শিক্ষকের অভাবে যখন শিশুর ধর্ম বই বদলে যায়

৯৫ পঠিত ... ১১ ঘন্টা ৩৯ মিনিট আগে

ফেনী পরীক্ষণ বিদ্যালয়ে পড়তাম আমি।
আমাদের সাথে একটা ছেলে পড়ত। শান্তশিষ্ট, গোলগাল মুখ। সে বৌদ্ধ। নাম অভিজিৎ বড়ুয়া।


যখন ধর্মের ক্লাস আলাদা হতো—ইসলাম ধর্মের শিক্ষকেরা একদিকে যেতেন, সনাতন ধর্মের শিক্ষকেরা অন্যদিকে—তখন ওই ছেলেটা একা বেঞ্চে বসে থাকত। স্কুলে কোনো বৌদ্ধ ধর্মের শিক্ষক ছিলেন না। আমাদের সুপারিনটেনডেন্ট
একদিন এসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, তুমি বাবা আজ থেকে হিন্দু ধর্মটাই পড়ো। কাছাকাছিই তো!

একটা আট-নয় বছরের বাচ্চার কাছে ঈশ্বরের রূপ কেমন, সেটা তার ভেতরের এক পরম বিস্ময়। কিন্তু সুপার স্যারের এক ঘোষণায় তার ধর্ম পাল্টে গেল, স্রেফ একজন শিক্ষকের অভাবে। সে পরীক্ষা দিল, খাতায় পৃষ্ঠা ভরে লিখে আসলো এমন কিছু মন্ত্র বা নিয়ম, যা তার ঘরের আবহাওয়ার সাথে মেলে না। শুধু নম্বর পাওয়ার জন্য সে মুখস্থ করে গেল।

আসলে আমাদের চারপাশের ধর্মের বইগুলো কেমন যেন অদ্ভুত নিয়মে বাঁধা। সেখানে প্রতিটা ধর্মের বইয়ের পাতা উল্টালেই দেখা যায়, শুধু নিজ নিজ ধর্মের গুণগানে ভরপুর। যেন ঈশ্বর একটা নির্দিষ্ট সিলেবাস তৈরি করে দিয়েছেন, আর সেই সিলেবাস হুবহু না লিখলে পরম করুণাময় রাগ করবেন। পৃষ্ঠা ভরে পাতার পর পাতা অলংকার দিয়ে সাজিয়ে লিখলেই শিক্ষকেরা খুশি হয়ে লাল কালিতে দশের মধ্যে নয় বসিয়ে দেন। অথচ ভেতরে রয়ে যায় মস্ত বড় এক শূন্যতা।

মাঝে মাঝে ভাবি, এই ধর্মের বইগুলো আলাদা না হয়ে যদি সবার জন্য একটা কমন বই হতো, তবে কেমন হতো?

সেই বইয়ে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের প্রতিযোগিতা থাকত না। সেখানে পৃথিবীর সব ক'টি প্রধান ধর্ম নিয়ে খুব সহজ, সুন্দর আলোচনা থাকত। মানুষ কীভাবে বিশ্বাস করতে শিখল, সেই বিবর্তনের গল্প থাকত। এমনকি খুব স্পষ্ট করে লেখা থাকত নাস্তিকতার কথাও। যারা কোনো কিছুতেই বিশ্বাস করে না, তাদের যুক্তিগুলোও সেখানে ঠাঁই পেত।

সবচেয়ে সুন্দর হতো যদি সেই বইয়ের একদম শেষ চ্যাপ্টারে একটা প্রশ্ন থাকত—আচ্ছা, তোমার কী মনে হয়? ঈশ্বর কি আসলেই আছেন, নাকি তিনি মানুষের মনের এক পরম আশ্রয়?

সেখানে কোনো বাঁধাধরা উত্তর থাকত না। একেকটা শিশু তার নিজের মতো করে ভাবত। কেউ লিখত, রাতের আকাশে যখন অজস্র তারা দেখি, তখন মনে হয় একজন কেউ নিশ্চয়ই আছেন। আবার কেউ হয়তো তার নিজের খাতার কোণায় লিখে রাখত, আমি তো চোখ বুজে কাউকে দেখতে পাই না, তাহলে কীভাবে বলব তিনি আছেন?

শিক্ষকেরা সেই বিচিত্র সব উত্তরে কোনো লাল কালি দিতেন না, শুধু পরম মমতায় টিক চিহ্ন দিয়ে বলতেন, তোমার ভাবনাটা সুন্দর।

জগতে এর চেয়ে বড় ধর্মের শিক্ষা আর কী-ই বা হতে পারত! কড়া নিয়মের খাঁচায় বন্দি না করে, মানুষকে যদি মানুষের মতো করেই ভাবতে দেওয়া হতো, তবে হয়তো ফেনী পরীক্ষণের সেই বৌদ্ধ বন্ধুটিকে আর জোর করে অন্য কোনো ধর্মের খাতায় নাম লেখাতে হতো না। সে নিজের মতো করেই খুঁজে নিতে পারত তার নির্বাণ।

৯৫ পঠিত ... ১১ ঘন্টা ৩৯ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top