মধ্যরাত। চারদিকে সুনসান নীরবতা। কিন্তু রাজধানীর একটি ফ্ল্যাটবাড়ির ড্রয়িংরুম থেকে ভেসে আসছে অস্পষ্ট সুর, কখনও ভেসে আসছে হানি নাটসের বিজ্ঞাপন, কখনওবা সবজির তুই তোকারি, কখনো বা কোনো তুর্কি সিরিয়ালের বিজিএম। উঁকি দিয়ে দেখা গেল, সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছেন রিটায়ার্ড কর্মকর্তা জনাব কুদ্দুস সাহেব এবং তার স্ত্রী ফরিদা বেগম। দুজনের হাতেই স্মার্টফোন, মুখে নীলচে আলোর প্রতিফলন। তারা গভীর মনোযোগে রিলস স্ক্রল করছেন।
তাদের এই রিলস আসক্তি দেখে পাশের রুম থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন বড় ছেলে আরমান। তার চোখে ঘুম নেই, কিন্তু সেটা পড়াশোনার চাপে নয়—বরং বাবা-মায়ের রিলস আসক্তির কারণে।
শুধু আরমান নয়, দেশের অনেক সন্তানের এখন মাথায় হাত! দুশ্চিন্তায় তাদের ঘুম আসে না। রোজার মাসে সাধারণত বাবা-মায়েরা দুশ্চিন্তা করেন সন্তানরা ঠিকমতো সেহরি খেতে উঠছে কি না, কিংবা রাত জেগে ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখে সময় নষ্ট করছে কি না। কিন্তু এবারের চিত্রটা যেন উল্টো। সময়ের বিবর্তনে ডিজিটাল সেহরির কবলে পড়ে এখন দুশ্চিন্তায় কাঁপছে সন্তানেরা।
আরমান আক্ষেপ করে বলেন, আগে আম্মা রাত দশটা বাজলে চিল্লাচিল্লি শুরু করতেন, ফোন রাখ, চোখ নষ্ট হয়ে যাবে!’ আর এখন? রাত দুইটা বাজে, রান্নাঘরে হাড়ি চড়ানোর খবর নেই, আম্মা এখনো দেখছেন মিনি কিচেনে কীভাবে মাটির চুলায় বিরিয়ানি রান্না করা হয়। আর আব্বা? আব্বা তো মোটিভেশনাল স্পিকারদের ভিডিও দেখতে দেখতে নিজেই এখন সেহরি পর্যন্ত জেগে থাকার মোটিভেশন পেয়ে গেছেন।
সন্তানদের অভিযোগ, বাবা-মায়েরা এখন রিলসের নেশায় এতোই বুঁদ যে, সেহরিতে ডাল আর ভাতের জায়গায় ভুলে লাইক আর শেয়ার পরিবেশন করার উপক্রম হয়েছে। ছোট মেয়ে তুলি জানায়, কাল রাতে আব্বাকে বললাম সেহরির সময় হয়েছে, আব্বা ফোন থেকে মুখ না তুলেই বললেন, দাঁড়া, এই রিলসটা শেষ করি, খুব শিক্ষণীয়!’ অথচ ভিডিওতে দেখলাম একজন ভিনদেশি লোক শুধু একটা তরমুজ কাটছে।
শুধু আরমানদের বাড়ি নয়, পুরো এলাকাতেই এখন একই অবস্থা। পাড়ার মোড়ে দেখা গেল একদল তরুণ চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের দাবি, আগে তারা লুকিয়ে রাত জেগে গেম খেলত, এখন তাদের বাবা-মায়েরা জেগে থাকায় সেই সুযোগও নেই। এক কিশোর আক্ষেপ করে বলে, আব্বা রিলস দেখে দেখে এখন এতো স্মার্ট হয়ে গেছেন যে, আমার হিস্ট্রি চেক করতেও তার সময় লাগে না।
এই সমস্যা থেকে সমাধান প্যারেন্টিং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা এক নতুন ধরনের প্যারেন্টিং ক্রাইসিস। এখন সন্তানদের দায়িত্ব হলো বাবা-মায়ের ফোনে প্যারেন্টাল লক লাগানো। রাত ১২টার পর রাউটার লুকিয়ে রাখা। কিংবা রাতে সবাবা-মাকে শুধুমাত্র আধাঘন্টার জন্য ফোন ব্যবহারের নিয়ম চালু করা।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত জনাব কুদ্দুস সাহেবের রিলস দেখা থামানোর জন্য তার সন্তানেরা ঘরে ফেসবুক সার্ভার ডাউন হওয়ার গুজব ছড়ানোর পরিকল্পনা করছে। যদিও ফরিদা বেগম সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, রিলস না দেখলে আমার সেহরিতে রুচি আসে না!


