সালটা ১৯৭৬। সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশ। তখনও অনেকেরই পরিবার যুদ্ধের ভার বহন করছে। হাজার হাজার পরিবার তাদের আপনজন হারিয়েছে। এর মাঝেও সবাই নিজেদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাচ্ছে। স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে নিজেদেরকে চিনতে শুরু করেছেন। সে সময়ের এক শহীদ পরিবারের এক মেয়ের গল্প এটি।
নজীবুর রহমান, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে শহীদ হন। তিনি রাজশাহী কো-অপারেটিভ অফিসের সহকারী রেজিস্ট্রার ছিলেন। রেখে গিয়েছিলেন বিধবা স্ত্রী আর পাঁচজন ছেলেমেয়ে। তাদের মাঝে নীহার বানু ছিলেন দ্বিতীয়। নজীবুর রহমানের মৃত্যুর পর নীহার বানুর বড় বোন মঞ্জিলা বেগম সংসারের হাল ধরেছিলেন। মঞ্জিলা বেগম পেশায় ছিলেন ডাক্তার।
নীহার বানু ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী। ২৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৬। বাসা থেকে বের হয়ে ভার্সিটির বাসে চড়ে ক্লাস করতে যান। এরপর আর ফিরে আসেননি। সন্ধ্যা নামার পরও মেয়ে বাসায় ফেরেননি, বিধবা মায়ের মনে কু ডাক দেয়। তিনি আর স্থির থাকতে পারেন না। ঘরের সদর দরজা খুলে গভীর শঙ্কা আর উদ্বেগ নিয়ে বড় রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকেন। একটু পরেই মেডিকেল কলেজ থেকে ডিউটি শেষে বাড়ি ফেরেন বড় মেয়ে। মেয়েকে কিছু জিজ্ঞাসা করার সুযোগ না দিয়েই উৎকণ্ঠিত মা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, নীহার তো ভার্সিটি থেকে এখনও ফেরেনি। সারা দিনের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে ছোটোভাইকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন বড় বোন ছোটোবোনের খোঁজে। খোঁজ চলে সবখানে, সহপাঠীদের বাসায়, শিক্ষকদের বাসায় এমন কি থানা ও হাসপাতালেও। কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না নীহার বানুর। যেন একদম হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।
সদ্য পরিবারের অবিভাবক হারা এই পরিবারের সবার মনে শঙ্কা, আবার কী হতে যাচ্ছে? আশা নিরাশার দোলাচলে পরিবারের সদস্যরা বিশ্ববিদ্যালয়, ক্লাসে, মেয়েদের হলে, বিভাগের চেয়ারম্যান ও শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বললেন। যা জানা গেল তা হলো, সেদিন সকালে নীহার বাসে বিশ্ববিদ্যালয় গিয়েছেন কিন্তু বিকালে বাসে ফেরেননি। সহপাঠীরা বললেন, নীহার ক্লাসে ছিলেন, হাজিরা খাতা দেখে শিক্ষকরা তার ক্লাসে উপস্থিত নিশ্চিত করলেন। কেউ কেউ বললেন, ক্লাস শেষে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ বিল্ডিংয়ের পাশে এক সহপাঠী ছাত্রের সঙ্গে তাকে কথা বলতে দেখা গেছে। কেউ কেউ বললেন, দুপুরের দিকে তাকে রিকশায় শহরের দিকে যেতে দেখা গেছে; এই ছিল তার সম্পর্কে সর্বশেষ খবর।
