ব্রাজিলিয়ান জাপানিজ? নাকি জাপানিজ ব্রাজিলিয়ান?

২৫ পঠিত ... ১৩ ঘন্টা ৩৪ মিনিট আগে

জাপানের বাইরে সবচেয়ে বেশি জাপানি কোথায় থাকে?
অনেকেই বলবে, আমেরিকা। কেউ বলবে, কানাডা। আরেকটু জ্ঞানী হলে বলতে পারে- হাওয়াই!
কিন্তু সত্যিটা হলো—ব্রাজিল।
শুনতে অদ্ভুত লাগে, তাই না? জাপানের উল্টো দিকের দেশ ব্রাজিল। মাঝখানে বিশাল প্রশান্ত মহাসাগর।
অথচ সেখানেই এখন প্রায় বিশ লাখ জাপানি বংশোদ্ভূত মানুষ থাকে। পৃথিবীর আর কোনো দেশে এত বেশি জাপানি নেই, এক জাপান ছাড়া।
কীভাবে গেল ওরা? কেন গেল?
সময়টা ১৯০৮ সাল।
জাপানে অর্থনৈতিক অবস্থা তখন বেশ খারাপ। খাওয়ার মানুষ বেশি, চাষের জমি কম। যারা চাষাবাদ করতেন, তাদের পরিস্থিতি কঠিন। ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ নেই।
ওদিকে ব্রাজিল বিশাল এক দেশ। জমির শেষ নেই। কফির বাগানের জন্য দরকার হাজার হাজার শ্রমিক।
তখন দাসপ্রথা শেষ হয়ে গেছে। আফ্রিকা থেকে লোক আনা যাচ্ছে না।
ইতালিয়ানরা তখনকার বড় শ্রমিক গোষ্ঠী ছিল ব্রাজিলে। উনিশ শতকের শেষের দিকে কয়েক লাখ ইতালিয়ান কফি বাগানে কাজ করতে যায়।
কিন্তু ১৯০২ সালে ইতালি সরকার এক বিশেষ আইন জারি করে ব্রাজিলে শ্রমিক অভিবাসন নিষিদ্ধ করে দেয়।
কারণ ব্রাজিলের কফি বাগানে ইতালিয়ান শ্রমিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও দাসসদৃশ অবস্থার খবর ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছিল।
যার ফলে ইতালি থেকে নতুন শ্রমিক আসা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ঠিক এই শূন্যস্থান পূরণ করতেই ব্রাজিল জাপানের দিকে তাকায়।
জাপান সরকারও এতে রাজি হয়। তাদের ভাবনা ছিল, আমাদের কৃষকেরা যাবে। কাজ করবে। টাকা জমিয়ে ফিরে আসবে।
এভাবেই ১৯০৮ সালে কাসাতো মারু নামের এক জাহাজ সাতশোরও বেশি জাপানি নিয়ে ব্রাজিলের পথে রওনা দিল। এদের বেশিরভাগই ছিল কৃষক। পরনে জাপানি পোশাক। মনে স্বপ্ন—পাঁচ-ছয় বছর খেটেখুটে আবার দেশে ফিরবে।
জাহাজ থেকে নেমেই তারা পড়ে বিপদে।
একে তো তারা ভাষা বোঝে না। পর্তুগিজ ভাষা ওদের কাছে মনে হতো, কেউ খুব জোরে গান গাইছে। একটা শব্দও তাদের মাথায় ঢোকে না।
আবার খাবার চিনতে পারে না। জাপানে ওরা ভাত খায়, মাছ খায়, সয়া সস দেয়। আর এখানে এত বড় বড় গরুর মাংসের টুকরা পুড়িয়ে একজন লোক খেয়ে ফেলে!
কফি বাগানের কাজটাও প্রচণ্ড কষ্টের। সকাল থেকে সন্ধ্যা রোদে দাঁড়িয়ে কফি ফল তোলা লাগে। হাতে ফোসকা পড়ে, শরীর খারাপ হয়। অনেকে পালানোর চেষ্টা করে। অনেকে অসুস্থ হয়ে মারা যায়।
কিন্তু জাপানিরা সহজে হার মানে না। ওরা বুঝতে পারে, শুধু শ্রমিক হয়ে থাকলে হবে না। নিজেদের কিছু করতে হবে।
তাই অল্প অল্প করে জমি লিজ নেওয়া শুরু করে। তারপর নিজেরাই চাষ করে।
জাপানিরা ছোট জমি থেকেও বেশি ফলন বের করতে পারে। এটা ওদের পুরোনো অভ্যাস। ওরা শুধু কফি না, সবজি চাষ শুরু করল। স্ট্রবেরি, টমেটো, আলু, চা, পার্সিমন—এমন সব জিনিস আনল, যেগুলো ব্রাজিলে আগে তেমন কেউ চাষ করত না।
ব্রাজিলের মানুষ তো অবাক। ওরা বলত, এই জাপানিরা জমির সাথে এমনভাবে কথা বলে, যেন জমিটা ওদের পরিবারের কেউ।
কয়েক বছরের মধ্যে সাও পাওলো শহরের আশপাশের সবজির বাজার জাপানিদের হাতে চলে গেল। তারপর ধীরে ধীরে ওরা শহরে আসতে লাগল।
কেউ দোকান দিল। কেউ দিল কাপড়ের ব্যবসা। কেউ বড় অফিসে চাকরি নিল। কেউ ডাক্তার হলো, ইঞ্জিনিয়ার হলো, শিক্ষক হলো।
আজ ব্রাজিলের বহু নামী চিকিৎসক, অধ্যাপক, বিজ্ঞানী, এমনকি সরকারি কর্মকর্তাও জাপানি বংশোদ্ভূত। যে মানুষগুলো একদিন কফি বাগানে ঘাম ঝরিয়েছিল, তাদের নাতিরা এখন বিশ্ববিদ্যালয় চালায়।
