কুম্ভকর্ণের ঘুম

৪২ পঠিত ... ৫ ঘন্টা ৫০ মিনিট আগে

লঙ্কাপুরী আর সচিবালয়ের দূরত্ব যে আসলে মাত্র এক ঘুমে পার হওয়া যায়, সেটা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় আজ সকালে টের পেলেন। তিনি যখন এসি রুমের নরম সোফায় বসে আরামসে নাক ডাকছিলেন, ঠিক তখনই ওনার স্বপ্নে এন্ট্রি নিলেন স্বয়ং কুম্ভকর্ণ। বিশাল দেহ আর রাক্ষুসে চেহারা নিয়ে কুম্ভকর্ণ ওনার সামনে এসে হাতজোড় করে দাঁড়াল, প্রণাম নিন, মন্ত্রীমশাই!

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এক চোখ সামান্য খুলে বিরক্ত হয়ে বললেন, কে আপনি? অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে? দেখছেন না আমি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর... মানে গভীর ঘুমে, ইয়ে , চিন্তায় মগ্ন?

কুম্ভকর্ণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আজ্ঞে, আমি লঙ্কার কুম্ভকর্ণ। ইতিহাসে আমার ঘুমের খুব নামডাক। ছয় মাস পরপর নাকি আমার ঘুম ভাঙত। কিন্তু আজ আপনার দরবারে এসেছি নিজের খেতাবটা সারেন্ডার করতে। যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে আমি আপনার কাছে নস্যি হয়ে গেছি।

মন্ত্রী মহোদয় এবার একটু সোজা হয়ে বসলেন। ওনার ঘুমন্ত মুখে চিলতে অহংকারের হাসি ফুটে উঠেও মিলিয়ে গেল। সামান্য চোখ সরু করে বললেন, কেন? আমার ঘুমের স্পেশালিটি কী?
কুম্ভকর্ণ ওনার দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে বলল, মন্ত্রী মশাই, আমি যখন ঘুমাতাম, তখন লঙ্কার সীমানায় কোনো বিপদ এলে রাক্ষসরা ঢাক-ঢোল পিটিয়ে, কাড়া-নাকাড়া বাজিয়ে, এমনকি গায়ের ওপর হাতি হাঁটিয়ে আমার ঘুম ভাঙাত। আর আমি জেগে উঠেই গদা হাতে সীমানা পাহারা দিতে যেতাম। কিন্তু আপনার ক্ষমতা তো অলৌকিক!
কীরকম?
মন্ত্রী জানতে চাইলেন।
এই যে সম্প্রতি দেশের আনাচে-কানাচে এতগুলো শিশু খুন হয়ে গেল, নিষ্পাপ বাচ্চাদের ওপর এত নৃশংস নির্যাতন আর ধর্ষণ হলো—পুরো দেশ জুড়ে কান্নার রোল উঠল। মানুষ রাস্তায় নেমে চিৎকার করল, মিডিয়াতে হাহাকার পড়ে গেল, চাবুকের মতো একেকটা হেডলাইন আপনার কানের পাশ দিয়ে চলে গেল... অথচ আপনার ঘুম ভাঙল না! ঢাক-ঢোল তো দূর, এত এত বাচ্চার রক্তের দাগ আর মা-বাবার আর্তনাদও আপনার ওনার্স গাইডেন্সের এসি রুমের ঘুম ভাঙাতে পারল না! আপনি এত ভারী ঘুমে ঘুমান কী করে প্রভু?
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটুও লজ্জিত না হয়ে মুচকি হাসলেন। পকেট থেকে একটি চিরকুট বের করে বললেন, হে রাক্ষসরাজ, একেই বলে 'প্রশাসনিক ঘুম'। তোমার ঘুমে কোনো স্ট্র্যাটেজি ছিল না। কিন্তু আমাদের ঘুমে পলিসি আছে। আমরা যখন ঘুমাই, তখন একটা বিশেষ ফিল্টার ব্যবহার করি। দেশের সব চিৎকার, কান্না আর হাহাকার সেই ফিল্টারে আটকে 'সব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে' নামক মিষ্টি লোবান হয়ে আমাদের কানে ঢোকে।
কুম্ভকর্ণ অবাক হয়ে বলল, কিন্তু শিশুরা যে শেষ হয়ে যাচ্ছে! ভবিষ্যৎ তো শেষ!
মন্ত্রী মশাই হাই তুলতে তুলতে বললেন, আরে ধুর! তুমি তো ত্রেতা যুগের ব্যাকডেটেড রাক্ষস। আধুনিক নিয়ম বোঝো না। শিশুরা খুন হলে আমরা তদন্ত কমিটি করি। ধর্ষণ হলে 'বিচ্ছিন্ন ঘটনা' বলি। আর মিডিয়া বেশি চিল্লাইলে বলি—আইন নিজের গতিতে চলবে। এই তিনটা ডায়ালগ দিয়ে আবার পাশবালিশটা টেনে নিই। ব্যস, আমাদের আর জাগতে হয় না।
কুম্ভকর্ণ সভয়ে দুই কদম পিছিয়ে গেল। পায়ের কাছে নিজের গদাটা নামিয়ে রেখে বলল,
ধন্য আপনি, ধন্য আপনার চামড়া! আমি তো শুধু রাক্ষস ছিলাম, মানুষের কান্না শুনলে হয়তো আমারও ঘুম ভেঙে যেত। কিন্তু আপনি তো মহামানব। আমি চললাম প্রভু। ইতিহাসে আজ থেকে আপনার ঘুমই হোক শ্রেষ্ঠ ঘুম।
এরপর কুম্ভকর্ণ মিলিয়ে গেল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়ের স্বপ্নটাও ভাঙল। চোখ রগড়াতে রগড়াতে একটা হাই তুললেন ঊনি। ওনার পিএস রুমে ঢুকল।

স্যার, বাইরে সাংবাদিকরা দাঁড়িয়ে আছে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ওই শিশু খুন আর ধর্ষণের ব্যাপারে আপনার বক্তব্য চাচ্ছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটা বড়সড় হাই তুলে, চশমাটা চোখে দিয়ে চেনা টোনে বললেন, ওদের গিয়ে বলো—পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। আইন নিজের গতিতে চলছে। আর হ্যাঁ, আমার রুমে যেন আগামী চার ঘণ্টা কোনো ডিস্টার্ব না করা হয়। আমি একটা অত্যন্ত জরুরি জাতীয় নীতি নির্ধারণে বসছি।

পিএস রুম থেকে বের হতেই মন্ত্রী মশাই সোফায় হেলান দিয়ে আবার চোখটা বুজলেন। লঙ্কার কুম্ভকর্ণ হেরে গিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল, আর দেশের মানুষেরা পরবর্তী 'বিচ্ছিন্ন ঘটনা'র অপেক্ষায় আবার প্রহর গুনতে লাগল।

৪২ পঠিত ... ৫ ঘন্টা ৫০ মিনিট আগে

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

গল্প

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top