বৌ পুঁটিমাছের ঝাল বানিয়েছে। খেতে বসে মাছ দিয়ে ভাত মুখে তুলতেই পারছি না। চোখ ফেটে জল আসছে, গলা ধরে আসছে, গিলতে গিয়ে গলায় আটকে যাচ্ছে ভাতের দলা। আজ কদিন হল পাশের বাড়ির পুঁটি বৌদিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
সকালে চুল কাটতে গিয়ে প্রশান্তর সেলুনে খবরটা পেয়ে বুকটা ধক্ ধক্ করতে লাগল। ক'দিন হল ছাদে বা বারান্দায় পুঁটিবৌদির দেখা পাইনি, মিহি গলায় তার গুনগুন গান শুনিনি। আর সেই সঙ্গে আমার বৌয়ের হেঁড়েল গলার চিৎকারও শুনিনি। পুঁটিবৌদির গানের সঙ্গে আমার বৌয়ের গরম মেজাজের এক সুমধুর সম্পর্ক আছে। গান শুনলে মন ভালো হয় শুনি, তাই তো আমি পুঁটিবৌদির কণ্ঠস্বর শুনে নিজের মনোবেদনা উপশম করার আশায় ছাদে বা বারান্দায় একটু বসি অথচ ওর গান শুনলেই আমার বৌয়ের মেজাজ কেন যে সপ্তমে চড়ে যায়!
কদিন ধরে পুঁটিবৌদির গলা শুনিনি, ভাবলুম বাপের বাড়ি গেছে বোধহয়। চুল কাটতে না এলে ব্যাপারটা জানা যেত না।
কুন্ডুদা আজ বছর আষ্টেক হল রিটায়ার করেছেন, সারাক্ষণ শুধু পাড়ার কমবয়সি বৌদিদের খোঁজখবর রাখেন। উনি হন্তদন্ত হয়ে প্রশান্তর সেলুনের দরজা ঠেলেই বললেন, নাহ, বাপের বাড়ি যায়নি। আমি খবর নিয়েছি। ওখানে ননা ঘোষের শ্বশুর বাড়ি কিনা, ওকে খবরটা নিতে বলেছিলাম, সেই খবরটা নিয়ে এল। বাপের বাড়ি যায়নি।
প্রশান্ত কাঁচির ক্যাঁচক্যাঁচ থামিয়ে খুব চিন্তিত মুখে বলল, তাহলে গেল কোথায়?
আমার মনের কথাটাই প্রশান্ত বলে দিল, নাহলে আর একটু হলে আমার মুখ ফস্কে বেরিয়ে যাচ্ছিল।
কালো কাপড়ে গলা পর্যন্ত ঢাকা ছিল বলে এতক্ষণ কুন্ডুদা আমায় চিনতে পারেননি। এবার চিনতে পেরে বললেন, এই যে মনিবাবু, আপনার পাশের বাড়ির বৌদি আজ তিনদিন ধরে বেপাত্তা, আপনি কোন খবর রাখেন?
আমি আমতা আমতা করে বললুম, না মানে, ঠিক জানি না তো।
কুন্ডুদা উত্তেজিত হয়ে চোখ বড় বড় করে বললেন, সেকি মশাই, আপনার শোবার ঘরের জানলা দিয়ে পুঁটিবৌদির বাথরুম দেখা যায়, আর আপনি জানেন না বৌদি কোথায়? পাড়ায় কী করতে থাকেন মশাই, কোন দায়-দায়িত্ব নেই?
কুন্ডুদার এরকম অশিষ্ট কথাবার্তা শুনলে মাথা গরম হয়ে যায়। আমার বৌও নাকি ওর বৌদি হয়, মাঝেমধ্যেই 'কী খবর, কেমন আছেন' বলে ঘরে ঢুকে যায়। চোখ তার চরকির মতো ঘোরে। আমার শোবার ঘরের জানলা দিয়ে ঠিক লক্ষ করেছে পাশেই পুঁটিবৌদির বাড়ির বাথরুম।
এমন সময় বুবু ব্যানার্জ্জী দরজা ঠেলে মুখ গলিয়ে সামনে প্রশান্তকে দেখে জিজ্ঞেস করল, এই কুন্ডুদা কই রে?
