ঈদ, গরু এবং একখানা দার্শনিক ভ্রমণ

পঠিত ... ১ ঘন্টা ১৫ মিনিট আগে

 

পৃথিবীতে কিছু কিছু জাতি আছে, যাহারা যুদ্ধ করিয়া বীরত্ব প্রমাণ করে। ইংরেজরা নৌযুদ্ধে, জাপানিরা শৃঙ্খলায়, পাঠানরা বন্দুকে। বাঙালি জাতি তুলনামূলক শান্তিপ্রিয়। তাহারা বছরে মাত্র দুইবার বীরত্ব প্রদর্শন করে। একবার ঈদের আগে বাড়ি ফিরিবার সময়, আরেকবার ঈদের পরে শহরে ফিরিবার সময়।

এই দুই সময় যে-পরিমাণ ধৈর্য, আত্মসংযম ও শারীরিক কসরত প্রদর্শিত হয়, তাহা অলিম্পিক কমিটি এখনও মূল্যায়ন করে নাই। ইহা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র বলিয়াই আমার ধারণা।

আমি নিজে এইবারে বাড়ি ফিরিতেছিলাম।

বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছিয়া প্রথমেই যে জিনিসটি চোখে পড়িল, তাহা হইল,  মানুষ। এত মানুষ! মনে হইল, বাংলাদেশের জনসংখ্যা সম্পর্কে সরকারি হিসাব সম্পূর্ণ ভুল। কারণ একই বাসে যত লোক উঠিতে চাহিতেছে, তাতে অন্তত তিনটা বাংলাদেশের ব্যবস্থা হাসিয়া-খেলিয়া হইয়া যাইবার কথা!

এক ভদ্রলোককে দেখিলাম— এক হাতে শিশু, আরেক হাতে মুরগি, কাঁধে ব্যাগ, বগলে বালিশ। মুখে এমন এক ক্লান্ত অভিব্যক্তি, যেন সংসার নামক প্রতিষ্ঠানটি তিনি একাই বহন করিতেছেন।

বাঙালি পুরুষ মানুষ যখন পরিবারসহ ঈদযাত্রা করে, তখন সে মানুষ থাকে না, একপ্রকার মালবাহী উট হইয়া যায়। পার্থক্য এই যে, উট মরুভূমিতে চলে, আর বাঙালি চলে জ্যামে।

যাহা হোক, অনেক যুদ্ধের পরে বাসে উঠিলাম। আমি নেপোলিয়ন হইলে এক্ষণে নিজেকে ওয়াটারলুর বিজয়ী বলিয়া স্বঘোষিত করিয়া ফেলিতাম।

আমার পাশের সিটে এক ভদ্রলোক বসিলেন। বসিয়াই আমার দিকে এমন স্নেহভরা দৃষ্টিতে চাহিলেন যে, আমি কিছুক্ষণ দ্বিধাগ্রস্ত হইয়া পড়িলাম। ইনি কি আমার হারানো আত্মীয়? নাকি কোথাও ধার করিয়া টাকা লইয়াছিলাম?

পরে বুঝিলাম, ইনি সেই শ্রেণির মানুষ, যাহারা কথা না বলিলে শারীরিক কষ্ট অনুভব করেন।

বাংলাদেশে দুই ধরনের যাত্রী আছে। একদল তিন ঘণ্টা পাশাপাশি বসিয়াও উঁহু পর্যন্ত করে না। আরেকদল আছে, যাহারা নাম জানিবার পূর্বেই কিডনির রিপোর্ট পর্যন্ত শুনাইয়া দেয়।

আমার দুর্ভাগ্যবশতই মনে হয়, ভদ্রলোক দ্বিতীয় দলের বলিয়াই প্রতীয়মান হইলেন। তিনি বলিলেন,

— কোথায় যাওয়া হইতেছে?

