পাকিস্তান সফর, একটি গান এবং অনেক প্রশ্ন

২৩৪ পঠিত ... ৭ ঘন্টা ২৩ মিনিট আগে

জগতে সবকিছুর একটা এক্সপায়ারি ডেট বা মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ থাকে। পাউরুটির থাকে, কাশির ওষুধের থাকে, এমনকি তীব্র প্রেমেরও নাকি একটা সময়ের পর ভোলবদল ঘটে। কিন্তু এই উপমহাদেশে একটা জিনিসের কোনো মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ নেই—তার নাম, ইতিহাসের ভূত। সে সুযোগ পেলেই আলমারি থেকে কঙ্কাল হয়ে বেরিয়ে এসে লিভিং রুমে নাচতে শুরু করে।

সম্প্রতি বাংলাদেশের সমাজমাধ্যমে একটা ভিডিও ভাসছে। ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক এবং লিরিক শুনলে যেকোনো সাধারণ বাঙালির কান দিয়ে একটু গরম ধোঁয়া বের হওয়া অস্বাভাবিক নয়। উর্দুতে গাওয়া সেই গানের সারমর্ম হলো—একাত্তরে ঢাকায় ওই মুক্তিবাহিনীর গুন্ডাদের সাইজ করতে কারা লড়েছিল? উত্তর দেওয়া হচ্ছে: আল-বদর। তারা নাকি দেশের ঐক্যের জন্য জান কুরবান করেছিল, আর জমিয়ত এই ধরণীকে হীরে-মুক্তো উপহার দিয়েছে।

এখন কথা হলো, ২০২৬ সালে বসে হুট করে এই হীরে-মুক্তোর মহিমা গাওয়ার দরকার পড়ল কেন? প্রেক্ষাপটটা বুঝতে গেলে আমাদের একটু আন্তর্জাতিক ট্যুরিজমের দিকে তাকাতে হবে।

কিছুদিন আগে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম সাহেব পাকিস্তান সফরে গিয়েছিলেন। পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র শাখা, অর্থাৎ ‘ইসলামী জমিয়তে তলাবা’ তাকে যে খাতির-যত্নটা করল, তাকে এককথায় বলে রাজকীয়। লাল গালিচা, ফুলের মালা, মওদূদী সাহেবের স্মৃতিসৌধে গিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন—সব মিলিয়ে এলাহী কাণ্ড। পাকিস্তানি জমিয়ত তাদের পেজ থেকে সাদ্দাম সাহেবের সফরের নানাবিধ গ্লিম্পস আর ভিডিও শেয়ার করল ভক্তিগদগদ চিত্তে। আর সেই খাতিরদারির আবহেই ব্যাকগ্রাউন্ডে বেজে উঠল ওই মুক্তিবাহিনী বনাম আল-বদর মার্কা কালজয়ী ক্লাসিক।

বাঙালি চিরকালই একটু উৎসবপ্রিয় আর আবেগপ্রবণ। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর যখন একটা বড় অংশের মানুষ ভাবল, ‘যাক, একটা নতুন জমানার সূচনা হলো, এবার একটু শান্তিতে নিশ্বাস নেওয়া যাক’—ঠিক তখনই এই ভিডিও এসে মনে করিয়ে দিল, জমানা বদলালেও কিছু পুরনো খাতা আসলে কখনোই বন্ধ হয় না।

শিবির বা জামায়াত নিজেদের যতই বাংলাদেশপন্থী বা মডার্ন পলিটিক্যাল পার্টি হিসেবে ব্র্যান্ডিং করার চেষ্টা করুক না কেন, যখনই তাদের শীর্ষ নেতৃত্ব পাকিস্তানে গিয়ে ওই একই আদর্শের ভাই-বেরাদরদের গলায় গলা মেলায়, তখন ভেতরের সেই আদি ও অকৃত্রিম ডিএনএ চট করে চকমকিয়ে ওঠে। মুশকিল হলো, আপনি ইলিশ মাছের তরকারি রাঁধবেন অথচ সরষে বা পোস্তর গন্ধ বেরোবে না, তা তো হয় না। পাকিস্তানের জমিয়ত যখন প্রকাশ্যে একাত্তরের মুক্তিবাহিনীকে গুন্ডা বলে গান নামায়, আর বাংলাদেশের শিবিরের সভাপতি সেখানে বসে মৃদু হাসেন বা নীরব থাকেন, তখন আমজনতার মনে প্রশ্ন জাগাটা কি খুব অন্যায্য?

