দ্য লেট শো

পঠিত ... ১ ঘন্টা ৬ মিনিট আগে

 

স্টিফেন কোলবার্ট বিদায় নিলেন। আমেরিকান টিভি চ্যানেলের বহুল প্রচারিত দ্য লেট শো যেন নিমিষেই বলি হয়ে গেল ক্ষমতার কাছে।

দ্য লেট শো— তেত্রিশ বছরের পুরোনো এক অনুষ্ঠান, যেটা একাধিক প্রেসিডেন্ট দেখেছে, দুটো মহামারি পার করেছে। এমনকি এই সময়ে ডিভিডি প্লেয়ারের বিলুপ্তি ঘটেছে, মানুষ ফোনের রিলসে আসক্ত হয়েছে। সেই অনুষ্ঠানটির শেষ পর্ব সম্প্রচার হয়ে গেল।

CBS বলছে, এটা নিতান্তই ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত। আর্থিক হিসাবের ব্যাপার। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে সামাজিক মাধ্যমে সঞ্চালককে ছাঁটাই করতে বলেছিলেন, সেটার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্কই নেই। আর আমরাও CBS-কে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করি।

যারা জানেন না, তাদের বলি, আমেরিকায় লেট নাইট টেলিভিশন এক অদ্ভুত জায়গা। কল্পনা করুন, দামি স্যুট পরা এক ভদ্রলোক পঁয়তাল্লিশ মিনিট ধরে ক্ষমতাসীন সরকারকে নিয়ে রসিকতা করছেন, মজার ছলে দোষত্রুটি ধরছেন, ক্ষেত্রবিশেষে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতেও ছাড়ছেন না। সেই সঙ্গে শেষের দিকে একজন-দুজন হলিউড তারকার সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন, যারা হয়তো তাদের সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত কোনো সিনেমার প্রচার করতে এসেছেন, কিংবা কোনো পরিচিত গায়ক বা গায়িকার সঙ্গে তার এক্স লাভারের কাটানো সময় আসলে কতটা খারাপ গেছে, সেটা নিয়ে মজা করছেন। আমেরিকানরা এসব দেখে ঘুমাতে যান। এটাই তাদের ঘুমপাড়ানি গান। গরম দুধের বিকল্প।

তেত্রিশ বছর ধরে দ্য লেট শো ঠিক এই কাজটিই করে আসছে। ডেভিড লেটারম্যানের হাত ধরে শুরু হওয়া এই শোর প্রথম বাইশ বছর লেটারম্যানই ছিলেন ফ্রন্ট পারসন। ২০১৫ সালে স্টিফেন কোলবার্ট দায়িত্ব নেন। শুরুটা করেছিলেন উদ্যম নিয়ে, সত্যিকারের স্বপ্ন নিয়ে। সেই শুরু থেকে টেনে নিয়ে এসেছিলেন এই পর্যন্ত। শুরুর দিকে কোলবার্ট বলেছিলেন, তিনি শোটাকে একটা ভালোবাসার শোতে রূপ দিতে চান।

তার দায়িত্ব নেওয়ার পরের বছর আমেরিকা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করল।

এরপর থেকে অনুষ্ঠানটার চেহারাই যেন পাল্টে যেতে লাগল। শোতে প্রেম-ভালোবাসা কমতে থাকল, বাড়তে থাকল রাজনৈতিক আবর্জনা। সেলিব্রিটি সাক্ষাৎকার কমে গিয়ে বাড়তে থাকল কোলবার্টের হাহাকার, যেন তিনি চোখের সামনে গণতন্ত্রকে নিজেকেই খেতে দেখছেন। আর সেই সঙ্গে তিনি অনুষ্ঠানের চুক্তির দায়ে এসব বিষয়কে মজাদার করে উপস্থাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। এমি পুরস্কার নিতে গিয়ে কোলবার্ট নিজেই বলেছেন, শোটা আসলে ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে একটা লেট নাইট কমেডি শো হয়ে গেছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের যত অথর্ব ব্যক্তি আছে, যত আর্থিক কেলেঙ্কারি ও দায়িত্বে অবহেলার ঘটনা আছে, সবকিছু নিয়েই কোলবার্ট তীক্ষ্ণ সমালোচনার সুরে মজা করেছেন। মানুষ হাসাহাসি করলেও জায়গামতো বার্তাও পেয়েছে। অথচ CBS জনপ্রিয় এই শোটা বন্ধ করে দিয়েছে। কারণ টাকা। বিজ্ঞাপনের আয় নাকি তাদের কমে গেছে। এখনকার তরুণরা রিল দেখে। অনলাইন স্ট্রিমিং সার্ভিস এসে সব উলটে দিয়েছে।

এই কথাগুলো সত্য। গত দশ বছর ধরেও সত্য ছিল। কিন্তু গত দশ বছরে CBS বারবার অনুষ্ঠানটি নবায়ন করেছে। তাহলে হঠাৎ করে কী বদলে গেল?

কোলবার্ট প্রকাশ্যে ট্রাম্পকেন্দ্রিক এক আইনি সমঝোতা নিয়ে প্যারামাউন্টের (CBS-এর মূল কোম্পানি) সমালোচনা করেছিলেন। প্যারামাউন্ট এই মুহূর্তে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছ থেকে একটা বড় ব্যবসায়িক একীভূতকরণের অনুমোদন চাচ্ছে। আর ব্যবসায়ী ও হেজ ফান্ড বিশ্লেষক ট্রাম্প, যিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানের টিভি রেটিং খুব ভালোভাবে অনুসরণ করেন, অনেক বছর ধরেই প্রকাশ্যে কোলবার্টের প্রতি বিরক্তি জানিয়ে আসছিলেন।

CBS খরচ কমাতে পর্বসংখ্যা কমানোর চেষ্টা করেনি। ফরম্যাট বদলানোরও চেষ্টা করেনি। তারা যেটা করেছে, পুরো অনুষ্ঠানটাই বন্ধ করে দিয়েছে। যেটার সঙ্গে ট্রাম্পের কোনো সংযোগই নেই।

দ্য লেট শো-এর শেষ পর্ব প্রচারের ঠিক এক ঘণ্টা পর ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, কোলবার্ট অবশেষে CBS থেকে গেছে। আমি অবাক হচ্ছি, এত দিন টিকল কীভাবে! কোনো প্রতিভা নেই, কোনো রেটিং নেই, কোনো জীবন নেই। ও একটা মরা মানুষের মতো ছিল।

একই সঙ্গে এক্স ও ট্রুথ সোশ্যালে এআই দিয়ে তৈরি একটা ভিডিও শেয়ার করেছেন, যেখানে দেখা যাচ্ছে ট্রাম্প কোলবার্টকে তুলে একটা ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলছেন।

ইনিই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর মানুষ। পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত এক মহাশক্তির প্রধান। যিনি একজন কমেডি শো উপস্থাপকের সমালোচনাও সহ্য করতে পারেন না।

পঠিত ... ১ ঘন্টা ৬ মিনিট আগে

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top