নীহারের সাথে কী হয়েছিল এটা জানার আগে তার জীবনের একটা ঘটনা বলে নিই। সেসময় নীহার বানুর অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা। তার কিছুদিন আগেই হাম হওয়ায় পরীক্ষার প্রস্তুতি খুব বাজে। একবার ভাবলেন পরীক্ষাই দেবেন না। তারপর হয়তো ভাবলেন পরীক্ষা না দেওয়া ঠিক হবে না, একবার চেষ্টাই করা যাক। তিনি গেলেন আহমেদ হোসেন বাবু নামের একজনের কাছে নোট আর সাজেশনের জন্য। বাবু একই বিভাগে ফুটবল, সাঁতার ও ওয়াটার পোলো খেলোয়াড় হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। খেলাতে ভালো হওয়ায় বিভাগের সুনাম বাড়াতে মাঠে খেলার জন্য তাকে অনুরোধ করতে শিক্ষকেরা তার হল রুম পর্যন্ত গিয়েছিলেন। শিক্ষকের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকায় কথিত সাজেশন পাওয়ার জন্য বিভাগের অন্য শিক্ষার্থীরা আবার বাবুকে সমীহ করে চলতেন।
দৈনিক বাংলা, ১৪ জুন, ১৯৭৬-এ প্রকাশিত নীহার বানু হত্যাকাণ্ডের খবর
নীহার নোট ও সাজেশন চাইতে গেলে বাবু তাকে হেল্প করেন। ওই পরীক্ষায় নীহার বানু দ্বিতীয় শ্রেণী পেয়ে পাশ করেন। খুব স্বাভাবিকভাবেই বাবুর সাথে নীহার বানু এবং তার ফ্যামিলির খুব ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তবে আস্তে আস্তে বাবু নীহারের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে। বিয়ের প্রস্তাব দেন নীহারকে। নীহার তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন তিনি বাবুকে আসলে ভাইয়ের চেয়ে বেশি কিছু ভাবেন না। বাবু বলেছিলেন, তিনিও আসলে বোনই মনে করেন, কিন্তু নীহারকে পরীক্ষা করার জন্য এমনটা বলেছেন। এমন আরও কয়েকবার হয়েছে। বাবু বিয়ের প্রস্তাব দিতেন, নীহার প্রত্যাখ্যান করতেন। প্রত্যাখ্যাত হয়ে বাবু বলতেন, তিনি এমনি এমনি কথাটা বলেছেন। তিনিও আসলে নীহারকে বোনই মনে করেন। তবে এরপরও ক্যাম্পাসে বাবুর সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক রেখেছিলেন নীহার। বাবু বেশ প্রভাবশালী হওয়ায় নীহারের পরিবার তাকে রাগাতে চায়নি।
আসুন ফিরে যাই নীহারের কী হয়েছিল সেখানে। বার বার নীহারের থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে বাবু ১৯৭৬ সালের ২৩ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব আব্দুল লতিফ হলের কক্ষে একটি বৈঠক করে। সেখানে বাবু ছাড়াও ছিল এনামুল যে মনোবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিল সে সময়। ওই বৈঠকে বাবুর সহপাঠী আহসানুল এবং বিভাগের ছোট ভাই শহীদুলও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, ২৫ জানুয়ারি নীহারকে দাওয়াত খেতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে মিনা মঞ্জিলে নিয়ে যেতে হবে। সেখানে বাবুর সঙ্গে তাঁর বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হবে। স্বেচ্ছায় রাজি না হলে জোর করে বিয়ে পড়ানো হবে।
