ইন্টারনেট প্রযুক্তির প্রচলনে গোটা পৃথিবীর জানালা খুলে যাওয়ায় বাংলাদেশ আর গ্রাম নয়। ফলে যে গ্রামীণ পঞ্চায়েতি পদ্ধতিতে ২০২৪-এর ৫ অগাস্টের আগে পর্যন্ত বাংলাদেশ শাসিত-শোষিত ও নিপীড়িত হয়েছে; আর কোনোভাবেই তা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। বাংলাদেশের জেনজি, জেন আলফা বিশ্বনাগরিক; ফলে তাদেরকে কোনভাবেই কালো টাকা ও পেশীশক্তি দিয়ে জিম্মি করে রাখা যাবে না। বাংলাদেশের প্রবীণ প্রজন্ম পুরো জীবন দিয়ে উপলব্ধি করেছেন; রাজনৈতিক দলের মাস্তানেরা নানারকম ইজম আর চেতনার গলাবাজি করে কিভাবে দেশ লুন্ঠন করেছে; দেশের অর্থনীতিকে রুগ্ন করে রেখেছে।
দেশের কৃষক, শ্রমিক, ক্ষুদে দোকানি, মেহনতী মানুষেরা উদয়াস্ত পরিশ্রম করে দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়েছে। প্রবাসী শ্রমিক, সেলাইকর্মী রক্ত পানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। আর কোনো পরিশ্রম না করে দলীয় মাস্তান, পাণ্ডা আমলা, ঋণখেলাপী ব্যবসায়ী, দালাল বুদ্ধিজীবীরা সে কষ্টার্জিত সম্পদ লুণ্ঠন করে ফইন্নি থেকে এলিট হয়েছে। দেশের সম্পদ লুণ্ঠন ও পাচার করেছে। অথচ কী নির্লজ্জ তারা; একেকবার একেক ছদ্মবেশে একেক কথার ফুলঝুরি নিয়ে তারা ভাওতাবাজির রাজনীতি করে; বয়ানের ছেনালি করে দেশ-ডাকাতি করতে এসেছে। গড়ে তুলেছে ভীতিপ্রদ চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত।
এইভাবে স্বাধীনতা লাভের ৫৪ বছর পরেও বাংলাদেশ রয়ে গেছে বৈষম্যধূসর অকল্যাণ রাষ্ট্র হয়ে । বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অধিকার বঞ্চিত স্বশিক্ষিত মানুষেরা বার বার রক্ত দিয়ে দেশকে সার্বভৌমত্ব এনে দিয়েছে। আর উচ্চশিক্ষিত লোকেরা সেই সার্বভৌমত্ব বর্গা দিয়ে দেশ লুণ্ঠনের ম্যান্ডেট নিয়ে নিজ নিজ জমিদারি গড়ে তুলেছে। দলীয় তরুণ ক্যাডারদের রক্তের সিঁড়ি বেয়ে এরা পালা করে রাষ্ট্রক্ষমতায় গেছে; এরপর জমিদারেরা তাদের কোটালপুত্রদের দিয়ে খুবলে খেয়েছে দেশের সাধারণ মানুষের জীবন। দলীয় ক্যাডার দিয়ে ভয় দেখিয়ে দখল, চাঁদাবাজি, হত্যা, ধর্ষণের নারকীয় ব্যবস্থাটাকেই রাজনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে নরভোজি রাজনৈতিক নেতারা। আমলা, ব্যবসায়ী আর বুদ্ধিজীবীরা মিলে তাদের নিষ্ঠুর রাজত্ব চিরস্থায়ী করার চেষ্টা করেছে।
আলাদা আলাদা রাজনৈতিক দল মনে হলেও; ব্যবসা-অংশীদারিত্ব, বেয়াই বন্দোবস্ত, নানারকম শত্রু শত্রু খেলার টানটান উত্তেজনার নাটক দিয়ে; এরা সাধারণ মানুষকে বোকা বানিয়েছে। এক দল জেলে গেলে আরেকদল সেখানে জামাই আদরের ব্যবস্থা করেছে; প্রতিপক্ষের নেতাকে জেলে বলে ফাইভ স্টার হোটেলে রেখেছে; একদল পালিয়ে গেলে আরেকদল তার ব্যবসার দায়িত্ব নিয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতি দস্যুদের পার্টনারশিপের অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা। রাজনৈতিক দলের হাতিরা একজনের ছেলেকে আরেকজনের মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে বেয়াইকৃত্য করেছে; আর দলের উলু খাগড়া কর্মীদের হাড্ডির লোভ দেখিয়ে সারমেয় জীবনের অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে। আগে যেমন একটু পয়সাওয়ালা লোকেরা দোনলা বন্দুক নিয়ে শিকারে যেত; বাংলাদেশের পয়সাওয়ালা রাজনীতিকেরা পরস্পরের দলের ক্যাডারদের ক্রসফায়ার করে সে শিকারের আনন্দ নিয়েছে। দলীয় বুদ্ধিজীবীরা তখন মিডিয়ায় এসে বলেছে, বাগানকে সুন্দর রাখতে গেলে আগাছা পরিষ্কার করতে হয়।
