১
আমার জন্মের সময়টায় নাকি যশোর জেলার আকাশজুড়ে মেঘের আনাগোনা ছিল। সালটা ছিল ১৮২৪, ২৫শে জানুয়ারি। কপোতাক্ষ নদের ঠিক কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা সাগরদাঁড়ি গ্রামটি তখন শীতের কুয়াশায় চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছিল। ঠিক সেই অলস দুপুরে মফস্বলের এক অবস্থাপন্ন কায়স্থ পরিবারে যখন আমার কান্না শোনা গেল, তখন নাকি বাড়ির বুড়ো দাদিমা ফিসফিস করে বলেছিলেন, এ ছেলে সাধারণ হবে না, এর ডাক অনেক দূর যাবে।
আমার পিতা রাজনারায়ণ দত্ত ছিলেন কলকাতার সদর দেওয়ানি আদালতের ডাকসাইটে আইনজীবী। কাড়ি কাড়ি টাকা রোজগার করতেন, ফলে আমাদের সংসারে অভাব শব্দটার কোনো অস্তিত্বই ছিল না। আর মা জাহ্নবী দেবী ছিলেন যেন সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা। পিতা বেশির ভাগ সময় কলকাতার কর্মব্যস্ততায় ডুবে থাকতেন বলে মায়ের আঁচল ধরাই ছিল আমার শৈশবের একমাত্র আশ্রয়। পিতা-মাতার একমাত্র সন্তান হওয়ায় আদর যা পাওয়ার, তার চেয়ে একটু বেশিই পেয়েছিলাম।
শৈশবের সেই দিনগুলোর কথা মনে হলে আজও এক অদ্ভুত নস্টালজিয়া এসে ভর করে। আমার ঘরের ঠিক পাশ দিয়েই বয়ে যেত কপোতাক্ষ নদ। সেই নদের জল ছিল আয়নার মতো পরিষ্কার। দুপুরের কড়া রোদে যখন গ্রামের সবাই ঘুমে কাদা, আমি তখন একা একা ঘাটে গিয়ে বসে থাকতাম। দেখতাম কীভাবে জলের বুকে রোদের আলো ঠিকরে পড়ছে। মা আমাকে ঘরের কোণে বসিয়ে রামায়ণ, মহাভারত আর পুরাণের গল্প শোনাতেন। মা যখন লঙ্কার যুদ্ধ কিংবা অর্জুনের লক্ষ্যভেদের কথা বলতেন, আমার ছোট্ট বুকটা অজানা এক উত্তেজনায় কাঁপত। ঘরের সেই শিক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় মসজিদের ইমাম মুফতি লুৎফুল হকের কাছে আমার পরিচয় ঘটে বাংলা, ফারসি আর আরবি ভাষার সঙ্গে। ভাষার এক আশ্চর্য জগৎ আমার সামনে খুলে গিয়েছিল তখনই। গ্রামের ধুলোবালি, কপোতাক্ষের শীতল জল আর মায়ের মুখের সেই উপাখ্যানগুলোই যে অজান্তে আমার ভেতরে এক কবির জন্ম দিচ্ছিল, তা তখন কে জানত!
