথে এই বোবা মেয়েটাও আরও পাগল হল। তারপর একদিন-

আর বলব..ও..ও... না। সবটুকু এভাবেই শুনে ফেললে হয় নাকি? ছফা ভাইয়ের চমৎকার লেখা আর আমার এই ছ্যাড়াব্যাড়া গল্প বলা এক হল নাকি? পড়ে দেখবেন, ভাল্লাগবে!

যাইহোক, টানা কয়েক সপ্তাহের হাড়ভাঙা খাটুনি আর মানসিক যুদ্ধের পর, এক ভোরে ছফা ভাই কলমটা টেবিলের ওপর রাখলেন। মুখভর্তি দাড়ি, চোখজোড়া ক্লান্তিতে বিবর্ণ, কিন্তু মুখে চমৎকার হাসি। কাগজের ওপর বড় বড় অক্ষরে লিখলেন- 'ওঙ্কার’।

একদিন দেশ স্বাধীন হল, বইটি প্রকাশিত হলো, পুরো বাংলা সাহিত্য জগতে শুরু হল অভূতপূর্ব তোলপাড়! পাঠকেরা স্তম্ভিত হয়ে আবিষ্কার করলেন, ছফা ভাইয়ের এই লেখাটা কোন খামখেয়ালির গল্প এটা ছিল না; ছিল একটি জাতির জেগে ওঠার রক্তাক্ত দলিল, যা আজও আমাদের অনায়াসে দাঁড় করিয়ে দেয় সেই রক্তঝরা সময়ে!

 

১২৬ পঠিত ... ২০:৫৯, জুন ৩০, ২০২৬

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top