: অসহ্য, একদম অসহ্য! কিছুতেই মিলছে না তো...
একটা অসুস্থ, খসখসে কর্কশ গলা চারপাশের নিঝুম ভাবটা এক ঝটকায় ভেঙে দিল। তারপরই শোনা গেল নিজের মনে কিছু বিড়বিড়ানি আর ধপাধপ টেবিল চাপড়ানোর শব্দ।
জায়গাটা খিদিরপুর, দক্ষিণ-পশ্চিম কলকাতা। একটা চকমিলানো দোতলা বাড়ি। বাড়িটার দোতলায় একটা রুমে একজন লোক টেবিলে বসা, একদম টানটান! হাতে কলম আর দোয়াত। রুমে অস্থিরভাবে ঘুরছেন এক ভদ্রলোক। সাহেবি কোট-প্যান্ট, চোখে চশমা, মুখে চুরুট। মাইকেল মধুসূদন দত্ত!
১৮৬০ সালের গ্রীষ্মের দুপুর। বাইরে যেমন চৈত্রের গনগনে রোদ, কবির ভেতরের জগতটাও যেন তেমনি খটখটে রোদে ফেটে চৌচির হয়ে আছে! ঘরের ভেতরটা থমথমে, শুধু মাঝেমধ্যে কলমের খসখস শব্দ। মধুসূদন ঘরের এক মাথা থেকে অন্য মাথায় যাচ্ছেন, আবার ফিরে আসছেন। চোখ দুটো বন্ধ, কপাল কুঁচকে আছে- মনে হচ্ছে যেন কোনো অদৃশ্য জগতের সাথে কথা বলছেন তিনি।
হঠাৎ তিনি থমকে দাঁড়ালেন। চোখ বন্ধ রেখেই লিপিকারের দিকে আঙুল তাক করে মেঘের মত স্বরে বলে উঠলেন, লেখো হে পীতাম্বর...
ব্যস, মুহূর্তের মধ্যে যেন ঝড় শুরু হয়ে গেল! কবির মুখ থেকে বের হওয়া একেকটা কথা যেন শব্দ নয়, আগ্নেয়গিরির ফুটন্ত লাভা!
সম্মুখ সমরে পড়ি, বীর-চূড়ামণি
বীরবাহু, চলি যবে গেলা যমপুরে
অকালে, কহ, হে দেবি অমৃতভাষিণি!
কোন্ বীরবরে বরি সেনাপতি পদে,
পাঠাইলা রণে পুনঃ রক্ষঃকুলনিধি
রাঘবারি?
কবির জীবনে চলছে নানান ঝড়-ঝাপটা। শরীর খারাপ, মন ভালো নেই, তার ওপর মারাত্মক টাকার টানাটানি। একসময়কার কোটিপতি উকিলের আদুরে রাজপুত্র আজ এমন এক অবস্থায় এসে ঠেকেছেন যে পকেট একেবারে গড়ের মাঠ! আদালতের দোভাষীর ওই সামান্য মাইনে দিয়ে বিলাসী জীবন আর বড় পরিবার চালাতে গিয়ে ঋণের পাহাড়ে নাক পর্যন্ত! এমনকি মুখে মুখে যে মহাকাব্যটা বানাচ্ছেন, সেটা ছাপানোর খরচটুকুও তাঁর নেই!
ওদিকে, খ্রিষ্টান হওয়া আর সাহেবি চালচলনের জন্য সমাজের বড় বড় মাতব্বরেরা তাকে একঘরে করে রেখেছে। কিন্তু এই সব অভাব-অনটন আর অপমানকে একপাশে সরিয়ে, সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মধুসূদন আজ এক নতুন পাতা খুলে বসেছেন। কাচঁকলাই দেখাবেন তিনি- রক্ষণশীল সমাজ, পুরোনো বাংলা কবিতার নিয়ম, ইংরেজ- সবাইকে!
লিপিকারের কলম তখন পাগলপ্রায়! কিন্তু মধুসূদনের থামার জো নেই! এক মুহূর্তও না জিরিয়ে তিনি ঘুরে এসে দাঁড়ালেন আবার টেবিলের দিকে। চোখ কিন্তু তার বন্ধই।
: আবার শুরু কর...