কিন্তু গ্রামের এই রূপকথা-মার্কা জীবনটা বেশিদিন স্থায়ী হলো না। আমার বয়স যখন মাত্র তেরো, অর্থাৎ ১৮৩৭ সালের দিকে, পিতা হুকুম দিলেন এবার কলকাতায় আসতে হবে। সাগরদাঁড়ির চেনা আকাশ, কপোতাক্ষের ঘাট আর মায়ের মায়া পেছনে ফেলে আমি এসে পৌঁছালাম এক অচেনা জাদুনগরীতে—কলকাতায়। খিদিরপুরের সার্কুলার গার্ডেন রিচ রোডের এক বিশাল রাজপ্রাসাদসম বাড়িতে আমাদের বাস শুরু হলো। কলকাতায় এসে আমার চোখ তো ছানাবড়া! চারিদিকে সাহেব-সুবোদের আনাগোনা, ঘোড়ার গাড়ির খটাখট শব্দ। আমাকে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হলো বিখ্যাত হিন্দু কলেজে। এই কলেজটাই আমার ভেতরের সুপ্ত আগুনটাকে পুরোপুরি জ্বালিয়ে দিল। এখানে এসে আমি কেবল বাংলা বা সংস্কৃত শিখলাম না, ডুবে গেলাম ইংরেজি সাহিত্যের অতল সাগরে।
হিন্দু কলেজের অধ্যক্ষ ক্যাপ্টেন ডি. এল. রিচার্ডসন ছিলেন এক আশ্চর্য মানুষ। তিনি যখন ক্লাসে শেকসপিয়র কিংবা বায়রন পড়াতেন, মনে হতো ঘরের দেয়ালগুলো গলে গিয়ে সামনে আস্ত একটা ইংল্যান্ড ভেসে উঠেছে। তিনি আমার ভেতরের কাব্যপ্রীতি দেখে পিঠ চাপড়ে দিয়েছিলেন। ব্যস, আমার মাথায় ভূত চাপল। আমাকে ইংরেজিতে বড় কবি হতে হবে! ভূদেব মুখোপাধ্যায়, রাজনারায়ণ বসুর মতো প্রতিভাবান সহপাঠীদের ভিড়ে আমি তখন মনে মনে বায়রন কিংবা শেলির চেয়ে নিজেকে কোনো অংশে কম ভাবতাম না। রাতে মোমবাতি জ্বালিয়ে ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতা পড়তাম আর ভাবতাম, এই তেরো নদীর ওপারের যে দেশ, সেই বিলেত আমাকে একদিন ডাকবেই। বাংলায় কবিতা লেখা তখন আমার কাছে বড্ড সাধারণ আর তুচ্ছ মনে হতো। সাহেব হওয়ার, বিলেত যাওয়ার এক তীব্র, অবুঝ আকুলতা আমার কিশোর মনটাকে চারপাশ থেকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলল। কিন্তু এই তীব্র আকুলতাই যে আমার জীবনের শান্ত নদীটাকে এক ভয়ঙ্কর ঝড়ের মুখে ফেলে দেবে, তা তখনো আমার কল্পনারও বাইরে ছিল।
২
বিলেত যাওয়ার সেই তীব্র ভূত যখন মাথায় চাপল, তখন চারপাশের চেনা জগৎটাকে বড্ড অচেনা আর খাঁচা বলে মনে হতে লাগল। ১৮৪৩ সালের শুরুর দিকটা। কলকাতার আকাশটা সেদিন কেমন যেন মেঘলা ছিল। আমার বয়স তখন মাত্র উনিশ। পিতা রাজনারায়ণ দত্ত ওদিকে ধুমধাম করে আমার বাল্যবিবাহের আয়োজন করছেন। ওনাদের ধারণা, ছেলের গলায় জলজ্যান্ত একটা বিয়ে ঝুলিয়ে দিতে পারলেই এই সাহেব সাজার ভূত মাথা থেকে নেমে যাবে। কিন্তু ওনারা তো জানতেন না, এই খাঁচায় বন্দি হয়ে সংসারী হওয়ার চেয়ে সমুদ্রের ঝড়ে ডানা ভাঙা অনেক বেশি আনন্দের ছিল আমার কাছে। সেই বিয়ের পিঁড়ি থেকে বাঁচতে আর বিলেত যাওয়ার স্বপ্নকে ছুঁতে আমি এক চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম।
১৮৪৩ সালের ৯ই ফেব্রুয়ারি। খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে আমি হয়ে গেলাম মাইকেল। পিতা যখন খবরটা শুনলেন, ওনার কলকাতার সেই নামজাদা আইনজীবীর গম্ভীর মুখটা নাকি মুহূর্তের জন্য পাথরের মতো জমে গিয়েছিল। তিনি আমাকে ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করলেন। হিন্দু কলেজের নিয়ম ছিল কড়া—খ্রিষ্টানদের সেখানে পড়ার ঠাঁই নেই। ফলে সাধের হিন্দু কলেজের চেনা বারান্দা, রিচার্ডসন সাহেবের সেই স্নেহময় ক্লাসরুম, ভূদেব-রাজনারায়ণের সঙ্গে আড্ডা—সব এক নিমেষে হারিয়ে গেল। আমি গিয়ে ভর্তি হলাম বিশপস কলেজে। সেখানে গ্রিক আর ল্যাটিন ভাষার এক নতুন সমুদ্রের সন্ধান তো পেলাম, কিন্তু ভেতরের একাকীত্বটা দিন দিন গ্রাস করছিল আমাকে। পিতার পাঠানো কাড়ি কাড়ি টাকার চশমশানি বন্ধ হয়ে গেল। খিদিরপুরের সেই রাজপ্রাসাদ ছেড়ে তখন আমি এক চিলতে সস্তা ঘরে এসে উঠেছি। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর সেই দিনগুলোতে যখন ক্ষিধের চোটে পেট চোঁ চোঁ করত, তখন ঘরের ভাঙা জানলা দিয়ে কলকাতার আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবতাম, মাইকেল, তুমি যা চেয়েছিলে, তা-ই তো পেয়েছ। তবে এই বুকভাঙা কান্নাটা কিসের?
