নারী দিবস: জেলের দরজা পেরিয়ে যে সূর্য উঠেছিল

৬৩ পঠিত ... ১৪:১৩, মার্চ ০৮, ২০২৬

১.
১৮৭০ সালের লন্ডন। কুয়াশা এমন ঘন যে ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোও ঠিকমতো রাস্তা খুঁজে পায় না। ওই সময় জানালার ধারে দাঁড়ায়া থাকে এলিজাবেথ। বাইরে ঘোড়ার খুরের ঠকঠক শব্দ, টুপি পরা ভদ্রলোকেরা হাটতাছে, হাতে ছড়ি। তাদের হাঁটার ভঙ্গিতেই কেমন এক দখলদারি ভাব। এলিজাবেথ বুঝে, এই শহরটা তাদের। আর সে? বিয়া হওয়ার পর থেকে তার নিজের নামে কিছু নাই। সে এখন শুধু মিস্টার থমাস হার্ট-এর ওয়াইফ। তার নামটা যেন বিয়ের মন্ডপেই জমা দিয়া আসছে।

থমাস খুব খারাপ মানুষ না, কিন্তু তার চোখে এলিজাবেথ অনেকটা ড্রইংরুমের দামি পিয়ানোর মতো। দেখাইতে ভালো, কিন্তু নিজের ইচ্ছামতো বাজাইতে গেলে অনুমতি লাগে। একদিন এলিজাবেথ তার বাবার পুরান ডায়েরি বের কইরা দুই লাইন লিখতে বসছিল। থমাস দেখে কলমটা কাইড়া লইয়া আলতো এক থাপ্পড় দিল। জোরে না, কিন্তু অপমানটা বুকের ভেতর ধাক্কা মারল। শান্ত গলায় কইল, তোমার মাথা যখন আমার, চিন্তাও আমার। এইসব লেখালেখির শখ বাপের বাড়িতেই রাইখা আসার কথা আছিল।
ওই রাত্তিরে আয়নার সামনে দাঁড়ায়া এলিজাবেথ নিজেরে চিনতেই পারল না। মনে হইল, সে মানুষ না। সে একটা দীর্ঘশ্বাস।

২.
লাইব্রেরির কোণায় পুরান খবরের কাগজ ঘাটতে ঘাটতে একদিন সে পড়ল। কিছু মহিলা নাকি রাস্তায় নামছে। এমেলিন প্যাঙ্কহার্স্ট নামে এক নারী চিৎকার কইরা কইতাছে, “আমরা আসবাব না, আমরা মানুষ।” এলিজাবেথের বুক ধক করে উঠল। তার মনে হইল, এই কথাডা তার নিজের বুকের ভেতর বহুদিন ধইরা আটকা আছিল। বিকেলে সাহস কইরা থমাসের সামনে দাঁড়ায়া কইল, আমি বাইরে যামু। থমাস পাইপ নামাইয়া হেসে উঠল, কোথায়? বাজারে পচা মাছ কিনতে?
এলিজাবেথ চোখ নামায় নাই। কইল, না। ভোটের অধিকারের জন্য যে সভা, ওইখানে।
থমাসের মুখ শক্ত হইয়া গেল। সে কইল, তুমি সম্পত্তি। সম্পত্তির কাম ঘরের ভেতর থাকা।
কিন্তু ওইদিন এলিজাবেথের ভেতরে কী যেন বদলাইয়া গেছিল।

শীতের এক সকালে সে নীল কোট জড়াইয়া দরজা পার হইয়া রাস্তায় নামল। হাঁটু কাঁপতেছিল, কিন্তু পা থামায় নাই। ট্রাফালগার স্কয়ারের দিকে যাইতে যাইতে সে হাজারো কণ্ঠের গর্জন শুনল।

ভোট চাই!

ভিড়ের মধ্যে দাঁড়াইয়া সে প্রথমবার বুঝল, সে একা না। কারো হাতে লাঠির দাগ, কারো চোখে কালশিটে, তবু সবার চোখে আগুন। হঠাৎ অশ্বারোহী পুলিশ ঢুইকা পড়ল। ঘোড়ার খুর, চিৎকার, লাঠির বাড়ি—সব মিশা এক তান্ডব। একটা ভারী আঘাত এলিজাবেথের পিঠে পড়ল। সে মাটিতে পড়তে পড়তেও বুঝল, এই ব্যথা ভয় না। এইটা যেন ভিতরের জমা নীরবতার বিস্ফোরণ।

বিকেলে যখন তারে পুলিশের গাড়িতে তোলা হইতেছিল, জামা ছিঁড়া, চুল এলোমেলো, তবু তার চোখে কেমন শান্তি। জেলের স্যাঁতসেঁতে ঘরে বসা অবস্থায় ওয়ার্ডেন আইসা কইল, তোমার স্বামী আইছে, নিতে চায়। এলিজাবেথ ধীরে কইল, যে সম্পত্তি খুঁজতাছে, ওইটা আর নাই। আমি আর ফিরতেছি না। জেলের গেট পার হইয়া সে থমাসের দিকে তাকাইলই না। কুয়াশা কেটে রোদ উঠতেছিল। মনে হইল, এতদিন যে ঘরটারে সে বাড়ি ভাবছিল, ওইটা আসলে তার কবর আছিল।

৩.
অনেক বছর পর, ১৯২৮ সালের এক বসন্তে, চুলে পাক ধরা এলিজাবেথ ভোটকেন্দ্রের লাইনে দাঁড়ায়া। হাতে ব্যালট পেপার। পিঠে সেই পুরান লাঠির দাগ এখনো আছে। বুথের ভেতরে ঢুইকা কাগজটা বাক্সে ফালাইয়া সে বুঝল, এই ছোট্ট কাগজটা তার জেল, তার অপমান, তার বিদ্রোহ—সবকিছুর দাম। আজ সে কারো সম্পত্তি না। সে নিজের নামে বাঁচে। তার নাম এলিজাবেথ।

৬৩ পঠিত ... ১৪:১৩, মার্চ ০৮, ২০২৬

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top