এই প্রশ্ন বাঙালি কখনোই তথ্য জানিবার উদ্দেশ্যে করে না। ইহা আলাপ শুরু করিবার একধরনের সামাজিক বাঁশি।

আমি বলিলাম,

— বাড়ি।

ভদ্রলোক মাথা নাড়িয়া গভীর স্বরে বলিলেন,

— আমরাও।

এই আমরাও শব্দের ভিতরে এমন এক ঐক্যের সুর ছিল, যেন আমরা উভয়ে সদ্য উপনিবেশবাদ হইতে স্বাধীনতা অর্জন করিয়াছি।

কিছুক্ষণ পর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসিল তাহার গরু। বাঙালি পুরুষ জীবনে নিজের সন্তানদের লইয়া যতটা গর্ব করে, কোরবানির গরু লইয়া করে তাহার সামান্য বেশি। ভদ্রলোক এমন গর্বভরে গরুর বিবরণ দিতে লাগিলেন, যেন নিজের ছেলের কেমব্রিজে ভর্তি হওয়ার সংবাদ শুনাইতেছেন।

তিনি বলিলেন,

— আমাদের গরু খুব সেন্সেটিভ।

আমি জীবনে সেন্সেটিভ কবি, সেন্সেটিভ শিল্পী, সেন্সেটিভ রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেক শুনিয়াছি। কিন্তু সেন্সেটিভ গরু এই প্রথম!

আমি ভদ্রতাবশত জিজ্ঞাসা করিলাম,

— কী রকম?

ভদ্রলোক বলিলেন,

— ওকে গরু বললে রাগ করে। আমরা দাদাভাই বলি।

আমি সঙ্গে সঙ্গে চুপ করিয়া গেলাম। পৃথিবীতে কিছু আলোচনা আছে, যাহাতে যুক্তি প্রয়োগ করা আত্মঘাতী।

তিনি আবার বলিলেন,

— দাদাভাই কিন্তু কোনো সাধারণ গরু নয়। বিদেশি জাত।

বিদেশি গরু! কথাটার মধ্যে এমন একটা অভিজাত ভাব ছিল, যেন গরুটি যেন অক্সফোর্ডে পড়াশোনা শেষ করিয়া দেশে ফিরিয়াছে।

আমি ভুলেও গরুর পাসপোর্ট দেখিতে চাহিলাম না।

ভদ্রলোক নিজ হইতেই বলিতে লাগিলেন,

— দাদাভাই কিন্তু খুবই ইমোশনাল।

ইমোশনাল কবি, প্রেমিকের পর এখন গরুও পাইয়া গেলাম! দেখিতে খুবই ইচ্ছা হইতেছে, মালিকের কথা স্মরণে রাখিয়া ইচ্ছা প্রকাশে ভয় পাইতেছি।

হঠাৎ ভদ্রলোক কন্সপিরেটোরিয়াল ভঙ্গিতে আমার দিকে ঝুঁকিয়া ফিসফিস করিয়া বলিলেন,

— ও কিন্তু মানুষ চেনে জানেন।

বাংলাদেশে যত প্রাণী আছে, সকলেই মানুষ চেনে। শুধু মানুষই মানুষ চেনে না। কিন্তু আমার এই দর্শন লইয়া আমি বড় উচ্চবাচ্য করিলাম না, আবার কোনোদিকে ফাঁসিয়া যাইতে হয় কে জানে। বোবা হইয়া থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ হইবে। বোবার শত্রু নাই।

বাস চলিতে লাগিল। মাঝেমধ্যে থামিতেও লাগিল। কেন থামে, তাহা কেউ জানে না। বাংলাদেশের রাস্তার জ্যাম অনেকটা দর্শনের মতো। সকলে ইহা লইয়া কথা বলে, কিন্তু কেহই শেষ দেখিতে পায় না।

রাত্রিবেলা বাড়ি পৌঁছাইলাম। উঠানে প্রবেশ করিয়াই দেখি, বিশাল আকৃতির এক গরু দাঁড়াইয়া আছে। তাহার মুখভঙ্গি এমন আত্মবিশ্বাসপূর্ণ, যেন বাড়ির জমিজমা তাহারই নামে লিখিয়া দেওয়া হইয়াছে।

আমার ছোট্ট মামাতো ভাই ফিসফিস করিয়া বলিল,

— ভাইয়া, সাবধানে। ও কিন্তু একটু রাগী।

গরুমাত্রই ক্ষেত্রবিশেষে রাগী। কিন্তু তাহাদের মালিকদের কথা শুনিলে মনে হয়, গরুটি অবসরে রবীন্দ্রসংগীত গাহে এবং শখের বশে দর্শনের বই পড়ে।

পরদিন সকালেই শুরু হইল মহাযজ্ঞ। বাড়ির কয়েকজন প্রাজ্ঞ আত্মীয় হঠাৎ করিয়াই সামরিক উপদেষ্টায় পরিণত হইলেন। একজন শুধু হাত পেছনে বাঁধিয়া হাঁটিতেছেন আর নির্দেশ দিতেছেন,

— দড়িটা ঠিকমতো ধরো। এইদিকে নয়, ওইদিকে ভার দাও। কিচ্ছুটি ঠিকমতো যদি করতে পারো!

