শব্দের আদালত

৬৫ পঠিত ... ১২ ঘন্টা ৪৪ মিনিট আগে

দুপুরের কড়া রোদে ড্রয়িংরুমের ভেতরটা কেমন যেন হলদেটে হয়ে আছে। গতকাল একুশে ফেব্রুয়ারি ছিল, তাই চারদিকে শব্দের এক বিশাল মেলা বসেছিল। আজ সেই শব্দের ভাগাড়ে আদালত বসিয়েছেন মামা। সামনে রাখা এক কাপ কড়া লিকারের চা আর আধপোড়া বিড়ি। মামা আজ অদ্ভুতভাবে নির্লিপ্ত। আর আমি আজ হলুদ পাঞ্জাবির পকেটে হাত ঢুকিয়ে গম্ভীর হয়ে খালুর মতো যুক্তি সাজাচ্ছি।

মামা বিড়িতে একটা লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়লেন। জানালার বাইরে তাকিয়ে শূন্য গলায় বললেন, বুঝলি শোভন, শব্দ আসলে যাযাবর। এই যে মানুষ এখন কথায় কথায় ইনসাফ বলছে, আজাদি বলছে, এগুলো নিয়ে কেন তোরা এত মারামারি করছিস? ভাষা তো একটা বহমান নদী। গত ৪০ বছরে ৩ লাখ ইংরেজি শব্দ আমাদের জিভের ওপর দিয়ে হেঁটে চলে গেল, তখন তো তোর সাংস্কৃতিক চেতনায় কোনো ফোসকা পড়েনি। প্রবলেম, শিট বা ব্লিডিং বললে যদি বাঙালি থাকা যায়, তবে ইনসাফ বললে কেন জাতে টান লাগে? ব্যাকরণ বইয়ের সেকেন্ড পেপারটা একটু খুলে দেখিস, আমাদের ডিকশনারির অর্ধেকই তো পরের থেকে ধার করা।

আমি মামার কথার মাঝেই টেবিল চাপড়ে বলে উঠলাম, মামা, যুক্তিটা কিন্তু বড্ড কাঁচা হয়ে গেল। সমস্যা চেয়ার-টেবিল বা আলমারি নিয়ে নয়; ওগুলো ছিল বস্তুর নাম, যা আমাদের ছিল না বলে আমরা গ্রহণ করেছি। কিন্তু যখন স্বাধীনতা বা দেশ, যে শব্দগুলো আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে আছে, সেগুলোকে সরিয়ে সুপরিকল্পিতভাবে আজাদি বা ইনকিলাব নিয়ে আসা হয়, তখন সেটা আর কেবল শব্দ থাকে না। সেটা হয়ে যায় একটা পলিটিক্যাল স্টেটমেন্ট। ১৯৫২ সালে আমরা কি উর্দুর জন্য রক্ত দিয়েছিলাম? এই শব্দগুলোর পেছনের যে ইন্টেনশন, সেটা কি আপনি দেখতে পাচ্ছেন না? এটা সরাসরি আমাদের ঐতিহাসিক স্মৃতিতে ধাক্কা দেওয়া।

মামা মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে এক ধরনের রহস্যময়তা। তিনি বললেন, শোভন, তুই তো দেখছি আস্ত একখানা আদর্শের পিণ্ড হয়ে গেছিস। শোনো হে তাত্ত্বিক, বাঙালির গালি-তত্ত্বের দিকে তাকাও। আমরা যখন কাউকে ভালোবেসে শালা বলি, তখন কি তার ব্যাকরণ খুঁজি? কলকাতার বাল থেকে শুরু করে ব্রিটিশদের বাস্টার্ড, সবই তো আমাদের পরমাত্মীয়। গালিতে আমাদের কোনো ধর্ম নেই, কোনো রেসিজম নেই; কিন্তু আন্দোলনের বেলায় এসে কেন আমাদের শব্দের পাসপোর্ট চেক করতে হবে? যারা নতুন শব্দ ব্যবহার করছে, তারা হয়তো তাদের ফিলোসফিক্যাল বোধ থেকে করছে। এ দেশে বিহারিরাও আছে, তারাও নাগরিক। কাউকে জোর করে বাঙালি বানানোর তো দরকার নেই। বাঙালি আর বাংলাদেশি, দুই পরিচয় নিয়ে একসঙ্গে থাকাই তো ইনসাফ।

আমি সোজা হয়ে বসে বললাম, মামা, গালি আর স্লোগান এক নয়। গালি হলো ব্যক্তিগত ক্ষোভ। কিন্তু যখন কেউ ইনকিলাব বলে সেকুলার সিস্টেম উপড়ে ফেলার স্বপ্ন দেখে, তখন সেই ইনসাফ মানে দাঁড়ায়, অন্যের অধিকার খর্ব করা। ১৯৭০ সালেও মানুষ আজাদি বলত, কিন্তু সেই আজাদি ছিল স্বাধীনতার সমার্থক। আর আজকের এই আজাদির আড়ালে যখন বাঙালির আদি সাংস্কৃতিক চেতনায় ধাক্কা দেওয়া হয়, তখন চুপ থাকাটা অপরাধ। যারা শব্দগুলো নিয়ে লড়াই করছে, তারা অযথা ব্যাকরণ নিয়ে করছে না; লড়াইটা আসলে বোধের। মোর মুখে কি অন্য কথা শোভা পায়?

বিকেলবেলা হাঁটতে বেরোলাম। আজ ২২ তারিখ বলেই শহীদুল্লাহ হলের পাশের জটলাটা ছোট হয়ে এসেছে। মানুষ ঠিকই ভাষাটাকে খিচুড়ি বানিয়ে গিলে ফেলেছে। রাতে সায়েরা-কে একটা চিঠি লিখতে বসলাম।

 

সায়েরা,

আজ মামার সঙ্গে শব্দের এক অদ্ভুত যুদ্ধ হলো। আমরা আসলে সবাই হাইব্রিড বাঙালি। আমরা ইংরেজি গালি দিয়ে জিবের ব্যায়াম করি, আর ইনসাফ বা স্বাধীনতা নিয়ে শব্দের আদালত বসাই। ইনকিলাব জিন্দাবাদ বলে যারা গলা ফাটায়, তারা কি জানে এই জিন্দাবাদ শব্দটার সঙ্গে ৫২-র রক্তভেজা স্মৃতির কত বড় আড়ি?

 

তুমি বরং আজ নীল শাড়িটাই পরো। নীল রঙের কোনো ভাষা নেই, কোনো সীমান্ত নেই। তাকে কেউ উর্দু বা ইংরেজি বলে গালি দেবে না। অন্তত নীল রঙটা আমাদের মাঝে কোনো ভণ্ডামির ইনকিলাব ঘটাবে না।

 

ইতি,

শোভন

 

আমি রাস্তা দিয়ে হাঁটছি। কানে বাজছে সেই গানের সুর, ওরা কথায় কথায় শেকল পরায় আমার হাতে-পায়ে। ভাবলাম, শেকলটা কি কেবল লোহার হয়? নাকি শব্দেরও শেকল আছে?

 

৬৫ পঠিত ... ১২ ঘন্টা ৪৪ মিনিট আগে

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top