কাদম্বিনীর কাঁদুনি

১২ পঠিত ... ৫ ঘন্টা ৫২ মিনিট আগে

 

 

কাদম্বিনী যেন কাঁদিতেই জন্মিয়াছে। সারাটা জীবনভর তাহার কান্না লাগিয়াই রহিয়াছে। ঠাকুরবাড়ির ছোট্ ঠাকুর মশাইয়ের আমলে না জন্মিলেও তিনি যদি তাহাকে দেখিতেন তবে আনন্দে পাগলপারা হইয়া তাহাকে লইয়া যাইতেন নিজের কাহিনীর হিরোইন বানাইতে। অত কাঁদিতে সেই আমলে শুধু তাঁহার গল্পের নায়িকারাই পারিতেন। 

যাইহোক, যখন কাদম্বিনী জন্মাইল তখন সে হাসপাতালের ছাদ ফাটিয়া যায় এমন চিৎকারে কাঁদিয়া উঠিল। তা তেমন তো সব ইছে-চিংড়িগুলোই কাঁদে। না কাঁদিলে জোর করিয়া কাঁদানো হয়। 

আর সে একটু তারস্বরে চেচাইয়া কাঁদিতেই তাহাকে কোলে লইয়া দাঁড়ানো সেবিকাটি যেন থতমত খাইয়া গেল। বিড়বিড় করিয়া বকিতে লাগিল, এইটুখানি ছুড়ি, তার গলার বাহার শোন! 

সে শুনিল না। কাঁদিতেই লাগিলো। বাধ্য হইয়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাহাকে পিতামাতার সহিত বাড়ি পাঠাইয়া দিল।

বাড়িতে আসিয়াও তাহার ক্রন্দন বন্ধ হইল না। সে ক্ষুধা পাইলে কাঁদে, ঘুম পাইলেও কাঁদে, ঘুম ভাঙ্গিয়াও কাঁদে, কাঁথা ভিজাইলেও কাঁদে, কোলে উঠিতে চাহিলেও কাঁদে।

সকলে তাহার কান্নায় অভ্যস্ত হইয়া গেল। 

তাহার মাতা চিররুগ্না, তাই তাহার যত্ন-আত্তি ঠিকমত হইত না। তাই তাহার কাঁদারও বিরাম ছিল না। পঞ্চম বর্ষ পর্যন্ত সে একনাগাড়ে কাঁদিয়াই চলিল। তাহার পিতা তাহাকে খাওয়াইতেন, ধোওয়াইতেন, তাহার সাথে খেলিতেন, তাহাকে হাসাইতেন, তাহাকে কোলে করিয়া আদর করিতেন তবুও সে কাঁদিত। 

অকষ্মাৎ একদিন তাহার মা মরিয়া গেলেন। কাদম্বিনী কিছুই বুঝিল না, কিন্তু কাঁদিয়া বিশ্বচরাচর ভাসাইয়া ফেলিল।  তাহার মা কে তাহারা লইয়া গেল, কিন্তু আর ফিরাইয়া দিল না। সে আবার কাঁদিল। বাবার কোলের মধ্যে বসিয়া, বাবার বুকের ওপর শুইয়া, বাবার কাপড় ভিজাইয়া সে কাঁদিয়াই চলিল। শরৎ বাবুর নায়িকাগুলোকেও হার মানাইবার পাঁয়তারা ভাজিতে লাগিলো বোধহয় মনে মনে। 

অতঃপর  তাহার পিতা আর তাহাকে দেখিয়া রাখিতে পারিলেন না। তিনি তখন তাঁহার এই সপ্তবর্ষীয়া প্রাণাধিক কন্যাটিকে বিবাহ দিবার প্রচেষ্টা পাইলেন। কাদম্বিনী আবারও তেমন কিছু না বুঝিয়াই কাঁদিয়া সময় পার করিতে লাগিল। 

কিছুকাল পরে এক শুভ মুহুর্তে তাহার বিবাহ হইয়া গেল। সে কাঁদিয়া পিতার বক্ষঃস্থল হইতে স্বামীগৃহে আসিয়া পৌছিল। কাদম্বিনীর ললাটরেখা ভালো ছিল, শ্বশুরবাড়ি তাহার বাপের বাড়িকে হার মানাইল। তাহাদের কন্যা নাই, সে সেই অভাব নিমেষে পুরণ করিল। 