কলকাতার এই দমবন্ধ করা পরিবেশ আর একাকীত্ব যখন আর সহ্য হচ্ছিল না, তখন একদিন কাউকে কিছু না বলে, স্রেফ বুকভরা একরাশ অভিমান নিয়ে মাদ্রাজের একটা জাহাজে উঠে বসলাম। সালটা ছিল ১৮৪৮। মাদ্রাজের অচেনা শহর, অচেনা ভাষা। সেখানে গিয়ে বাঁচবার তাগিদে একটা স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করলাম। আর ঠিক তখনই আমার জীবনে এলো রেবেকা। রেবেকা থম্পসন—এক ইউরেশিয়ান তরুণী, যার চোখের দিকে তাকালে নীল সমুদ্রের গভীরতা দেখা যেত। এক বুক শূন্যতা নিয়ে আমি রেবেকাকে ভালোবেসে ফেললাম, আমাদের বিয়েও হলো। একে একে চারটে সন্তান আমাদের ঘর আলো করে এলো—বার্থা, ফিবি আর দুই পুত্র। মাদ্রাজেই আমি প্রথম মন খুলে লিখতে শুরু করলাম, তবে তা বাংলায় নয়, ইংরেজিতে। ‘দ্য ক্যাপটিভ লেডি’ লিখে যখন সাহেবদের বাহবার অপেক্ষায় রইলাম, তখন চারপাশ থেকে শুধু এক অদ্ভুত নীরবতা উপহার পেলাম। সাহেবরা পিঠ চাপড়ে বলল, বেশ লিখেছ হে নেটিভ!
সেই নেটিভ শব্দটা আমার অহংকারে গিয়ে তিরের মতো বিঁধল। বুঝলাম, ধার করা ভাষায় আর যাই হোক, অমর হওয়া যায় না। ওদিকে সংসারের খরচ বাড়ছে, রেবেকার সঙ্গেও কোথায় যেন একটা সূক্ষ্ম দেয়াল তৈরি হতে শুরু করেছে। ঠিক সেই সময়, ১৮৫৬ সালে একটা নীল খামে ভরা চিঠি এলো কলকাতা থেকে। পিতা আর ইহলোকে নেই। কলকাতার সেই বিশাল সম্পত্তি, ফেলে আসা কপোতাক্ষের স্মৃতি আর ভেতরের এক তীব্র অপরাধবোধ আমাকে টেনে হিঁচড়ে আবার কলকাতায় ফিরিয়ে আনল। কিন্তু ট্র্যাজেডিটা দেখুন। আমি যখন মাদ্রাজের ঘাট ছাড়ছি, রেবেকা আর আমার চার সন্তান কিন্তু আমার সঙ্গে সেই জাহাজে ওঠেনি। তাদের আমি ওখানেই ফেলে এসেছিলাম। একটা নতুন জীবনের খোঁজে, নাকি নিজের ভেতরের এক চরম স্বার্থপরতার টানে—সে উত্তর আজও আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দিতে পারি না। কলকাতায় যখন পা রাখলাম, তখন আমি আর সেই উনিশ বছরের অবুঝ কিশোর নই; আমি তখন এক নিঃসঙ্গ, সংসারহীন, ছন্নছাড়া মানুষ, যার পকেটে পিতার রেখে যাওয়া কিছু টাকা আর বুকে এক মহাসমুদ্রের হাহাকার।
৩
কলকাতায় যখন ফিরলাম, তখন আমার চারপাশের বাতাস যেন বদলে গেছে। চারদিকে একটা নতুন যুগের গন্ধ। ১৮৫৬ সালের সেই কলকাতা আমাকে আর সাহেব হওয়ার জন্য ডাকছিল না, সে যেন আমার ভেতরের খাঁটি বাঙালি কবিটাকে টেনে বের করার জন্য ওত পেতে বসেছিল। আমি তখন পাইকপাড়ার রাজবাড়ির সুহৃদদের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করেছি। থিয়েটারের নেশা তখন আমাকে পেয়ে বসেছে। একদিন এক নাটকের মহড়া দেখতে গিয়ে মনে হলো; আহা, আমাদের এই বাংলা ভাষার পায়ে কেমন যেন পদ্যের শিকল পরিয়ে রাখা হয়েছে! সেই চেনা পয়ার ছন্দের একঘেয়ে ততা থৈথৈ নাচ আমার আর সহ্য হচ্ছিল না। ভাবলাম, ভাষাকে যদি মুক্ত করতে না পারি, তবে এই জীবন রেখে লাভ কী?
