লেখকঃ সাবিহা সুলতানা
আজ বাজারে গিয়ে দেখি—আমি ক্রেতা নই, আমি দর্শক।
আর শশা-বেগুন-মরিচেরা সবাই মিলে যাত্রা করছে। কে তাকে আশা দেবে, কে তাকে ভরসা দেবে... টাইপ যাত্রা। আমি ধীরে ধীরে ভীরুপায়ে এগিয়ে গেলাম। চারিদিকে বাজারের সবকিছুর যে উত্তাপ, কখন যে ছ্যাকা লেগে যায় কে জানে!
প্রথমেই শশা। সে বলল,
আমি ভাই শশা। আগে মানুষ আমাকে খেত শরীর ঠান্ডা রাখতে। এখন আমাকে কিনলেই মাথা গরম হয়ে যায়—দাম শুনে!
আমি বললাম, তুমি তো খুব কুল!
সে তার নখে নরুণ ঘষতে ঘষতে বলল, হ্যাঁ, কুলই আমি। আগে সবাইকে, সবকিছুকে কুল করতে আমাকে ব্যবহার করেছ তোমরা যাচ্ছেতাইভাবে! এখন আমি আমার নিজের ওজন বুঝে গেছি। তাই তোমাদের ফাঁদে পড়ার আগেই তোমাদেরকেই ফাঁদে ফেলেছি। দেখ না বাবা, কেমন লাগে!
বুঝলাম, শশা এখন সালাদে নয়, স্যালারিতে ঢুকে গেছে।
এরপর বেগুন।
বেগুন খুব দার্শনিক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিল। সে তেরছা চোখে চেয়ে বলল, কি মিয়া? কিতা দ্যাখতাছেন? আইচ্ছা ঠিকাছে, দ্যাখতাছেন দ্যাহেন। কয়দিন পর দ্যাখতেও কইতাছি পয়সা লাগব।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোমার এত দাম কেন?
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
আমি মিয়া বহুত গুণের অধিকারী। তাই বেগুন—বহুগুণ।
আমি ভাবলাম, এ বেগুন নয়, এ তো বেগুণিত গণিত! রোজার দিনে বেগুনি খাবার চিন্তা ছেড়ে মানে মানে কেটে পড়াই ভালো।
এরপর গেলাম কাঁচা মরিচের কাছে। সে নাকি নিজের দাম ঘোষণা করেছে। শুনতে ভয় লাগছে, তবুও এগোলাম।
কাঁচা মরিচ এতটাই দামি হয়েছে যে এখন তাকে কাঁচা বলা যায় না—পুরো পাকা ব্যবসায়ী।
সে বলল,
আমার ঝাল আগে জিভে লাগত, এখন জীবনেও লাগে।
দোকানদার তাকে ওজন করছিল এমন ভঙ্গিতে,
যেন সে মরিচ নয়, মরিচিকা। আমি আর কী বলব!
পথে পেঁপে পড়ল। সে আমাকে দেখে তার প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর জোরদার করল। বলল, পেঁপে একসময় অসুখের বন্ধু ছিল। মানুষ তাকে যেমন খুশি ব্যবহার করেছে। ভর্তা-ভাজি-ডাল-রোগীর পথ্য—সবকিছুতে। অন্য সবকিছুর দাম বাড়ে আর আমি যেন গাঙের জলে ভেসে আসছি। তাই আমি এখন স্বৈরাচার। সুস্থ লোকের অসুখ।
সে বলল,
আমাকে খেলে হজম ভালো হয়।
কিন্তু আমার দাম হজম করতে গেলে আলাদা ওষুধ লাগে।
আমি বললাম, তুমি ফল না ফলাফল?
সে বলল, আমি ফল, কিন্তু এখন আমার ফলাফল ভয়ানক!
সামনে এগোতে মুরগির মর্মবাণী শুনলাম। মুরগি খুব আত্মসম্মান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রমাদান চলছে, তাই তার ডিমান্ডই অন্যরকম। আগে তাকে কেটে কেটে রান্না করা হতো। এখন তার পদের অভাব নাই, তাই ভাবেরও শেষ নাই. তাকে ছাড়া ফাস্টফুড অচল। এখন তাকে দেখে দেখে দীর্ঘশ্বাস কাটা হয়।
সে বলল,
আমি আগে ছিলাম প্রোটিন।
এখন আমি প্রোটোকল—বিশেষ দিনে ছাড়া ছোঁয়া যায় না।
সর্বশেষ শক; লেবু। কাল শুনলাম বাজারে নাকি ১৮ ক্যারটের লেবু আসছে। ভাবলাম লেবুর লেবুতত্ত্ব জেনে আসি।
লেবু ছোট, কিন্তু ভাব বিশাল। কারণ সে তো টকের সিইও। তাকে ছাড়া রমাদান অচল। শরবতে লেবু, মুড়ি মাখায় লেবু আর তার খোসা, বিরিয়ানিতে তো অবশ্যই, হালিমেও মাস্ট। বাকি আর নাই বা বললাম। তাকে তার দাম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করায় সে বলল, আমি টক নই, আমি টকশো। আমাকে নিয়ে এখন সংসারে আলোচনা হয়, সংসদেও আলোচনা হয়। এখনো ভালো আছ, তাই টের পাচ্ছ না। কিছুদিন পর দেখবে, একটা লেবু চার টুকরো নয়—চার প্রজন্মে ভাগ হচ্ছে।
আমি আতঙ্কে বিমর্ষ হয়ে মুমূর্ষ অবস্থায় ঘরে ফিরে চাদরে নিজেকে ঢেকে ফেললাম। গিন্নি এসে শুধোলেন, কি গো! কী বুঝলে? আমি মনে মনে বললাম,
বাজারে গিয়ে বুঝলাম—
আমি জিনিস কিনতে যাই না,
জিনিস আমাকে কিনে নেয়।
আগে পকেট থেকে টাকা বের হতো।
এখন টাকা বের হওয়ার আগে পকেটই কাঁদে।
সবজিরা হাসছে।
ক্রেতারা হিসাব করছে।
আর বাজার—
সে নির্লজ্জের মতো প্রতিদিন নতুন কৌতুক লিখে চলেছে। আর আমি মধ্যবিত্তের মাসিক দুশ্চিন্তার আত্মজীবনী লিখছি!