রাজনৈতিক দলের নেতারা রেললাইনের ধারে ধানক্ষেতের মলত্যাগ থেকে নানারঙ্গের ভবনের হাইকমোডে উঠে আসায়; তাদের বড্ড দেমাগ আর ভাবমূর্তি রক্ষার রোগ। তাই তো তারা ফেসবুকে ও মিডিয়ায় কুকুর পুষে ভাবমূর্তি পাহারা দেবার জন্য। পঞ্চায়েত প্রধান যেমন গ্রামের পণ্ডিতের মুখে ভিন্নমত সহ্য করতে না পেরে মেথরকে পাঁচ সিকি দিয়ে বলতো, যা পণ্ডিতের দরোজায় এক ভাণ্ড 'গু' ঢেলে দিয়ে আয়; রাজনৈতিক নেতারা তেমনি ফেসবুকে মেথর গ্যাং পুষে; ভিন্নমত দেখলেই সেখানে 'গু' ঢেলে দিয়ে আসতে নির্দেশ দেয়।
ডিএনএ-র মধ্যে রেললাইনের ধারের হুকওয়ার্ম প্রবেশ করায়; নিজ অভিমতের সঙ্গে ইঞ্চি ইঞ্চি না মিললেই নেতা ও তাদের হাতাদের শরীরে চুলকানি তৈরি হয়। এইভাবে বাংলাদেশে তালগাছপন্থাটাই হয়েছে একমাত্র রাজনীতি।
কাস্ট সিস্টেমের স্যাঁতসেতে লীলাভূমি কলকাতায় বৃটিশের পিয়ন, অর্ডারলি, চাপরাশি যেভাবে রাতারাতি ফইন্নি থেকে এলিট হয়ে সমাজকে ভদ্রলোক ও ছোটলোক এই দুইভাগে ভাগ করেছিলো; ঢাকায় তেমনি একটু পয়সা হলে, ছাপড়া থেকে দালানে উঠলে, ফর্সা কাপড় পরে ঘুরতে শিখলে, পেটে দু'ছটাক বিদ্যে পড়লেই 'ভদ্রলোক' হবার বাতিক হয়। ফেয়ার এন্ড লাভলী মেখে সখিনা বেগম সাকিনা হয়ে আর কল্পনা রাণী কাপ্পু হয়ে যত্রতত্র লোককে ছোট লোক বলে বেড়ায়।
আধুনিকতার সংজ্ঞা হচ্ছে সাম্যচিন্তা, প্রতিটি মানুষকে সম্মান দেয়া; আর ধ্যাড়ধেড়ে গোবিন্দপুর মার্কা মেট্রোপলিসে আধুনিকতা মানে মানুষকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে বেড়ান। আয়নায় নিজের চেহারা না দেখে অন্যদের নিয়ে হাসাহাসি করা। এ কারণে দেখবেন ফইন্নি থেকে এলিটেরা সবসময় দেশের হ্যাভস নটদের নিয়ে হাসাহাসি করে; নিজের বাপ-দাদার ডাকাতি আর নিজের উঞ্ছবৃত্তি ঢাকতে; অধিকার বঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে উপহাস করে 'জাতে' উঠতে চেষ্টা করে। এরকম স্থূলরুচির ভ্যাড়ভেড়ে আধুনিকতা পৃথিবীর আর কোনো মেট্রোপলিসে চোখে পড়ে না।
জেনজি ও জেন আলফা বিশ্বনাগরিক হওয়ায়; তারা ঐসব 'আমরা বনাম ওরা'-র বিভাজন বোঝেনা; বিদ্বেষ মনে নিয়ে চলে না। কিন্তু পুরোনো চিন্তার নতুন ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলারা নতুনদের কাউকে কাউকে গ্রুমিং করে; 'তুমি ভদ্রলোক' কিন্তু 'ওরা ছোট লোক' এই বিভাজনের বিষ ঢেলে দেয় তাদের সত্য সুন্দর মঙ্গলের জগতে। কারণ বিদ্বেষ ও বিভাজনের দোকান চালানো না গেলে বিকৃত জমিদারি বন্দোবস্তটি ভেঙ্গে পড়বে; এ আশংকা তার মনে।
জেনেক্স ও সিনিয়র মিলেনিয়ালের মাঝে যারা সত্যিকার শিক্ষা অর্জন করেছে তারা শিষ্টাচারসম্পন্ন মানুষ। পৃথিবীতে এলিটিজম বলে যদি কোনো শব্দ থাকে; তার সমার্থক শব্দ হচ্ছে কার্টেসি। সুতরাং যে কার্টেসি দেখাতে পারবে না; কিন্তু নিজেকে এলিট বলে দাবি করবে; বুঝতে হবে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির টাকায় রেললাইনের ধার থেকে অস্বাভাবিক দ্রুততায় হাইকমোডে উঠে তার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। কর্কশ আচরণ, প্রদর্শনবাদিতা হচ্ছে পৃথিবীর আদি ও অকৃত্রিম ছোটলোকি।
৫৪ বছর ধরে ঘুষ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, ঋণখেলাপ, রাজনৈতিক দলের অন্ধ দালালির মাঝ দিয়ে যে এফ্লুয়েন্ট ছোটলোক সমাজ তৈরি হয়েছে; সেটাই বাংলাদেশের উত্তরণের পথে প্রধান বাধা।
বিভাজন-বিদ্বেষ নয়, ফাঁপা অহমের আইভরি টাওয়ার নয়, দেশ ডাকাতি করে এফলুয়েন্ট হওয়া নয়; রাজনীতির নামে নরভোজ নয়; বাংলাদেশের লক্ষ্য সাম্যচিন্তার বৈষম্যমুক্ত বন্ধুত্বের সমাজ। ধর্ম-চিন্তা-গোত্র-পেশা নির্বিশেষে বাংলাদেশে প্রতিটি নাগরিকের জন্য সম্মান ও আনন্দদায়ক জীবন রচনাই নতুন প্রজন্মের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ। পুরোনো বন্দোবস্তের অচলায়তন ভেঙ্গে নতুন ব্যবস্থার জীবন সঞ্চারী রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার স্বপ্নটিকে 'হ্যা' বলতে হবে। মানুষ তার স্বপ্নের সমান সম্ভাবনাময়।



পাঠকের মন্তব্য