আজ ১০ ফেব্রুয়ারি। বিশ্বজুড়ে আজ পবিত্র ‘টেডি-ডে’ পালিত হচ্ছে। তবে একে কেবল একটি দিবস বললে ভুল হবে, এটি মূলত বিশ্ব অর্থনীতির এক বিশাল ‘সারপ্লাস ভ্যালু’ তৈরির প্রজেক্ট। আসুন, একটু গভীর থেকে বিষয়টা নাড়িয়ে দেখি:
১.
কামুর অস্তিত্ববাদ পড়লে বোঝা যায়, মানুষ প্রতিনিয়ত তার অস্তিত্বের সারবত্তা খোঁজে। কিন্তু ভ্যালেন্টাইন উইকের চতুর্থ দিনে এসে সেই অস্তিত্ব থমকে দাঁড়ায় এক দলা সিন্থেটিক তুলোর সামনে। একজন রক্ত-মাংসের মানুষ তার সমস্ত আবেগ ঢেলে দিচ্ছে এমন একটি জড়পদার্থের ওপর, যার নেই কোনো স্নায়ুতন্ত্র, নেই কোনো বিবর্তনীয় ইতিহাস। এটি মূলত মানুষের একাকীত্বকে ‘পণ্য’ হিসেবে বাজারজাত করার এক নিখুঁত ফন্দি। আপনি যখন কয়েক হাজার টাকায় একটি টেডি কিনছেন, আপনি আসলে ভালোবাসা কিনছেন না; আপনি মূলত আপনার ‘একাকীত্বের ভীতি’কে একটি বস্তুর রূপ দিয়ে ঘরবন্দি করছেন।
২.
সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় বললে, আমাদের মতো যাদের চেহারা ‘অ্যাবস্ট্রাক্ট মুভমেন্ট’-এর অনুসারী, তাদের জন্য টেডি ডে একটি বিরাট লিবারেটর। খেয়াল করে দেখুন, একটা টেডির চেহারা কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট বিউটি স্ট্যান্ডার্ড মানে না: গোলগাল নাক, বাঁকা চোখ আর বিশাল পেট থাকা সত্ত্বেও সে ‘কিউট’। অথচ আমরা একই গুণাবলী ধারণ করে সমাজে ‘আন-অ্যাট্রাক্টিভ’ হিসেবে গণ্য হই। টেডি বিয়ার মূলত আমাদের হয়ে বিপ্লব করছে। সে প্রমাণ করছে যে, কোনো কাজ না করে এবং কুশ্রী হয়েও পৃথিবীতে পরম আদরে থাকা সম্ভব। এটি কি পরোক্ষভাবে আমাদের মতো মানুষদের জন্য এক ধরণের ‘মোরাল ভিক্টরি’ নয়?
৩.
ঢাকার রাস্তায় জ্যামে আটকে থাকা অবস্থায় যখন আপনি দেখেন পাশের সিটের যাত্রীটি একটি বিশালাকার টেডি বিয়ার নিয়ে যুদ্ধ করছে, তখন আপনার মনে পড়বে ফ্রাঞ্জ কাফকার ‘মেটামরফোসিস’-এর কথা। মানুষ যেন ধীরে ধীরে যান্ত্রিক হতে হতে শেষমেশ তুলার পুতুলে রূপান্তরিত হচ্ছে। যে জ্যামে অ্যাম্বুলেন্স পথ পায় না, সেই জ্যামে ৫ ফুটের এক নির্বাক ভাল্লুক কিন্তু ঠিকই রাজকীয়ভাবে সিট দখল করে গন্তব্যে পৌঁছায়। এটি আমাদের আধুনিক ট্রাফিক ও জীবনব্যবস্থার এক চরম প্যারাডক্স।
৪.
আমাদের রাজনীতিতে যেমন ‘উন্নয়নের জোয়ার’ কেবল পোস্টারেই সীমাবদ্ধ থাকে, তেমনি টেডি ডে-র উপহারও এক ধরনের সাময়িক সান্ত্বনা। প্রেমিকটি আজ টেডি দিয়ে যে নিরাপত্তা ও কোমলতার বার্তা দিচ্ছে, তার স্থায়িত্ব মূলত নির্বাচনের আগের দিন বিলি করা লিফলেটের মতোই। কিছুদিন পরেই দেখা যাবে, সেই বিশাল টেডি ঘরের কোণে ধুলো জমিয়ে পড়ে আছে, যেমন পড়ে থাকে নির্বাচনের পর ভোটারের কদর।
পরিশেষে, টেডি ডে মূলত একটি সিন্থেটিক বিপ্লব। এটি আমাদের শেখায় যে, পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে বুদ্ধি বা পরিশ্রমের চেয়ে ‘কিউটনেস’ এবং ‘চুপ থাকা’ বেশি জরুরি। যারা আজ টেডি কিনতে পারেননি, তারা আসলে ক্যাপিটালিজমের হাত থেকে নিজেদের পকেট এবং বুদ্ধি দুটোই বাঁচিয়েছেন।


