সতলুজ বর্তমান সময়ের ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত একটি প্রজেক্ট, যা কেবল একটি সিনেমা নয়, বরং পাঞ্জাবের এক উত্তাল ও অন্ধকার সময়ের নির্মম দলিল। সিনেমাটি নির্মিত হয়েছে প্রখ্যাত মানবাধিকারকর্মী জস্বন্ত সিং খালরার জীবনের ওপর ভিত্তি করে, যিনি আশির ও নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে পাঞ্জাবে চলমান বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের বিপরীতে নিরাপত্তা বাহিনীর চালানো অমানবিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। খালরা সেই সময়ে এমন এক ভয়াবহ সত্য সামনে নিয়ে আসেন, যা তৎকালীন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, পাঞ্জাব পুলিশের একটি অংশ অভিযানের নামে হাজার হাজার মানুষকে গুম করে এবং তাদের মৃতদেহ পরিবারের অজান্তে গোপনে দাহ করেছে, যার কোনো আনুষ্ঠানিক নথি রাষ্ট্র রাখেনি। এই সাহসী সত্য উদঘাটনের মূল্য দিতে গিয়ে ১৯৯৫ সালে তাঁকে অপহরণ করে হত্যা করা হয় এবং দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর তাঁর খুনিরা দোষী সাব্যস্ত হয়।
এই সিনেমাটি সেই সময়ের দমবন্ধ করা ভয়ের পরিবেশ, রাষ্ট্রের কঠোর দমননীতি এবং একজন সাধারণ মানুষের অসামান্য সাহসিকতার গল্প তুলে ধরে। এটি কোনো কাল্পনিক বা মশলাদার কাহিনী নয়, বরং ভারতের সাম্প্রতিক ইতিহাসের এক রক্তাক্ত বাস্তবতার চিত্রায়ন। সিনেমাটি পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন ‘রাত আকেলি হ্যায়’ খ্যাত নির্মাতা হানি ত্রেহান, যিনি শুরু থেকেই চেয়েছিলেন কোনো রকম কাটছাঁট বা আপস ছাড়াই সিনেমাটি দর্শকের কাছে পৌঁছাতে। এখানে নাম ভূমিকায় অর্থাৎ জস্বন্ত সিং খালরার চরিত্রে অভিনয় করেছেন পাঞ্জাবি সুপারস্টার দিলজিৎ দোসাঞ্জ। শোনা যায়, গল্পের গুরুত্ব ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে দিলজিৎ এই সিনেমার জন্য কোনো পারিশ্রমিক নেননি। তার স্বভাবসুলভ অভিনয় ও চরিত্র রূপায়ণের গভীরতা সিনেমাটিকে এক ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য চরিত্রে দেখা গেছে অর্জুন রামপাল, সুভিন্দর ভিকি ও কনওয়ালজিৎ সিংয়ের মতো অভিনেতাদের।
সিনেমার নামকরণের ইতিহাসটিও বেশ ঘটনাবহুল। শুরুতে এর নাম রাখা হয়েছিল ‘ঘাল্লুঘারা’, যা শিখ ইতিহাসের একটি গভীর বেদনাদায়ক অধ্যায়ের সাথে সম্পর্কিত। কিন্তু সেন্সরশিপ ও বিতর্কের মুখে নাম বদলে রাখা হয় ‘পাঞ্জাব '৯৫’ এবং সবশেষে এটি ‘সতলুজ’ নামে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পায়। প্রায় ২ ঘণ্টা ৪৫ মিনিটের এই রাজনৈতিক ড্রামাটি শুরু থেকেই সেন্সর বোর্ডের রোষানলে পড়েছিল। অথচ নির্মাতারা চেয়েছিলেন ইতিহাসের এই ক্ষতচিহ্নগুলো কোনো বিকৃতি ছাড়াই নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে, যা শেষ পর্যন্ত এক দীর্ঘ আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার জন্ম দেয়।
