মুস্তাফা মনোয়ার বাংলাদেশকে যেসব অমূল্য রতন দিয়ে গেলেন

৩৬ পঠিত ... ১০ ঘন্টা ৪৮ মিনিট আগে

ছোটোদের ছবিতে কোনো ভুল থাকে না, সবই সুন্দর- এই কথাটার ওপর বিশ্বাস করে নোটখাতায় কল্পনার জগৎ তুলে ধরতাম। গাছটা বেঁকে গেল কী না, মাছটার দুটো দাড়ি গজালো কী না- তা নিয়ে আর ভাবিনি। কারণ আমি জানতাম আমার আঁকায় কোনো ভুল নাই! আর এই কথাটা আমাকে যে বিশ্বাস করিয়েছিল, তিনি ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। টিভি পর্দার ওপাশ থেকেও যিনি আমার পরম আপন একজন মানুষ ছিলেন। 

বড় হতে হতে জানলাম, এই মানুষটা, যিনি বাউল, পারুল আর ষাড়ের শিল্পী ভাই, তিনি কিন্তু আসলে অনেক বড় গুনী একজন মানুষ। আর শুধু তাই-ই না, আমাদের ছোটোবেলার যত আনন্দময় অনুষ্ঠান ছিল, তার বেশিরভাগের পেছনের মানুষ ছিলেন এই মানুষটা। 

তাকে শুধু পাপেটম্যান বলে এককভাবে পরিচয় দেওয়া যায় না। বরং আমাদের শৈশব রঙিন গড়ার কারিগর ছিলেন তিনি। শিল্পী, শিক্ষক, নাট্য-নির্দেশকসহ নানা কাজের কাজী ছিলেন। ঝুলিতে আছে একুশে পদকসহ নানা সম্মাননা।

তার আজীবন ছবি আঁকার ঝোঁক ছিল। সাথে ছিল কঠিন দেশপ্রেম। ভাষা আন্দোলন যখন হয়, তখন ছিলেন মাত্র ক্লাস নাইনের ছাত্র। বড়দের দেখে ছোটো মুস্তাফা মনোয়ারও চুপ থাকতে পারলেন না। তুলে নিলেন আঁকার খাতা। আঁকিয়েই চলল প্রতিবাদ। তবে ধরাও পড়লেন। জেলও খাটলেন। 

দেশ নিয়ে ভালোবাসা যেন আরও তীব্র হলো তার মাঝে। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৮ সালের দিকে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যখন পাকিস্তানি শাসন ও আধিপত্যের দাপট চলছিল, তখন মোস্তফা মনোয়ার 'আজব দেশে' নামে একটি অনুষ্ঠান শুরু করেন। সেই অনুষ্ঠানেই তিনি প্রথম 'বাঘা' আর 'মেনি' নামের দুটি চরিত্র নিয়ে আসেন।

তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী ও সরকারের বিরুদ্ধে তখন সরাসরি কোনো কথা বলা সম্ভবই ছিল না। তাই তিনি চতুরতার সাথে এই বাঘা ও মেনির মতো পাপেট পশুর মুখ দিয়ে রূপক অর্থে তৎকালীন রাষ্ট্রযন্ত্রকে খোঁচা আর কটাক্ষ দিয়ে কথা বলতেন।

এরপর এলো ১৯৭১ সাল। ভারতের শরনার্থী শিবিরে হেঁটে যাচ্ছিলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত সেই সময়ে মুস্তাফা মনোয়ার দেখলেন সব শিশুদের মন খারাপ, ভয়ে যেন কুঁকড়ে আছে সব। এইসব শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে তিনি আয়োজন করেন বাংলাদেশের প্রথম পাপেট শো।

দেশ স্বাধীন হলে শিশুদের বিকাশ নিয়ে কাজ করা শুরু করলেন তিনি। দেশের তুমুল জনপ্রিয় অনুষ্ঠান নতুন কুঁড়ি এলো তার হাত ধরে। আরও এলো মনের কথা। বিখ্যাত মীনা কার্টুনের মেইন টিমেও কাজ করেছেন তিনি। সিসিমিপুরেও কিন্তু চিফ ক্রিয়েটিভ এডভাইজার হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। আর বিদেশী সিসেমি স্ট্রিট যেন আমাদের ঘরের সিসিমপুর হয়ে ওঠে তার জন্য কাজ করেছেন দিন-রাত। 

 এছাড়াও মুস্তাফা মনোয়ার তাঁর দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও শীর্ষস্থানীয় পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর কর্মজীবনের প্রধান পদসমূহ নিচে দেওয়া হলো:

  • চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক: শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউটে (বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ) শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন।
  • বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) উপ-মহাপরিচালক: তিনি দীর্ঘদিন বাংলাদেশ টেলিভিশনে কর্মরত ছিলেন এবং প্রতিষ্ঠানটির উপ-মহাপরিচালক (ডিডিজি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিটিভির শুরুর দিনগুলোতে অনুষ্ঠান নির্মাণ ও শিল্প নির্দেশনায় তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
  • বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক: তিনি দেশের সংস্কৃতি চর্চার প্রধান রাষ্ট্রীয় কেন্দ্র বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
  • জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের (NIMC) মহাপরিচালক: গণমাধ্যম কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক হিসেবেও তিনি যুক্ত ছিলেন।
  • বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের পরিচালক: নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের (সোনারগাঁও জাদুঘর) পরিচালক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
  • এডুকেশনাল পাপেট ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের (EPDC) প্রতিষ্ঠাতা: পাপেট বা পুতুলনাচের বিকাশ ও শিক্ষার প্রসারে তিনি ঢাকার ধানমন্ডিতে এই বিশেষায়িত কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর প্রধান হিসেবে কাজ করেন।

আর এই বর্ণাঢ্য জীবনে পুরষ্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন অগণিত। উল্লেখযোগ্য হলো, 

একুশে পদক (২০০৪): শিল্পকলায় অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ২০০৪ সালে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা 'একুশে পদক'-এ ভূষিত করে।

সুলতান পদক: বাংলাদেশের কিংবদন্তি চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের স্মৃতি রক্ষার্থে প্রবর্তিত এই মর্যাদাপূর্ণ পদকটি মোস্তাফা মনোয়ার লাভ করেন। চিত্রশিল্পে তাঁর বিশেষ অবদান এবং জলরং ও তেলরঙের অসাধারণ কাজের জন্য তাঁকে এই সম্মাননা দেওয়া হয়।

ললিতকলা একাডেমী পুরস্কার: চারুকলা ও নাট্যশিল্পে তাঁর সৃজনশীল কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি এই সম্মাননা লাভ করেন।

আন্তর্জাতিক পাপেট উৎসবের সম্মাননা: ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতার শরণার্থী শিবিরে পাপেট প্রদর্শনের মাধ্যমে জনমত গঠন, এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশে আধুনিক পাপেটের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের কারণে আন্তর্জাতিক পাপেট থিয়েটার সোসাইটি ও বিভিন্ন বৈশ্বিক উৎসব থেকে তাঁকে বিশেষ সম্মাননা ও স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

আজীবন সম্মাননা ও অন্যান্য পদক: বাংলাদেশের নাট্য ও চারুকলা অঙ্গনে দীর্ঘ সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে অবদান রাখার জন্য বিভিন্ন জাতীয় প্রতিষ্ঠান, থিয়েটার গ্রুপ এবং সাংস্কৃতিক সংগঠন তাঁকে একাধিকবার আজীবন সম্মাননা স্মারক প্রদান করেছে।

তবে সমস্ত পদক, পদবি আর প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির বাইরে মোস্তাফা মনোয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন বোধহয় শিশুদের জন্য একটি রঙিন ও মায়াবী জগৎ তৈরি করতে পারা। এত বড় বড় সব রাষ্ট্রীয় গুরুদায়িত্ব সামলানোর পরেও সুযোগ পেলেই তিনি মেতে উঠতেন শিশুদের সাথে অনাবিল গল্পে, পরম মমতায় হাতে ধরে শেখাতেন আঁকাআঁকি। তাঁর কল্পনার ও মনের গহীনের ‘পারুল পাপেট’ চরিত্রটি থেকেই পরবর্তীতে ইউনিসেফ তাদের বিশ্বখ্যাত ‘মীনা’ চরিত্রের মূল ধারণা ও অনুপ্রেরণা লাভ করে। জীবনের সব বড় বড় প্রাপ্তি আর বৈষয়িক অর্জনকে একপাশে সরিয়ে রেখে, এই মানুষটি সারাজীবন অবোধ শিশুদের হাত ধরেই এক আনন্দময় সোনালী পথ পাড়ি দিয়ে গেছেন। 

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, বাংলা ট্রিবিউন, কিশোর আলো, পপ স্ট্রিম



৩৬ পঠিত ... ১০ ঘন্টা ৪৮ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top