আরে তোমরা আর কী করতা

পঠিত ... ৫৭ মিনিট আগে

ঈদের সারাদিনের কাজ আর খাওয়াদাওয়া শেষ করে আয়েশ করে বসেছি। অন্য পাশে সোফায় মা বসে আছে। বিরক্ত মুখে টিভিটার দিকে তাকিয়ে আছে। এই টিভিতে কেন বিটিভি আসে না, এটাই তার একমাত্র দুঃখ!

দৌড়াতে দৌড়াতে এসে দুইজনের মাঝখানে বসল ভাগ্নে। তারপর সোজা প্রশ্ন ছুড়ে দিল, এই খালামনি, তোমরা কি ঈদে এত এত গরুর গোশত রান্না করে খাইতা?

আমি একটু হেসে দিলাম। গরুর গোশত রান্না ওর বিশেষ পছন্দ না। কিন্তু তবুও জোর করে বেলায় বেলায় খেতে হচ্ছে। বেশ বিরক্ত সে। বললাম, “আমরা তো আরও বেশি গরুর গোশত খাইতাম! তোমার নানুমনি তো ফ্রিজই কিনতে চাইত না! তখন সব গরুর গোশত তাড়াতাড়ি খেয়ে শেষ করে ফেলতে হতো!

ভাগ্নের তো চোখ কপালে! What? কী বলছো! তোমাদের বাসায় ফ্রিজ ছিল না?

মা এবার বলল, “আহা নানুভাই, তখন তো চাইলেই ফ্রিজ পাওয়া যাইত না। তোমার মামা-খালারা বড় হওয়ার পর আস্তে আস্তে ফ্রিজ আসল বাসায়!”

ভাগ্নের মনে হলো, ব্যাপারটা সে প্রসেস করতে পারছে না। ফ্রিজ ছাড়াও থাকা সম্ভব? একটু অবাক হয়েই বলল, How did you survive then?

মা বেশ একটু সুর টেনে বলল, আহারে নানুভাই, দিনগুলো তখন তাও ভালো ছিল!

ভাগ্নে এটা মানতে নারাজ! বলল, No নানুমনি! ফ্রিজ ছাড়া দিন কীভাবে ভালো থাকবে? Like আমরা এখন সারাবছর কুরবানির গোশত খাব আস্তে আস্তে! দুই দিনে সব শেষ করে ফেললে কেমনে কী!

মা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ভাগ্নে আবার আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তোমরা আর কী করতা?

আমি একটু নস্টালজিক হয়ে বললাম, আমরা তো ঈদের সময় বিটিভি খুলে অপেক্ষা করতাম! নতুন সিনেমা আসত, ঈদের অনেক অনেক প্রোগ্রাম হতো, তোমাদের মতো বাবুদের অনুষ্ঠান হতো!

ভাগ্নে বেশ কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করল, অপেক্ষা কেন করতা? স্ট্রিমিং করে যেকোনো সময় দেখা যাইত না?

আমি বললাম, না রে বাবু! সে সময় কখন কোন অনুষ্ঠান হবে, তা আগে বলে দেওয়া হতো। আমরা সবাই টিভির সামনে বসে সেটা দেখার জন্য অপেক্ষা করতাম।

উফফ! কী boring! I mean, তোমরা অ্যাড স্কিপ করতে পারতা না, আবার আগে-পিছে নিয়ে দেখতেও পারতা না, আবার চাইলেও বারবার দেখতে পারতা না! উফফ! ভাবলেই কেমন লাগছে! আমাদের দেখো, ইচ্ছা হলেই যখন তখন যেকোনো অনুষ্ঠান দেখতে পারি, অ্যাড স্কিপ করতে পারি! ভাগ্নে বেশ জোর গলায় বলল।

আমিও আরেকটু জোর গলায় বললাম, এতে কী আর মজা আছে? একবার দেখে মনে রাখব আজীবন, এটাই না মজা!

ভাগ্নে বলল, এহহহ! তা কয়টা মনে আছে তোমার অনুষ্ঠান বলো?

এই তো— ইত্যাদি, সুরের মূর্ছনা… আরে জানিস, আমাদের সময়ে ঈদে গানের ক্যাসেটও বের হতো! আহা, কীসব দিন! একেকটা ক্যাসেট কিনতে দোকানে লাইন দিতে হতো!

ভাগ্নে চোখমুখ কুচকে বলল, ক্যাসেট? What is that? Oh no! এটা সেই জিনিসটা না, যেটার ফিতা আটকে যাইত আর সবাই কলম দিয়ে ঘুরিয়ে ঠিক করত?

এই তো! চিনলি কীভাবে?  আমি প্রশ্ন করলাম।

আমি একটা ইউটিউব ভিডিওতে দেখেছি! উফফফ! কী ঝামেলার! আমাদের দেখো, anytime anywhere আমরা গান শুনতে পারি! আর ক্যাসেটে তোমাদের এক জায়গায় বসে শুনতে হতো! আবার ওগুলো প্যাঁচায় যাইত! Ewww…

আমি একটু হেসে মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম, তোদের তো খুব মজা, না রে বাবু?

পিচ্চি অত্যন্ত আগ্রহী গলায় বলল, অবশ্যই! এই যে দেখো, আমরা চাইলেই যখন তখন যাকে তাকে reach করতে পারি! একটা মেসেজ দিলেই মুহূর্তেই কথা! কল দিলেও! বাবা বলেছে আগে নাকি কী একটা লেজওয়ালা ফোন ছিল, ওটা দিয়ে কথা বলতে হতো! তাও কত ঝামেলা! এক ফোন দিয়ে সবাই কথা বলত! লাইনে দাঁড়িয়ে কথা বলত! Can you imagine!

ইমাজিন কী রে ব্যাটা? আমরা তো এগুলোই করেছি!

এহহহ… কী যে করতা! আবার ঈদের এই সময়ে গানের জন্য লাইন দিতা, সিনেমার জন্য টিভির সামনে বসে থাকতা! আমরা দেখো, যখন ইচ্ছা সুবিধামতো সব হাতে পাই! তোমরা আসলেই কী যে ঈদ করতা! সব তো লাইন দিতে দিতেই শেষ হয়ে যেত!

হাসতে হাসতে আদর করে বললাম, তাই বুঝি? তোমরা তাহলে আমাদের চেয়ে বেশি মজা করো?

পিচ্চি লাফিয়ে উঠে বলল, Of course! নানুমনিকেও জিজ্ঞেস করো!

আমি বললাম, না, তোমার কথাই বিশ্বাস করলাম বাবু!

আর মনে মনে ভাবলাম, আসলেই,  ঈদ ডিজিটাল যুগে হোক বা অ্যানালগ যুগে, আনন্দটাই মূলমন্ত্র। শৈশব রঙিন হলেই সেটাই আনন্দের; অনলাইনে হোক বা অফলাইনে।

পঠিত ... ৫৭ মিনিট আগে

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

গল্প

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top