এই ধরনের মানুষ পৃথিবীর সব জায়গায় সহজলভ্য। ইহারা নিজে কোনো কাজ করিবে না, কিন্তু তাহাদের কাজের উপদেশ ছাড়া সিভিলাইজেশন ধ্বংস হইয়া যাইবে— ইহা তাহাদের একাগ্রচিত্ত বিশ্বাস!

যাই হোক, নানামুনির নানামতের মাঝখানে পড়িয়া গরুটি হঠাৎ দৌড় লাগাইল। তাহার পর যা ঘটিল, তাহা সংক্ষেপে বলিলে— মানবসভ্যতার পতনের মহড়া।

পাঁচজন মানুষ দৌড়াইতেছে। ইহার মধ্যে একজনের লুঙ্গি খুলিয়া যাইবার উপক্রম। আরেকজন শুধুই ‘ধরো ধরো’ রবে চারিদিক বিদীর্ণ করিতেছে, যদিও কী ধরিতে হইবে, সে নিজেই নিশ্চিত নহে।

আরেক ভদ্রলোক দৌড়াতে গিয়া পুকুরে পড়িয়া গেলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, পানির ভিতর হইতেও তাহার পরামর্শের কামানগোলা ছুটিয়া যাইতেছিল।

আমি নিজেও দৌড়াইতেছিলাম। কেন, তাহা নিজের কাছেই বোধগম্য নয়। সম্ভবত বাঙালির ক্রাউড সাইকোলজির কারণে। আমাদের সামনে দশজন দৌড়াইলে আমরাও দৌড়াই। পরে জিজ্ঞাসা করি যে, আসলে কী হইয়াছে!

যাহাহৌক, শেষ পর্যন্ত গরুটিকে ধরা গেল। এবং ধরা পড়ার পর গরুটি এমন নিরীহ চেহারা করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল, যেন এই নাটকের সঙ্গে তাহার কোনো সম্পর্কই নাই। পৃথিবীর তাবৎ বড় বড় অপরাধীরাও আদালতে সম্ভবত এমনই নিষ্পাপ মুখভঙ্গিই করিয়া থাকিবে।

কোরবানি সম্পন্ন হইল। বাকি সকল কাজও একরূপে মিটিল।

বিকেলে শুরু হইল মাংস বণ্টন। বাঙালি সমাজে এই অংশটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। রাষ্ট্রভাগের মতো গুরুতর সংকটও সম্ভবত এত হিসাব করিয়া হয় না।

আমি হাটিয়া চলিলাম গোশত হাতে। সারা বিকাল-সন্ধ্যাব্যাপিয়া গোশত চালাচালি চলিল। আমি পারাবত মাত্র।

রাতে খাওয়া শেষে উঠানে বসিয়াছিলাম। দূরে কেউ হাঁড়ি ধুইতেছে, কোথাও বাচ্চারা চিৎকার পাড়িতেছে, আর রান্নাঘর হইতে মসলার গন্ধ খৈয়ামের রুবাইয়াতের ন্যায় কাব্যিক সুরে ভাসিয়া আসিতেছে।

হঠাৎ মনে হইল, বাঙালির ঈদ আসলে একখানা অর্গানাইজড কেওস! ঈদের আসল আনন্দই বোধহয় এই বিশৃঙ্খলাতেই। মানুষ বছরে একবার একত্রিত হয়, অতিরিক্ত খায়, অকারণে তর্ক করে, তারপর শহরে ফিরিয়া গিয়া পরের বছর আবার একই কাজ করিবার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করিয়া থাকে।

মানুষ বড় অদ্ভুত প্রাণী। যে কষ্ট একবার পাইয়া বাঁচিয়া ফেরে, পরের বছর সে আবার স্বেচ্ছায় সেই কষ্টের টিকিট কাটে।

পঠিত ... ১ ঘন্টা ১৫ মিনিট আগে

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

গল্প

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top