নীহার বানু কেসের রাজসাক্ষী ছিলেন এনামুল, তার ভাষ্য আরেকটু পড়ুন, বাবু প্রায়ই নীহার বানু সম্পর্কে তাদের সঙ্গে গল্প করতেন। কিন্তু নীহারকে যে তিনি বিয়ে করতে চান, তা তিনি বলতে পারতেন না। নওগাঁর এক প্রকৌশলীর সঙ্গে নীহারের বিয়ে ঠিক হওয়ার পর বাবু এনামুলকে তার ইচ্ছার কথা জানান। তাদের সহযোগিতা চান।
বাবু বলেছিলেন, নীহারের অন্য কোথাও বিয়ে হয়ে গেলে তা তিনি সহ্য করতে পারবেন না। তার জীবন বৃথা হয়ে যাবে। ২৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় নিউমার্কেটে বাবু নীহারকে বানিয়ে বানিয়ে বলেছিলেন, ২৫ জানুয়ারি তার এক আত্মীয়ের বাড়িতে দাওয়াত আছে। নীহারকে সেখানে যেতে হবে। নীহার বলেছিলেন, ‘দেখা যাবে।’ তবে ২৫ জানুয়ারি নীহার সারদায় বিভাগের পিকনিকে চলে যান। তা শুনে রেগে যান বাবু।
২৬ জানুয়ারি লতিফ হলে বাবুর কক্ষে আবারও বৈঠক হয়। সিদ্ধান্ত হয়, যেকোনোভাবে হোক নীহারকে মিনা মঞ্জিলে নিয়ে যেতে হবে। সেখানে তাকে জোর করেও যদি বিয়েতে রাজি না করানো যায়, তাহলে তাকে মেরে ফেলা হবে। কেন মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা আদালতের পক্ষ থেকে এনামুলের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল। এনামুলের ভাষ্য, বাবু বলতেন, নীহারকে বিয়ে করতে না পারলে তিনি বাঁচবেন না। নীহার অন্য কাউকে বিয়ে করবে, তা তিনি সহ্য করতে পারবেন না।
না, আপনি এখনও ভাবতে পারছেন না নীহার বানুর সাথে আসলে কী হয়েছিল। আসুন আপনাকে ১৯৭৬ সালের ২৭ জানুয়ারির রাজশাহীর মিনা মঞ্জিল নামের একটি ফাঁকা বাসায় নিয়ে যাই। ১৯৭৬ সালের ২৭ জানুয়ারি দুপুরে বাবু ও নীহার দুটি আলাদা রিকশায় করে মিনা মঞ্জিলে পৌঁছান। সেখানে আগে থেকে অপেক্ষা করছিলেন এনামুল, আহসান ও শহীদুল ইসলাম নীলু। নীহার আর বাবু ঢোকার পরপরই মিনা মঞ্জিলের প্রধান ফটক বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঘরের দরজা-জানালাও বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর বাবু নীহারকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। নীহার তখন রেগে গিয়ে বলেন, ‘আপনি এসব কী বাজে কথা ও আবোল তাবোল বলছেন? আপনার সঙ্গে আমার ভাই-বোনের সম্পর্ক। আপনি আবার যদি ও কথা বলেন, আমি চিৎকার করব।’
নীহার এ কথা বলার পর তার পরনের শাড়ির আঁচল দিয়ে বাবু তাঁর গলা পেঁচিয়ে ধরেন এবং বলতে থাকেন, ‘এখনও রাজি হও। না হলে এখান থেকে আর ফিরে যেতে দেব না।’ অসম্মতি জানালে বাবু আরও জোরে জোরে নীহারের গলায় শাড়ি প্যাঁচাতে থাকেন। একপর্যায়ে বাবুর হাত কামড়ে দেন নীহার।
এরপর এনামুল, আহসান ও শহীদুল মিলে নীহারের হাত চেপে ধরে রাখেন, যেন তিনি নড়াচড়া না করতে পারেন। বাবু তখন আরও জোরে জোরে শাড়ি প্যাঁচাতে থাকেন। শ্বাসরোধ হয়ে নীহার মেঝেতে ঢলে পড়েন। এনামুলের বর্ণনা অনুযায়ী, ওই সময় নীহারের পরনে ছিল খয়েরি রঙের চেক শাড়ি, বাটার হাই হিল স্যান্ডেল, নীল কোট, হলুদ ব্লাউজ এবং কালো পেটিকোট। বাঁ হাতে ছিল ঘড়ি। চুল ছিল লম্বা বেণি করা। গলায় ছিল চারকোনা রুপার তাবিজ। দুই কানে ছিল ছোট দুল।