ব্যস, কলম তুলে নিলাম। ১৮৬০ সালে লিখে ফেললাম তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে যা আগে কেউ কখনো দেখেনি, শুনেনি—আমি নিয়ে এলাম অমিত্রাক্ষর ছন্দ। অক্ষরের পায়ে যে শিকল ছিল, তা ভেঙে চুরমার করে দিলাম। লোকে বলল, মধুসূদন পাগল হয়েছে, এ কেমন খাপছাড়া ছন্দ! কিন্তু আমি জানতাম, এই ছন্দই একদিন বাংলা ভাষার রাজমুকুট হবে। আর তার ঠিক পরের বছর, ১৮৬১ সালে আমার জীবনের সেই শ্রেষ্ঠ ঝড়টা এলো—মেঘনাদবধ কাব্য। রামায়ণের সেই চেনা গল্পটাকে আমি উল্টে দিলাম। রাম-লক্ষণ নয়, আমার কলমে বীর হয়ে উঠল রাক্ষসরাজ রাবণ আর তার বীর পুত্র ইন্দ্রজিৎ। কেন জানেন? কারণ ওই মেঘনাদের পরাজয়ের মাঝে, ওই লঙ্কার ধ্বংসের মাঝে আমি আসলে নিজের জীবনের ট্র্যাজেডিটাকে দেখতে পাচ্ছিলাম। সমাজের সঙ্গে লড়াই করে হেরে যাওয়া এক একজন মানুষই তো একেকটা মেঘনাদ। পুরো কলকাতা তখন থরথর করে কাঁপছে আমার সেই শব্দের হুংকারে।
ঠিক এই উন্মাদনার দিনগুলোতেই আমার অন্ধকার জীবনে এক ফালি রোদ্দুর হয়ে এলো হেনরিয়েটা। হেনরিয়েটা সোফিয়া হোয়াইট। রেবেকাকে মাদ্রাজে ফেলে আসার যে অপরাধবোধ আমাকে প্রতিনিয়ত কুরে কুরে খাচ্ছিল, হেনরিয়েটা তার নরম হাতটি বাড়িয়ে সেই ক্ষতে যেন মলম লাগিয়ে দিল। সে আমার স্বভাবকে জানত, আমার খামখেয়ালিপনাকে বুঝত। ওদিকে পিতার রেখে যাওয়া সম্পত্তি নিয়ে শুরু হলো মামলা-মোকদ্দমা। টাকা আসছে দেদারসে, আবার চলেও যাচ্ছে জলের মতো। আমার তখন রাজকীয় চালচলন—দামি মদ, নামী ব্র্যান্ডের চুরুট, আর বন্ধুবান্ধব নিয়ে রোজ রাতে জলসা। কিন্তু মনের ভেতর বিলেত যাওয়ার সেই পুরনো পোকাটা মরেও মরছিল না। ভাবলাম, বাংলায় তো যা করার করলাম, এবার বিলেত গিয়ে ব্যারিস্টারিটা পাস করে আসি, তাহলে আর টাকার অভাব হবে না।
১৮৬২ সালের একটা মেঘলা দিনে হেনরিয়েটা আর সন্তানদের নিয়ে আমি অবশেষে সেই স্বপ্নের ইংল্যান্ডের জাহাজে চড়লাম। কিন্তু নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস! যে বিলেতকে দূর থেকে মনে হয়েছিল স্বর্গের উদ্যান, কাছে গিয়ে দেখলাম তা এক পাথুরে মরুভূমি। লন্ডনে পৌঁছানোর কিছুদিন পরেই কলকাতার সেই টাকার উৎসটা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল। খামখেয়ালি উকিলরা আমার সম্পত্তি নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে লাগল। দেনার দায়ে জর্জরিত হয়ে, সাহেবদের অপমান সইতে না পেরে আমি সপরিবারে পালিয়ে গেলাম ফ্রান্সের ভার্সাই শহরে। সেই ভার্সাইয়ের কনকনে শীতে, একটা ভাঙা ঘরের কোণে বসে যখন আমরা না খেয়ে দিন কাটাচ্ছি, হেনরিয়েটা যখন ক্ষুধার্ত সন্তানদের মুখে একটু খাবার তুলে দেওয়ার জন্য নিজের গায়ের শেষ গয়নাটা বিক্রি করে দিচ্ছে, তখন আমার অহংকার ধুলোয় মিশে গেল। ঘরের জানলা দিয়ে ফ্রান্সের বরফপড়া রাস্তার দিকে তাকিয়ে আমার কেবল মনে পড়ত সাগরদাঁড়ির সেই কপোতাক্ষ নদকে। বুক ফেটে কান্না আসত। সেই চরম দারিদ্র্যের অন্ধকারে বসে আমি লিখলাম আমার সনেটগুলো, আমার চতুর্দশপদী কবিতাবলী। বাংলার জন্য বুকটা তখন এমনভাবে টনটন করত যে মনে হতো—হায়, যদি আর একবার সেই কপোতাক্ষের জলে হাত ভেজাতে পারতাম!
৪
ফ্রান্সের সেই হাড়কাঁপানো শীত আর ক্ষুধার দিনগুলোতে যখন মনে হচ্ছিল আমরা বুঝি ওখানেই শেষ হয়ে যাব, ঠিক তখন ঈশ্বরের দূতের মতো হাত বাড়িয়ে দিলেন দয়ার সাগর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তাঁর পাঠানো টাকায় কোনোমতে দেনা চুকিয়ে, লণ্ডভণ্ড শরীর আর মন নিয়ে আবার ইংল্যান্ডে ফিরলাম। ১৮৬৬ সালে কোনো রকমে ব্যারিস্টারি পাসটা করলাম ঠিকই, কিন্তু ভেতরের সেই দাম্ভিক তরুণ মধুসূদন ততদিনে সম্পূর্ণ মরে গেছে। ১৮৬৭ সালে যখন হেনরিয়েটা আর সন্তানদের নিয়ে আবার কলকাতার ঘাটে পা রাখলাম, তখন আমার নামের পাশে ব্যারিস্টার তকমা লেগেছে বটে, কিন্তু পকেট আর ভাগ্য—দুটোই তখন ফুটো ছাতা।
কলকাতায় এসে হাইকোর্টে ওকালতি শুরু করলাম। কিন্তু আইন আদালতের ওই শুষ্ক কূটকচালি কি আর এই কবির মনকে টানে? মন পড়ে থাকত মদের গ্লাসে আর কাগজের পাতায়। ওকালতিতে মন দিতে পারলাম না, ফলে দেনার পাহাড়টা দিন দিন হিমালয়ের মতো উঁচু হতে লাগল। পাওনাদাররা সকাল-বিকেল আমার দরজায় এসে হানা দিত। অপমান আর দারিদ্র্যের সেই চরম মুহূর্তে আমার একমাত্র সঙ্গী ছিল ওই বিদেশি মদ। ভাবতাম, তরল আগুন বুকে ঢাললে বুঝি চারপাশের এই নরকযন্ত্রণা কিছুটা কমবে। কিন্তু তা হলো না; লিভারটা পচে গেল, বুক চিরে রক্ত আসতে লাগল। ওদিকে আমার হেনরিয়েটাও দিন দিন বিছানায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়ল। টাকার অভাবে সন্তানদের মুখে একটু ভালো খাবার, স্ত্রীর জন্য একটু ওষুধ কিনতে পারতাম না। বাংলার রাজমুকুট পরা কবি তখন কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় একবেলা খাবারের জন্য ঘুরছে, এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে!