তাহার স্বামী নীলাম্বর সেন বড় মানুষ নহে, সে কিশোর। কিন্তু একটি শিশু স্ত্রী পাইয়া সে যেন আরেকটি শিশু হইয়া পড়িল। কাদম্বিনীর শিশুমনের নাগাল পাইতে সে তাহার ইচ্ছামাফিক চলিতে লাগিলো। কিন্তু একই সাথে তাহাকে বিরক্ত করিয়া মারিতেও ওস্তাদ ছিল সে-ই। 

পড়িয়া মনে হইতে পারে এটি একটি পুরাকালের গল্প। তাহা কিন্তু নহে। আধুনিককালের কথাই বলিতেছি।  কাদম্বিনীর বিবাহ হইয়াছে দশমবর্ষ অতিক্রান্ত হইয়াছে। তাহার স্বামী এবং সে এখনও সারাদিনমান ব্যাপিয়া ঝগড়া-ঝগড়ি বাধাইয়া কোলাহলে দিনযাপন করিয়া থাকে। 

কাদম্বিনীকে তাহার স্বামী 'কদু' বলিয়া সম্ভাষণ করে। ইহাতে কাদম্বিনীর পিত্ত জ্বলিয়া যায়। সে নীলাম্বরকে বলে, তুমি আমাকে কদু কেন বল? আমি তোমাকে কি সুন্দর করে 'নীল' বলে ডাকি। 

নীলাম্বর হাসিয়া বলিল, আমার নামই তো নীল। তা তুই কি আমায় 'কালো' বলে ডাকতে চাস? আর তুই তো কদু-ই। তোকে 'আমড়া' কিভাবে ডাকি বল তো? 

কথায় কিঞ্চিৎ সত্যতা রহিয়াছে। কাদম্বিনীর নিজের গড়ন কিছুটা মোটার দিকে। তাহার স্বামী ইহাতেই দিনভর কটাক্ষ করিয়া থাকে। আর তাহাতেই তার মেজাজ আরও তিরিক্ষি হইয়া যায়। 

নীলাম্বরের কথা শুনিয়া সকলে হাসিয়া উঠিল। কিন্তু কাঁদিল কাদম্বিনী।  হাত পা ছড়াইয়া, চেঁচাইয়া সে কাঁদিয়া চলিল। তাহার শাশুড়ী মাতা তাহাকে থামানোর চেষ্টা করিয়া ছেলেকে ভর্ৎসনা করিয়া বলিলেন, তুই কীরে নীলু...দিনভর মেয়েটার পিছে লেগে থাকিস।  ওর চোখের 

জল আর শুকোতে পায় না। 

নীলাম্বর হাসিয়া কহিল, ও ছোটবেলা থেকেই অমন কাঁদে বলেই শ্বশুর মশাই ওর নাম রাখলেন 'কাদম্বিনী', তাই না মা? 

মা তেড়ে মারতে এলেন। কাদম্বিনী তাহার কান্নার মাঝেই ফোঁস করিয়া উঠিল,কহিল, জান কী? হাতি! কাদম্বিনী মানে হচ্ছে মেঘ! খুব সুন্দর মেঘ!

নীলাম্বর শুধুই হাসে, কিছু কয় না। এতো তাহাদের নিত্যদিনের খুনসুটি। ইহাতে তাহার বড়ই আনন্দ। যখন দেখে সে স্ত্রীর কান্না কমিয়া আসিতেছে তখন মা কে উদ্দেশ্য করিয়া বলে, মানুষের শরীরের ৭০ ভাগ পানি।  আর তোমার বউয়ের ৭০ ভাগ স্প্রাইট গো মা। তাইতেই সারাদিন বুদবুদ উঠতে থাকে আর উপচে উপচে পড়ে। 

আর যায় কোথা! আবার শুরু হইল কাদম্বিনীর সুমধুর পঞ্চম স্বর! সকলে ত্যক্ত হইয়া 'উফ! আর পারা যায় না, তোর বউ তুই সামলা' বলিয়া চলিয়া গেল। তখন নীলাম্বর নিজেই আসিয়া কাদম্বিনীকে তুলিয়া মুখ-চোখ ভালো করিয়া মুছাইয়া দিয়া কহিল, আজকের মত ক্ষান্তি দে! কোটা কি পুরণ হয়নি এখনো? 

কাদম্বিনী কহিল, তুমি শুধু আমায় নিয়ে বাজে বকো কেন? 