তারপর? তারপর এলো লাশ গুম করার পালা। প্রথমে নীহারের লাশটি বড় ট্রাংকে ভরে বাইরে নিয়ে যাওয়ার চিন্তা করে তারা। ১০০ টাকা খরচ করে সাহেববাজার থেকে ৩০ ইঞ্চি আকারের কালো রঙের একটি ট্রাংকও কেনা হয়। তবে লাশ শক্ত হয়ে যাওয়ায় ট্রাংকে নীহারের লাশ ঢোকানো গেল না।
এরপর মিনা মঞ্জিলের দক্ষিণ দেয়ালের সঙ্গে বাথরুমের সামনে খালি উঠানে লাশ পুঁতে ফেলার সিদ্ধান্ত হয়। তার হাত থেকে ঘড়ি এবং কান থেকে দুল খুলে নেওয়া হয়। কলম আর পার্সও রেখে দেওয়া হয়। এরপর নীহারের পরনের পোশাকসহ তাকে গর্তে শুইয়ে দিয়ে মাটিচাপা দেওয়া হয়। ওপরে আবর্জনা দিয়ে জায়গাটি ঢেকে দেওয়া হয়। পরে তা সিমেন্ট দিয়ে প্লাস্টার করা হয়। (রাজসাক্ষী এনামুলের ভাষ্য)
এরপর হলে ফিরে আসে যে যার মতো। বাবুর রুমমেট এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মো. রশীদুজ্জামান তার জবানবন্দিতে বলেন, ১৯৭৬ সালের ২৭ জানুয়ারি বাবু রুমে আসার পর তাকে ভীত এবং বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। পরে বন্ধু আহসান ও এনামুল রুমে আসার পর তাদের সঙ্গে বের হয়ে যান। সেদিন তিনি আর রুমে ফেরেননি। ২৮ তারিখ দিনের বেলায়ও তিনি রুমে ফেরেননি।
রাত ১০টার দিকে এসে কাপড়চোপড় গোছাতে থাকেন। রশীদুজ্জামান তখন বাবুকে জানান, নীহারকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। নীহারের দুই স্বজন তাকে খুঁজতে এসেছিলেন। এ কথা বলার পর বাবু বলেন, ‘আমি ঢাকায় চাকরি পেয়েছি। ঢাকায় চলে যাচ্ছি।’ রাতেই তিনি বেরিয়ে পড়েন।
দমবন্ধ হয়ে আসছে? আসুন এরপর জানি কীভাবে ধরা পড়ল সব। বাবু পালিয়ে যাওয়ার পর যখন নীহারের ফ্যামিলি তাকে খুঁজে বেরাচ্ছে, সে সময় বাবুর সহপাঠি মিন্টুর সাথে দেখা হলে তার আচার ব্যবহার সন্দেহজনক মনে হয় নীহারের পরিবারের। পুলিশকে বলা হলে, তাকে পাকড়াও করে পুলিশ।
এদিকে সেতু নামে আরেকজন অভিযুক্তও ছিল এ ঘটনার সাথে জড়িত। নীহার বানুর সাথে ধস্তাধস্তির সময় বাঁচার শেষ চেষ্টা হিসেবে কামড় দিয়েছিলেন। হাতের কনুইয়ের সেই ক্ষতের জন্য ট্রিটমেন্ট করতে যায় ডাক্তারের কাছে। ডাক্তারকে জানায়, কুকুর কামড়েছে তাকে। ক্ষত দেখে ডাক্তার বুঝলেন কুকুরের নয়, এটা মানুষের কামড়! তার কাছে এই কথা গোপন রাখেন ডাক্তার। তবে গোপন রাখেননি পুলিশের কাছে। সেতুকে পাকড়াও করে পুলিশ।
এই দুইজনের জবানবন্দিতে প্রথমে শহীদুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর তার জবানবন্দির ভিত্তিতে এনামুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের জবানবন্দিতেই নীহার বানুর হত্যার প্রায় সাড়ে ৪ মাস পর মীনা মঞ্জিলে পাওয়া যায় তার লাশ। লাশ উদ্ধারের সময়ও তার পায়ের থাকা স্যান্ডেলে লাল-সবুজের কারুকাজ তখনো বোঝা যাচ্ছিল। গলায় ঝুলছিল চারকোনা রুপার তাবিজ। ততদিনে নীহার বানুর লাশ কঙ্কালে পরিণত হয়েছে। খয়েরী শাড়ি, কারুকাজ করা জুতা দেখে শনাক্ত করা হয় নীহার বানুকে।