সিনেমাটির মুক্তি পাওয়ার পথটি ছিল অত্যন্ত কণ্টকাকীর্ণ এবং দীর্ঘ আইনি ও প্রশাসনিক লড়াইয়ের ইতিহাস। সিনেমাটি যখন সার্টিফিকেশন বোর্ডের (CBFC) কাছে জমা দেওয়া হয়, তখন বোর্ড সেটির ওপর বিপুলসংখ্যক সংশোধনের দাবি তোলে। পরিচালক হানি ত্রেহানের মতে, শুরুতে বোর্ড ২১টি পরিবর্তনের কথা বললেও পরে সেই দাবি ১২৭টি কাটছাঁটের পর্যায়ে গিয়ে ঠেকে। বোর্ডের পক্ষ থেকে সিনেমার নাম পরিবর্তন, কেন্দ্রীয় চরিত্র জস্বন্ত সিং খালরার উল্লেখ বাদ দেওয়া এবং পুলিশের সহিংসতার দৃশ্য ছেঁটে ফেলার মতো কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরিচালকের মতে, এই শর্তগুলো মেনে নিলে সিনেমার মূল বক্তব্য ও ঐতিহাসিক সত্যতা পুরোপুরি হারিয়ে যেত। এ নিয়ে নির্মাতারা বোম্বে হাইকোর্টে লড়াই শুরু করলেও, শেষ পর্যন্ত সার্টিফিকেট পাওয়ার আশায় মামলা প্রত্যাহার করে নেন। তবে তাতেও বিবাদ মেটেনি, বরং নতুন নতুন আপত্তির মুখে প্রায় তিন বছর ধরে সিনেমাটি ঝুলে থাকে।
অবশেষে সমস্ত আইনি জট ও সেন্সর বোর্ডের বিতর্ক এড়িয়ে নির্মাতারা কোনো রকম কাটছাঁট ছাড়াই সিনেমাটি সরাসরি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ZEE5-এ মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। যেহেতু সরাসরি ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তির ক্ষেত্রে সেন্সর বোর্ডের সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক নয়, তাই নির্মাতারা ভেবেছিলেন দর্শক অবশেষে সিনেমাটি দেখতে পারবেন। গত শুক্রবার ‘সতলুজ’ নামে এটি অনলাইনে মুক্তিও পায় এবং সমালোচকদের কাছ থেকে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়। দিলজিৎ দোসাঞ্জ নিজেও তার ভক্তদের উদ্দেশ্যে লাইভ ভিডিওতে বলেছিলেন যে, তিনি জানতেন সরকারি দপ্তরে বিষয়টি পৌঁছালে বড় কোনো বাধা আসতে পারে, তবে এত দ্রুত সিনেমাটি সরিয়ে নেওয়া হবে তা তিনি ভাবেননি। ঠিকই তার আশঙ্কা সত্যি করে মুক্তির মাত্র দুই দিনের মাথায় রবিবার সন্ধ্যায় ভারত সরকারের পক্ষ থেকে সিনেমাটি সরানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
সিনেমাটি সরানোর পেছনে নির্দিষ্ট কোনো কারণ সরাসরি জানানো না হলেও, সরকারের পক্ষ থেকে ‘বর্তমান পরিস্থিতি’ ও ‘জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগ’-এর দোহাই দেওয়া হয়েছে। তথ্য ও প্রযুক্তি আইন (IT Rules 2021) ও ধারা ৬৯এ-র আওতায় এই নির্দেশ দেওয়া হয়। সরকারি মহলের ভাষ্যমতে, সিনেমাটি পাঞ্জাবের শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট করতে পারে এবং এটি একতরফা বা উস্কানিমূলক হতে পারে বলে আশঙ্কা ছিল। দিলজিৎ দোসাঞ্জসহ সিনেমাটির সাথে জড়িতদের দাবি, প্রচার সীমিত রাখার পরেও সরকারি নজরদারি এড়ানো সম্ভব হয়নি। বর্তমানে সিনেমাটি ভারতে আনুষ্ঠানিকভাবে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। ZEE5 কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে তারা এটি পুনরায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে, কিন্তু এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ভারতে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের স্বাধীনতা এবং সেন্সরশিপের বিষয়টি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।



পাঠকের মন্তব্য