অভ্যুত্থানের পর যে স্পেস তৈরি হয়েছে, তাতে অনেকেই ভাবছেন ইতিহাসকে একটু নিজেদের মতো করে রিবুট বা রিসেট করে নেওয়া যাবে। কিন্তু ইতিহাস বড় খলনায়ক। সে আয়নার মতো সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে বসে—বন্ধু, মুখে যতই ‘বাংলাদেশ’ বলো, ল্যাপটপের পাসওয়ার্ডটা এখনো ‘ইসলামাবাদ’ রাখা কেন?

নুরুল ইসলাম সাদ্দাম সাহেব যখন লাহোর আর ইসলামাবাদের রেড কার্পেটে হাঁটছিলেন, তখন তিনি হয়তো ভাবেননি যে সেই কার্পেটের তলা থেকে একাত্তরের কঙ্কালটা ওভাবে উঁকি দেবে। পাকিস্তানি জমিয়ত যখন ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ডে মুক্তিবাহিনীকে গুন্ডা বলে দাগিয়ে আল-বদরের গুণগান গায়, তখন আসলে তারা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বা বাঙালি আবেগকে স্রেফ বুড়ো আঙুল দেখায় না, তারা এক চমৎকার রাজনৈতি সার্কাস তৈরি করে।

সার্কাসটা কী? সার্কাসটা হলো নীরবতা। শিবিরের সভাপতি এই ভিডিও বা এই লিরিকের বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটি করতে পারবেন না। কেন পারবেন না? কারণ, ওই যে বললাম—শিকড়। আপনি যে গাছের ফল খাচ্ছেন, সেই গাছের গোড়ায় কুঠার মারবেন কী করে? মুখে যতই প্রগতিশীলতার চাদর জড়ানো হোক, ভেতরের বিশ্বাসের হার্ডডিস্কটা তো একই থেকে গেছে। সেখানে একাত্তর মানে কোনো গৌরবোজ্জ্বল স্বাধীনতা সংগ্রাম নয়, সেখানে একাত্তর মানে হলো ‘ভারতের চক্রান্তে মুসলিম উম্মাহর একটা অংশ ভেঙে যাওয়া’।

সবচেয়ে মজার চরিত্র হলো এই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতি। এই অভ্যুত্থানটা হয়েছিল স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে, একটা দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে মুক্তির আশায়। সাধারণ মানুষ ভেবেছিল, এবার হয়তো একটা সুস্থ, গণতান্ত্রিক পরিবেশ আসবে। কিন্তু রাজনীতিতে ভ্যাকুয়াম বা শূন্যস্থান বলে কিছু থাকে না। যেই খাঁচা খুলেছে, অমনি ভেতর থেকে এমন কিছু পাখি কিচিরমিচির করে বেরিয়ে এসেছে, যাদের ডানাগুলো আসলে উড়ে যেতে চায় পশ্চিমের ওই চেনা সীমান্তের দিকে।

এই পুরো ঘটনায় একটা জিনিস পরিষ্কার—গিরগিটি যতই রং বদলাক, তার চশমার পাওয়ারটা কিন্তু একই থাকে। জামায়াত-শিবির বাংলাদেশে বসে যতই নতুন বাংলাদেশ বা ইনক্লুসিভ পলিটিক্স-এর বুলি আওড়াক না কেন, পাকিস্তানের মাটিতে পা রাখামাত্রই তাদের ছদ্মবেশের তালিটা ফেটে যায়।

ইতিহাস বড় নিষ্ঠুর জিনিস মশাই। সাদ্দাম সাহেবের এই দু’দিনের পাকিস্তান সফর আর জমিয়তের ওই মিউজিক ভিডিও আসলে একটা লিটমাস টেস্ট। এই টেস্ট প্রমাণ করে দিল, গঙ্গার জল যতই পবিত্র হোক, তা দিয়ে বুড়িগঙ্গার জল ধুতে গেলে শেষ পর্যন্ত কাদার গন্ধটাই চড়া হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের মানুষ সব দেখছে, সব শুনছে। মুখে বাংলাদেশ আর অন্তরে পাকিস্তান—এই দুই নৌকায় পা দিয়ে কতদিন নদী পার হওয়া যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

২৩৪ পঠিত ... ৭ ঘন্টা ২৩ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top