নীলাম্বর হাসিল না, কহিল,

কাল থেকে ঐ অনুদের বাড়ির ডোমা বিড়ালটাকে নিয়ে বাজে বকবো, কেমন? অসুবিধে নেই তো? এখন কান্না বন্ধ কর, খেতে দে, খেতে যা।

কাদম্বিনী চোখ মুছিয়া চলিয়া গেল। 

দিন দুই বাদে আবারও লাগিয়া গেল তাহাদের বিষমাকারে। কী হইয়াছে? কাদম্বিনীর কাছে তাহার এক সখী আসিয়াছে গল্প করিতে। বিবাহ হইয়া শ্বশুরবাড়ি চলিয়া যাওয়ায় আজকাল আর আসিতে পায় না। আজ অনেকদিন পর বাপের বাড়ি আসিয়াই সখীর খোঁজে আসিয়াছে। তাহাকে লইয়া কাদম্বিনী একটি খালি কামরার খোঁজে যাইতেছিল, পথিমধ্যে নীলাম্বরের সহিত তাহাদের সাক্ষাত হইয়া গেল। সে তখন দ্রুত হাঁটিয়া চলিয়া গেল। কিন্তু কাদম্বিনীর সখী চলিয়া যাইতেই তাহাকে লইয়া পড়িল। কহিল, ও কী ও সখীরে রে তোর কদু?

কাদম্বিনী অবাক হইয়া কহিল, কেন ও তো সরোজ। কেন কী হয়েছে?

নীলাম্বর কহিল, সে তো ঠিক আছে। কিন্তু সে পরেছেটা কি?

কাদম্বিনী কহিল, এম্মা! শাড়ি পরেছে, আর কি পরবে?

নীলাম্বর কহিল, সে তো ঠিক আছে। তা ঐ  গায়ের রঙে যদি ওরম ক্যাটক্যাটে  কমলা রঙের কাপড় পরে তবে দূর থেকে দেখলেই তো ভয়ে আত্মারাম খাঁচাছাড়া হবার জোগাড় হয়। আমার তো মনে হল যেন বিশাল এক কয়লার গাড়িতে আগুন লেগেছে। 

তাহার এই কথাটিও কিঞ্চিৎ সত্যি। সরোজের গায়ের রঙ চাপা। আর তাহার নিজের স্ত্রীর চকচকে গাত্রবর্ণটি লইয়া তাহার মনের মধ্যে কিছুটা অহংবোধ কাজ করিত। সেই হইতেই এই কথাগুলোর উৎপত্তি। 

কিন্তু কাদম্বিনী এতো কিছু বুঝিল না। তাহার সেই অবকাশ ও বা কোথায়? সে ডাক ছাড়িয়া কাঁদিয়া উঠিল।  তাহার সখীকে অপমান করিয়াছে। তাহাকে কি কেহ সুখী দেখিতে পারে না, ইত্যাদি ইত্যাদি। 

নীলাম্বর দীর্ঘশ্বাস ফেলিল। মনে মনে ভাবিল, এইত হইল শুরু!

কিছুক্ষণ কাঁদিয়া সে দেখিল তাহার স্বামী তাহাকে নিরীক্ষন করিতেছে। সে রাগিয়া চোখ পাকাইয়া বলিল, আমি আর থাকব না। চলে যাব।

: যা, দরজা তো খোলাই আছে। যাচ্ছিস না কেন?

: সত্যিই চলে যেতে বলছ?

: এর আবার মিথ্যে হয় নাকি? তবে...

: কী?

: ফেরার পথটা মনে রাখিস তো।

: কেন?

: নইলে তো আমাকেই আবার ফিরিয়ে আনতে যেতে হবে। অত কষ্ট পোষাবে না আমার!

ব্যস, আবার শুরু হইল অকালে অঝোর বরিষণ। 

সামনে পুজো। কিছুদিন ধরিয়া পুজোর জোগাড়-যন্তর চলিতেছে। সবার কেনাকাটা হইতেছে। আজ বাড়ির মেয়েদের কাপড় কিনতে কর্তামশাই যাইবেন সদরে। কাদম্বিনী তাহার স্বামীকে পাখিপড়া করিয়া কী কাপড় কিনিতে হইবে শিখাইয়া শ্বশুরমশাইয়ের সাথে পাঠাইল। কিন্তু দেখ যন্ত্রনা! 'ওটা' স্বামী হইবার সাথে সাথে তার একমাত্র  চক্ষুশূল ও যে! অকাজের কৌটো! 