এবার আসুন বলি আসামীদের ভাগ্যে ঘটলো। ১৯৭৭ সালের জুলাইয়ে উত্তরাঞ্চলের একমাত্র বিশেষ সামরিক আদালতে নীহার হত্যার বিচারকাজ শুরু হয়। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনসহ বাংলাদেশ দণ্ডবিধি আইনের ৩৬৪, ৩০২, ২০১ ও ৩৪ ধারা অনুযায়ী তদন্তকারী সিআইডি পরিদর্শক অভিযোগপত্র জমা দেন। এতে অভিযুক্ত হিসেবে সাতজনের নাম উল্লেখ করা হয়। তাঁরা হলেন ১. আহমেদ হোসেন বাবু (প্রধান আসামি), ২. মো. আহসানুল হক, ৩. মো. শহীদুল ইসলাম (নীলু), ৪. মো. এনামুল হক, ৫. মো. রুহুল আমীন (ফেতু), ৬. আজিজুর রহমান (আজু) ও ৭. ওয়াহেদুল ইসলাম।
বিচারের শুরুতে সামরিক আদালতের চেয়ারম্যান বলেন, রাজশাহীর ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট মামলার অন্যতম আসামি এনামুলকে ক্ষমা ঘোষণা করেছেন। মামলার স্বার্থে এনামুলের আবেদনে সরকারপক্ষ এই আবেদন মঞ্জুর করে। পরে তাকে রাজসাক্ষী করা হয়। তার জবানবন্দিতে আগেই পড়েছেন এই হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা।
১৯৭৭ সালের ২৯ আগস্ট বিশেষ সামরিক আইন আদালত এই আলোচিত হত্যাকাণ্ডের রায় ঘোষণা করে। তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ সালাম তাঁর ৪০ পৃষ্ঠার রায়ে বলেন, নীহার বানুকে হত্যার ঘটনা ছিল নিষ্ঠুর, নৃশংস, মর্মান্তিক এবং সমাজকে নাড়িয়ে দেওয়া এক অপরাধ। আদালতের পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট করা হয় যে নীহার বানু-কে হত্যা পূর্বপরিকল্পিতভাবে এবং ঠান্ডা মাথায় সংঘটিত হয়েছে।
রায়ে প্রধান আসামি আহমেদ হোসেন বাবু, এবং তার সহযোগী আহসানুল ও শহীদুল-কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন কেবল শহীদুল; অন্য দুইজন পলাতক ছিলেন।
আদালত আরও সিদ্ধান্ত দেন যে রুহুল আমীন ফেতু হত্যার পর লাশ গোপনে সরিয়ে ফেলতে সহায়তা করার অপরাধে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড পাবেন। অপরদিকে মামলার দুই অভিযুক্ত আজিজুর রহমান আজু এবং ওয়াহিদুল ইসলাম-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত তাদের সম্পূর্ণ খালাস দেন।
পরবর্তীতে জানা যায়, প্রধান আসামি আহমেদ হোসেন বাবু আর দেশে ফেরেননি এবং দণ্ড কার্যকরও হয়নি। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে যে তিনি জার্মানিতে বসবাস করছেন।
নীহার বানুর হত্যা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অরাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশ, নানারকম জখমে ভরা হৃদয় নিয়ে বেঁচে থাকা এই দেশের জনগণের জন্য এই কেসটা তাই আরও বেশি হ্ররদয়বিদারক হয়ে ধরা দেয়। তাছাড়া এই কেসে খুনীরা শুধু খুন করেই থেমে থাকেনি বরং এরপর প্রমাণ লোপাট করতে জঘন্য অমানবিকতার পরিচয় দেয়। তবে এরপরও প্রধান আসামীদেরকে ধরতে না পারা আর কালের গর্ভে তাদের হারিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের দুর্বল প্রসাসনের দিকেই বারবার ইংগিত দেয়।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো




পাঠকের মন্তব্য