আপনি কী কখনও কোনো টিকা নিয়েছেন? নিশ্চয়ই নিয়েছেন। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে নানারকম টিকা নিয়েছেন। সর্বশেষ হয়ত নিয়েছেন কোভিডের টিকা। আপনি অজান্তেই একজনের কাছে চিরঋণী হয়ে গেলেন, তিনি হলেন হেনরিয়েটা ল্যাকস। ভাবছেন কীভাবে? আসুন আজকে আপনাকে ইতিহাসের লুকানো এক নারীর গল্প বলি।
জানুয়ারি ১৯৫১, আমেরিকার বাল্টিমোর, মেরীল্যান্ড। হেনরিয়েটা বুঝতে পারছিলেন তার শরীরের মাঝে কোনো একতা বড় সমস্যা হয়েছে। রক্ত পড়া থামছেই না, ব্যথা বেড়েই যাচ্ছে। তখন তার বয়স ৩১, পাঁচ সন্তানের জননী। কাজ করেন তামাকক্ষেতে। এই সংসার চালানো, সন্তানদের বড় করে তোলার জন্য যে তাকে বেঁচে থাকতে হবে তা তিনি জানতেন।
যে সময়ের কথা বলছি সে সময় আমেরিকায় বর্ণ-বিদ্বেষ চরমে। কৃষাঙ্গ মানুষেরা চাইলেই সাধারণ মানুষের মতো যেকোনো হাসপাতাল, মার্কেট বা পাবলিক প্লেসে যেয়ে কোনো সুবিধা নিতে পারতেন না। কিন্তু হেনরিয়েটার রক্তপাত বাড়তে থাকল। শেষে আর ইগনোর করার মতো অবস্থা থাকল না। হেনরিয়েটা গেলে বালতিমোরের জন হপকিন্স হাসপাতালে। যে কয়েকটি হাসপাতাল সেসময় কৃষ্ণাঙ্গদের চিকিৎসা করত তার মধ্যে একটা।
ডাক্তাররা পরীক্ষা করল। ফলাফলে দেখা গেল, সার্ভাইক্যাল ক্যান্সার (জরায়ুমুখের ক্যান্সার)। খুব বাজে পরিস্থিতি দেখে ডাক্তাররা দ্রুত চিকিৎসা শুরু করলেন। রেডিয়েশন, তীব্র ব্যথা, ভয়- সবকিছু সহ্য করেও হেনরিয়েটা চাইলেন বাঁচতে। বাঁচার আশা ছাড়লেন না।
এর মাঝেই ঘটল এক আশ্চর্যজনক ঘটনা, যা কখনও জানতে পারেননি হেনরিয়েটা। রুটিন চেকাপের জন্য একজন ডাক্তার তার টিউমারের টিস্যুর স্যাম্পল নিলেন। সেই স্যাম্পল গেল বিজ্ঞানী ড. জর্জ অটো গে-এর ল্যাবে। সেসময় তিনি কাজ করছিলেন কীভাবে মানুষের কোষকে মানবদেহের বাইরে জীবিত রাখা যায় তা নিয়ে। তবে সফল হচ্ছিলেন না। কইয়েকদিন বাঁচার পর কোষগুলো মরে যেত। ব্যতিক্রম ঘটল হেনরিয়েটার কোষের বেলায়। এগুলো মরল তো নাই-ই উল্টো আরও দ্রুত বাড়তে শুরু করল। চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে কোষগুলো প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেল। আরপর চারগুণ… আটগুণ…
ড. অটো তাড়াতাড়ি এই কোষগুলোকে নিয়ে নানা এক্সপেরিমেন্ট শুরু করলেন। কিন্তু কোষগুলো মোটেই মরার জন্য প্রস্তুত ছিল না। বরং একটা মরলে আরও চারটা জন্ম নিতে থাকল। তিনি এই কোষগুলোকে নাম দিলেন ‘হেলা’ (হেনরিয়েটার পুরো নামের প্রথম দুই অক্ষর নিয়ে)।
এদিকে হেনরিয়েটার শরীরের কোষগুলো ফাইট করে হেরে যেতে থাকল ক্যান্সারের কাছে। আস্তে আস্তে নিস্তেজ হতে থাকল হেনরিয়েটার শরীর। অবশেষে ১৯৫১ সালের ৪ অক্টোবর মাত্র ৩১ বছর বয়সে হেনরিয়েটা ক্যান্সারের কাছে হার মেনে চলে যান দুনিয়া ছেড়ে। তার পরিবার জানতো না তেমন কিছুই। বাচ্চারা মা হারা হলো। তাকে কবর দেওয়া হলো খুব সাধারণভাবে। এমনকি কবর মার্ক করার জন্য কোনো এপিটাফও ছিল না। কারণ হেনরিয়েটার পরিবারের সেই সামর্থ্যই ছিল না।
কিন্তু হেনরিয়েটার কোষ বেঁচে থাকল তখনও। কয়েক মাসের মধ্যেই হেলা কোষ ছড়িয়ে পড়ল পুরো পৃথিবীতে। প্রথমে সায়েন্টিফিক রিসার্চের জন্য ফ্রি সবখানে পাঠানো হয়েছিল। তারপর যা ঘটল তা পুরো বিশ্বের চিকিৎসাবিজ্ঞানকে পালটে দিল।
১৯৫২ সালে জোনাস সাল্ক হেলা কোষ ব্যবহার করে তৈরি করলেন পোলিও ভ্যাকসিন—যে ভ্যাকসিন এক সময় হাজার হাজার শিশুকে পঙ্গু করে দেওয়া রোগের অবসান ঘটায়।