বলেই তিনি কাব্যের আরেকটা পার্ট বলা শুরু করলেন। তার মাথায় তখন একসাথে ঘুরছে রাবণের হাহাকার, প্রমীলার বীরত্ব আর মেঘনাদের দেশপ্রেম। একেকটা টেবিল মানে আসলে 'মেঘনাদবধ কাব্য'-এর একেকটা চ্যাপ্টার।
ছন্দের ব্যাপারে তিনি এক দারুণ ভেলকিবাজ। সেকালে কবিরা কবিতা লিখতেন 'পয়ার' ছন্দে- মানে লাইনের শেষে মিল থাকাটা ছিল মাস্ট। কিন্তু মধুসূদন তা মানবেন কেন? তিনি তো এসেছেন সবাইকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাতে! চুরুটের ধোঁয়া উড়িয়ে তিনি মনে মনে হাসলেন।
এদিকে লিপিকার লিখতে লিখতে হাঁপিয়ে উঠছেন, কারণ মধুসূদনের বলা লাইনের শেষে কোনো মিলই নেই! লিপিকার ভাবছেন কবি হয়তো একটু পরে থামবেন, কিন্তু কোথায় কী! কবির ভাবনা এক লাইন থেকে ছুটে চলে যাচ্ছে পরের লাইনে, তারপরের লাইনে-ঠিক যেন পাহাড়ি ঝরনা, কোনো বাঁধ মানছে না।
কিন্তু কিছুক্ষন পর আর থাকতে না পেরে বলেই ফেললেন,
: দত্ত মশাই, লাইনের শেষে যে কোনো মিল মিলছে না! কলকাতার রক্ষণশীল সমাজ আর পণ্ডিতরা তো একে কবিতাই বলবে না, হাসাহাসি করবে! বলবে এটা কোনো কবিতাই হয়নি, এ তো গদ্য!
মধুসূদন চোখ খুললেন। সে চোখে এক আত্মবিশ্বাসী বিদ্রোহীর চকমকে আলো। তিনি হাহা করে হেসে উঠে বললেন,
: বলুক গে! বাঙালির কান এই অমিত্রাক্ষর ছন্দের রাজকীয় চাল সহ্য করতে পারবে না। ওরা ওই একঘেয়ে পয়ারের নূপুরের ছমছম আওয়াজ শুনতেই অভ্যস্ত। আমি ওদের শোনাব যুদ্ধের দামামা, মেঘের গর্জন! মিলের গোলামি আমি করব না। যেখানে কথা শেষ হবে, দাড়ি সেখানে পড়বে, লাইনের শেষে নয়! আর সমাজ? তারা রাম-লক্ষ্মণকে ভগবান মেনে বসে থাকুক, এই রাম আর তার বাঁদরসেনারা আমার বড় অপছন্দ। আমার কাব্যে রাক্ষসরাজ রাবণ আর বীর মেঘনাদই হবে আসল হিরো!
আবার শুরু হলো পায়চারি। চুরুটের ছাইয়ে মেঝে মাখামাখি, সেদিকে খেয়ালই নেই তার। তিনি আবার চোখ বন্ধ করলেন। প্রচণ্ড জ্বরের ঘোরে তার শরীর তখনও পুড়ছে। গত কয়েকদিন বিছানায় শয্যাশায়ী থেকেও মাথায় এই সৃষ্টির পাগলামি একটুও কমেনি। এই তো সেদিনই চিঠিতে এক বন্ধুকে লিখেছিলেন, এটা যেন একটা যুদ্ধ ছিল- মেঘনাদ আমাকে শেষ করবে, নাকি আমি মেঘনাদকে শেষ করব! ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আমি জিতে গেছি। ও (মেঘনাদ) মারা গেছে...
হঠাৎ তার চোখের কোণ বেয়ে দু-ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। চোখের সামনে থেকে তখন কলকাতার তপ্ত দুপুর মুছে গিয়ে ভেসে উঠেছে স্বর্ণলঙ্কা! লক্ষ্মণ অন্যায়ভাবে নীরস্ত্র মেঘনাদকে কোপাচ্ছে! নিজের সন্তানের মতো প্রিয় চরিত্র মেঘনাদ আর প্রমীলার এই নির্মম পরিণতি যেন কবির নিজের বুকেই এসে বিঁধছে। শোক আর সৃষ্টির এক অদ্ভুত যন্ত্রণায় তার ঠোঁট কাঁপতে লাগল।
বিকেল গড়িয়ে যখন সন্ধ্যা নামল, ঘরের আলোগুলো জ্বলল, তখন লিপিকারবাবু ক্লান্তিতে একদম শেষ। কিন্তু মধুসূদনের চোখে ক্লান্তি নেই, আছে এক স্বর্গীয় তৃপ্তি। তিনি চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রাখলেন। এক গ্লাস জল খেয়ে চাঙ্গা গলায় বললেন,
: আজ এই পর্যন্তই থাক ভাই! আমরা বাংলা ভাষার খাঁচাটা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছি। আমার মেঘনাদকে আমি অমর করে বিদায় দিলাম।
শেষের দিকে তার গলাটা আবেগে একটু বুজে এলো। জীবনের নানামুখী যুদ্ধে জিতে মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যের ঝুলিতে প্রথমবারের মত ভার্জিল, দান্তে, মিল্টনের মত প্রপার মহাকাব্য- 'মেঘনাদবধ কাব্য’। যার আগে সবাই বলত যে, বাংলা? ছ্যাহ! ওতে কি আর মহাকাব্য হয়? যত্তসব আজেবাজে কথা!
সেদিন বাংলার এই কলঙ্ক-মুক্তিও ঘটল, আর সেইসাথে বাংলা কবিতা মুক্ত হলো ছন্দের গোলামি থেকে, আর পেলো আরেক ব্রহ্মাস্ত্র- অমিত্রাক্ষর ছন্দ।



পাঠকের মন্তব্য