দোকান হইতে কাদম্বিনীর শ্বশুরমশাই ফোন করিলেন তাহাকে। কী কাপড়ের কথা নীলু বলিতেছে তিনি বা দোকানি কেউই বুঝিতেছেন না। কাদম্বিনী লজ্জায়  কাঁদিয়া ফেলিল। কিছু বলিতে পারিল না। তাহার শাশুড়ীমাতা বলিলেন, 

তোমরা বাপু ফিরে এসো। ওর কাপড়খানি কিনতে নয় আরেকবার যাওয়া যাবে। আর হতচ্ছাড়াটাকে কানে ধরে নিয়ে এস। অকাজের ডিবে! 

কাদম্বিনী তাহার কথায় কান্না থামাইয়া তাহার শশ্রুমাতাকে জড়াইয়া ধরিল। তিনি তাহার ললাট-চুম্বন করিয়া কাজে গেলেন। 

যথাসময়ে নীলাম্বর ফিরিয়া আসিল। কাদম্বিনী তাহাকে ধরিয়া পড়িল। কিন্তু সেও কম যায় না। রাগ দেখাইয়া বলিল, 

যতসব হাবিজাবি কাপড়ের নাম আমায় বলে দিবি আর তা মনে না থাকলে আমার ওপর সবার হম্বিতম্বি শুরু হবে। দোকানি ব্যাটাও কি বাবাহ! যেই বললুম একখানা 'ন্যাকড়া-ফ্যাকড়া' দেখাও তো বাবা। ওমনি বলছে হুজুর কি মশকরা কচ্ছেন? যত্তসব হেদো ফাজিল! 

কাদম্বিনী হা করিয়া স্বামীর গল্প শুনিয়া রিমঝিম শব্দে হাসিয়া উঠিল, পোড়া কপাল আমার! তুমি কি বোকার হদ্দ গো! 

নীলাম্বর ক্ষেপিয়া গেল, আস্পর্ধা দেখো মেয়ের।গুরুজনকে বোকার হদ্দ বলছিস! বলেই তো দিলি তাই! 

কাদম্বিনী বলিল, আমি তোমায় বললুম কাপড়খানার নাম 'তানাবানা'। আর তুমি কি বলেছ নীল? 

এবার নীলাম্বরও হাসিয়া ফেলিল, যাব্বাবাহ! তাই তো বলি। তুই বলেছিস তানাবানা, আমি শুনলুম 'ত্যানাব্যানা'। কাপড়ের নাম এমন হয় বুঝি? কোত্থেকে পাস রে এসব নাম? যাইহোক, পরে গিয়ে মনে হল ন্যাকড়া-ফ্যাকড়ার কথাই বলেছিস। তাই বলে দিলুম। সে যাক। পরে একদিন যাস আমার সাথে। গিয়ে কিনে নিস। আর হাসি থামা। লোকে ভাববে পেটে 'লাফিং গ্যাস' জমেছে। 

কাদম্বিনী মুখে আঁচল গুজিয়া হাসিয়া ভাঙ্গিয়া পড়িতেছে। তাহার স্বামী মুগ্ধচক্ষে তাহাকে দেখিতে দেখিতে চিন্তা করিতে লাগিলো, এই জীব দেখি হাসিতেও জানে! 

সময় গড়াইল। একদিন এই ছিচকাঁদুনে কাদম্বিনী মা হইয়া পড়িল। তাহার আর নীলাম্বরের ঘর আলো করিয়া আসিল এক ক্ষুদ্রকায়া কন্যা ছানা। সকলেই খুশি হইল। 

কিন্তু ছানাটিও ধরাধামে পৌছিয়াই মাতার ন্যায় কান্না শুরু করিল। উহার পিতা-মাতার কলিজা শুকাইয়া গেল। ইহাও কি তাহার মাতার ন্যায় আজীবন কাঁদিয়া যাইবে? 

তৎক্ষনাৎ ছানাটির পিতা নীলাম্বর তাহাকে কোলে তুলিয়া লইয়া বলিল, তোর মায়ের ভ্যা ভ্যা অনেক সহ্য করেছি। বাড়িতে শুধু একজনেরই কাঁদার লাইসেন্স ছিল,সেটা তোর মায়ের। তা সে অনেক হয়েছে। তোর ভ্যা ভ্যা আর সহ্য করতে পারব না। তোর নাম দিলাম 'করমচা', মানুষকে কাঁদাবি কিন্তু নিজে কাঁদবি না।

তাহার কথায় কন্যার মাতা আর কন্যা একযোগে কাঁদিয়া উঠিল আর নীলাম্বরের মাথায় হাত! যাহারা ইহাদের দেখিতেছিল তাহারা একযোগে হাসিয়া উঠিল।

১২ পঠিত ... ৫ ঘন্টা ৫২ মিনিট আগে

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

গল্প

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top