১৯৬০-এর দশকে হেলা কোষ পাঠানো হলো মহাকাশে—শূন্য মধ্যাকর্ষণে মানব কোষের আচরণ বুঝতে।
১৯৮০-এর দশকে এই কোষগুলো হয়ে উঠল HIV ও AIDS গবেষণার মূল চাবিকাঠি।
এরপরের দশকগুলোতে—
ক্যান্সার চিকিৎসা,
জিন ম্যাপিং,
ফার্টিলিটি গবেষণা, এমনকি COVID-19 ভ্যাকসিন আবিষ্কারেও হেলা কোষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
২০১৮ সাল নাগাদ—
১ লক্ষ ১০ হাজারের বেশি বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্রে হেলা কোষের উল্লেখ পাওয়া যায়।
১১ হাজারের বেশি পেটেন্টে এই কোষ ব্যবহার হয়েছে।
এই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের চিকিৎসা অগ্রগতি গড়ে উঠেছে এমন এক নারীর কোষের ওপর যিনি জানতেনই না, তাঁর শরীর থেকে সেগুলো নেওয়া হয়েছিল। আর পঁচিশ বছর ধরে জানত না তার পরিবারও। ১৯৭০-এর দশকে এক গবেষক হেনরিয়েটার স্বামী ডেভিড ল্যাকসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
তিনি এমন রক্তের নমুনা চান যা হেলা কোষের সঙ্গে সম্পর্কিত। হেনরিয়েটার স্বামী ডেভিড তো পড়লেন আকাশ থেকে।
তাহলে কি হেনরিয়েটা এখনও বেঁচে আছেন? সত্যটা পুরো পরিবারকে নাড়িয়ে দিল। তাঁদের মায়ের কোষ নেওয়া হয়েছিল অনুমতি ছাড়াই। ব্যবহার করা হয়েছে সম্মতি ছাড়াই। লাভের জন্য বিক্রি করা হয়েছে, যখন কি না তার সন্তানরা দারিদ্র্যের মধ্যে থেকে চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছিল।
হেনরিয়েটার মেয়ে ডেবোরাহ ল্যাকস একবার প্রশ্ন করেছিলেন, আমাদের মা যদি বিজ্ঞানের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ হন, তাহলে তার পরিবারের স্বাস্থ্যবীমা নেই কেন? কিন্তু ১৯৫১ সালের আইন হেনরিয়েটাদের জন্য ছিল না। তাই সম্মতি ছাড়াও তার কোষ ব্যবহারে কোনো সমস্যাও ছিল না। তবে পরিবর্তন আসে ২০১০ সালে। রেবেকা স্ক্লুট এর লেখা বই The Immortal Life of Henrietta Lacks— প্রথমবার কোষের পেছনের মানুষটিকে সামনে আনে।
২০১৩ সালে National Institutes of Health (NIH) হেনরিয়েটার পরিবারের সঙ্গে একটি চুক্তি করে, হেলা কোষ ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিবারকে সিদ্ধান্তে যুক্ত করা হয়। ২০২৩ সালে, বহু বছর ধরে হেলা কোষ বিক্রি করে লাভ করা একটি বায়োটিক কোম্পানির সঙ্গে পরিবার একটি সমঝোতায় পৌঁছায়।
অবশেষে, হেনরিয়েটা ল্যাকস পরিচিত হয়েছে, কোনো নমুনা হিসেবে নয়, কোনো কোড হিসেবে নয়,
বরং একজন জলজ্যান্ত নারী হিসেবে।
তাই আপনি যদি কখনও টিকা নিয়ে থাকেন, অপারেশন করিয়ে থাকেন, ক্যান্সারের ওষুধ খেয়ে থাকেন, IVF-এর সুবিধা নিয়ে থাকেন, অথবা গত সত্তর বছরে তৈরি কোনো চিকিৎসা পেয়ে থাকেন, আপনি হেনরিয়েটা ল্যাকসের কারণেই উপকৃত হয়েছেন।
আজ পৃথিবীতে যে লক্ষ লক্ষ মানুষ বেঁচে আছেন, তাঁদের পেছনে রয়েছে হেনরিয়েটার কোষের অবদান।
হেনরিয়েটা অমর হতে চাননি। তিনি এতে সম্মতি দেননি। এমন কি তিনি এতে কোনো লাভও পাননি। তিনি শুধু সেই ক্যান্সারের চিকিৎসা চেয়েছিলেন, বাঁচতে চেয়েছিলেন তার পরিবারের জন্য। কিন্তু পারেননি। তবে তিনি বদলে দিয়েছেন চিকিৎসাবিজ্ঞান, চিরতরে। না জেনেও বাঁচিয়েছেন হাজারও প্রাণ।
তথ্যসূত্র: Encyclopedia Britannica – Henrietta Lacks, National Institutes of Health (NIH) – HeLa Cells & Ethics, Johns Hopkins Medicine – History of HeLa Cells, Nature Journal – Ethical analysis of HeLa research, Rebecca Skloot (2010) – The Immortal Life of Henrietta Lacks



পাঠকের মন্তব্য