১৮৭৩ সালের জুন মাস। কলকাতার আকাশ জুড়ে তখন বর্ষার মেঘ ভেঙে বৃষ্টি নামছে। ঠিক যেমনটা নেমেছিল আমার জন্মের দিন সাগরদাঁড়িতে। শরীরটা পুরোপুরি ভেঙে পড়ায় আমাকে ভর্তি করা হলো আলিপুরের জেনারেল হাসপাতালে। একটা দাতব্য হাসপাতালের সাধারণ বিছানায় আমি শুয়ে আছি, পাশে কেউ নেই। আমার সেই প্রাণের চেয়ে প্রিয় হেনরিয়েটাও তখন অন্য এক হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। ২৬শে জুন খবর এলো—হেনরিয়েটা আর নেই। আমার ডান হাতটা যেন কেটে পড়ে গেল। বিছানায় শুয়ে শুয়ে শূন্য দৃষ্টিতে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার কেবল মনে পড়ছিল শেকসপিয়রের সেই বিখ্যাত লাইনগুলো—Life's but a walking shadow, a poor player. That struts and frets his hour upon the stage... মনে হচ্ছিল, আমার এই ৪৯ বছরের জীবনটাও তো এক ছায়াবাজি ছাড়া আর কিছু ছিল না। সাহেব হতে চেয়েছিলাম, অথচ আজ মরতে বসেছি এক অনাথের মতো।
আজ ২৯শে জুন। আমার চোখের আলো আস্তে আস্তে নিভে আসছে। চারপাশের কলকাতার এই কোলাহল, বৃষ্টির শব্দ সব কেমন যেন দূরে সরে যাচ্ছে। এই শেষ মুহূর্তে চোখের সামনে কলকাতা কিংবা বিলেতের কোনো রাজপ্রাসাদ ভেসে উঠছে না। আমি দেখতে পাচ্ছি সেই ছোট্ট সাগরদাঁড়ি গ্রামকে। কপোতাক্ষ নদের শান্ত জল আমার পায়ের কাছে এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে। মা জাহ্নবী দেবী যেন ঘাটে দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকছেন, মধু, ঘরে ফিরে আয় বাবা, অনেক তো হলো! হ্যাঁ মা, আমি আসছি। এই পৃথিবীর দেনা-পাওনা, অমিত্রাক্ষর ছন্দ, মেঘনাদবধ—সব এই হাসপাতালের বিছানায় ফেলে রেখে আমি তোমার কোলে ফিরে আসছি। হে আমার বাংলার মানুষ, যদি পারো, এই হতভাগ্য কবিকে ক্ষমা করে দিয়ো।
দাঁড়াও, পথিক-বর, জন্ম যদি তব
বঙ্গে! তিষ্ঠ ক্ষণকাল! এ সমাধি-স্থলে
(জননীর কোলে শিশু লভয়ে যেমন
বিরাম) মহি-কোল-সেবা অবহেলে
কবিবর মধুসূদন!



পাঠকের মন্তব্য