তবে একটা জিনিস ওরা কোনোদিন ছাড়েনি—বাড়িতে ঢুকে গেলে ওরা এখনো জাপানি হয়ে যায়।
বেশিরভাগ পরিবারে এখনো ভাত, মিসো স্যুপ, সুশি রান্না হয়। দাদু-দাদিরা জাপানি ভাষায় কথা বলেন। নাতিরা উত্তর দেয় পর্তুগিজে। দুজনেই একে অপরকে বোঝে।
এটা দেখে ভাষাবিদরা অবাক হয়ে যান। আর দাদুরা বলেন, বাচ্চাটা একটু অলস, তাই জাপানি শেখে না।
কিন্তু ঘরের বাইরে ওরা পুরো ব্রাজিলিয়ান। বারবিকিউ খায়, ফুটবল দেখে, কার্নিভালে নাচে। ফুটবল তো ওদের রক্তে মিশে গেছে।
মজার ব্যাপার হলো, ওরা জাপানি সুশিও খায়, আবার গরুর মাংসের চুরাসকোও খায়। ওদের সুশিতে নাকি কখনো ক্রিম চিজও থাকে।
জাপানের মানুষ এটা দেখে প্রথমে হাসে, পরে খেয়ে দেখলে চুপ হয়ে যায়। জিহবার স্বাদ আসলে কোনো সীমানা মানে না।
১৯৯০ সালের দিকে জাপানে কারখানা বেড়ে গেল। গাড়ি, ইলেকট্রনিকস—সব জায়গায় শ্রমিক দরকার। কিন্তু জাপানের নিজের লোক কম।
জাপান সরকার এক বুদ্ধি বের করল। বলল, "যাদের পূর্বপুরুষ জাপানি, তারা চাইলে এসে কাজ করতে পারবে।"
খবরটা ব্রাজিলের জাপানি পরিবারগুলোতে ছড়িয়ে পড়ল। দাদু একশো বছর আগে কাজের জন্য ব্রাজিলে গিয়েছিলেন। এখন নাতি কাজের জন্য জাপানে ফিরবে! ইতিহাস যেন গোল হয়ে ঘুরে।
হাজার হাজার তরুণ-তরুণী জাপানে ফিরে গেল। ওরা গাড়ি কারখানায় কাজ নিল, ইলেকট্রনিকস ফ্যাক্টরিতে কাজ নিল।
কেউ বড় অফিসে চাকরি পেল, কেউ নিজের ব্যবসা খুলল। কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেল, পরে শিক্ষক বা প্রকৌশলী হয়ে গেল।
কিন্তু সমস্যা হলো—এদের চেহারা জাপানি, কিন্তু ভাষা পর্তুগিজ। জাপানি কারখানার ম্যানেজার ভাবেন, ছেলেটা জাপানি। ওকে জাপানি ভাষায় নির্দেশ দেন।
ছেলে তাকিয়ে থাকে, কিছুই বোঝে না। শেষে বলে, Bom dia! (পর্তুগিজে শুভ সকাল)।
ম্যানেজার মাথা চুলকান। ব্যাপারটা ওর কাছে একেবারে নতুন।
এখন জাপানের কিছু শহর, যেমন হামামাৎসু আর টয়োহাশিতে, ব্রাজিলিয়ান-জাপানিরা অনেক। এই সংখ্যা টাও প্রায় দুই থেকে আড়াই লাখের মতো।
সেখানে পর্তুগিজ ভাষায় সাইনবোর্ড দেখা যায়। ব্রাজিলিয়ান রেস্তোরাঁ আছে। সাম্বা নাচের ক্লাসও হয়।
একজন মানুষের নাম ধরা যাক, তানাকা। ওর দাদু জাপান থেকে ব্রাজিলে গিয়েছিলেন। সে এখন জাপানে থাকে।
জাপানিরা তাকে বলে, তুমি ব্রাজিলিয়ান। আর ব্রাজিলে গেলে ওরা বলে, তুমি জাপানি।
তানাকা কিছু না বলে হাসে।
এই গল্পটা শুধু জাপান আর ব্রাজিলের নয়। এটা মানুষের গল্প।
মানুষ যেখানে যায়, সেখানে শুধু নিজের স্যুটকেস নিয়ে যায় না। সঙ্গে নিয়ে যায় রান্নার গন্ধ, ভাষার টান, উৎসবের রঙ, পুরোনো স্মৃতি আর নতুন স্বপ্ন।
১৯০৮ সালে যদি কফির বাগানে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ক্লান্ত জাপানি কৃষককে কেউ বলত—
"আপনার নাতি একদিন আবার জাপানে ফিরবে। তবে কৃষক হিসেবে নয়, রোবট কারখানার টেকনোলজিস্ট কিংবা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে। আর সে পর্তুগিজ ভাষায় বেশি স্বচ্ছন্দ হবে।"
লোকটা হয়তো অবাক হয়ে বলতেন, আচ্ছা... কিন্তু ও ভাত খাবে তো?
এই প্রশ্নের উত্তর একশো বছর পরেও একই রয়ে গেছে।
হ্যাঁ, ভাত সে খায়। তবে সঙ্গে কখনও সুশি থাকে, আর কখনও বারবিকিউ।
আর টিভিতে ব্রাজিল বনাম জাপানের খেলা দেখে, তখন কোন পক্ষে গলা ফাটাবে, সেটা ঠিক করতে পারে না। এ এক অদ্ভুত সংকট।

 

২৫ পঠিত ... ১৩ ঘন্টা ৩৪ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top