প্রশান্ত কিছু উত্তর দেবার আগেই কুন্ডুদা চেয়ার ছেড়ে এক লাফে দরজার কাছে এসে বেশ উত্তেজিত গলায় বলল, এই তো আমি, এই তো আমি। কিছু খবর পেলে?
প্রশান্তর ক্যাঁচক্যাঁচ আবার থেমে গেল। আমারও কানদুটো টান টান হয়ে গেল। বুবুদা দরজাটা ঠেলে ভিতরে ঢুকে চেয়ারে ধপ্ করে বসে কপালে হাত দিয়ে একটা চাপড় মেরে বলল, সব্বোনাশ হয়ে গেল, যা আন্দাজ করেছিলুম তাই হল।
কুন্ডুদা ততোধিক উত্তেজিত গলায় বললে, কী , কী?
শেষে কিনা রাজমিস্ত্রিটার সঙ্গে পালাল?
তারপর মনের অব্যক্ত যন্ত্রণা অস্ফুটে নিচুস্বরে বুবুদা প্রকাশ করলে, আর কি কেউ ছিল না?
নিস্তব্ধ সেলুনে কুন্ডুদার দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে আমার দীর্ঘশ্বাস মিশে গেল। কিন্তু আমার শ্বাসের গরম হাওয়ার ধাক্কা প্রশান্তর বোতাম খোলা খালি বুকে আছড়ে পড়তেই সে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে একটা তাচ্ছিল্যের চাপা হাসি ঠোঁটে চেপে বলল, কাকু, পুঁটিবৌদির বেপাত্তায় আপনারও বুকে আগুন জ্বলছে দেখছি। গরম নিঃশ্বাস!
প্রশান্তটা মহা ত্যাঁদর, এদিকে কাকু বলে অথচ ফচকেমি করতে ছাড়ে না। রাগে গা পিত্তি জ্বলে যায়। অর্ধেক চুল কাটা বাকি আছে তাই, নাহলে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়তে ইচ্ছা করছিল।
আয়নার ভিতর দিয়ে কুন্ডুদা আর বুবুদাকে দেখলুম, একেবারে ভেঙে পড়েছে। মাথা নিচু করে থুতনির উপর হাত দিয়ে চেয়ারে বসে আছে। মনে হয় গভীর চিন্তায় মগ্ন। পুঁটিবৌদির বেপাত্তা যতটা না তাদের হৃদয়কে ক্ষত করেছে, তাদের মতো যোগ্য বিধবাবুড়ো থাকতে সামান্য একটা রাজমিস্ত্রির সঙ্গে পুঁটিবৌদির পলায়ন তাদের হৃদয়কে তার থেকেও বেশি দুমড়ে মুচড়ে ছেড়েছে। প্রশান্তর কথাটা তাদের কানে ঢোকেনি। ভাগ্যিস, নাহলে কুন্ডুদা আবার কী না কী বলে আমাকে বেইজ্জত করে ছাড়ত। প্রশান্ত যখন দেখল, বুড়োদুটো গম্ভীর এক ব্যাপার নিয়ে অতিশয় চিন্তামগ্ন থাকায় আমাকে নিয়ে তার সামান্য এক মশকরার টোপে ঠোক্কর মারল না তখন আবার সে আমার চুল কাটায় মনোনিবেশ করল। আমি সতর্কভাবে দুই বুড়োকে লক্ষ করছি আয়নার মধ্য দিয়ে।
হঠাৎ বুবুদা উঠে দাঁড়িয়ে কুন্ডুদার উদ্দেশ্যে বললে, চলুন।
কুন্ডুদা অবাক হয়ে বললে, কোথায়?
রাজমিস্ত্রিটার বাড়ি। ওর বৌয়ের কাছে সব খবর পাওয়া যাবে।
তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, এই যে মনিবাবু, আপনার মোটর সাইকেলটা নিয়ে চলুন তো একবার ওপাড়ায়।
আমি পড়লুম মহা ফ্যাঁসাদে। বৌ যদি জানতে পারে পুঁটিবৌদির খোঁজে ওপাড়ায় গেছি, আমার তো বাড়ি ঢোকাই বন্ধ হয়ে যাবে। আবার না গেলেও বলবে পাশের বাড়িতে থাকেন, কোনো দায়িত্ব-কর্তব্য নেই ? বুড়ো দুটোর খুব সুবিধা, বাড়িতে নড়া ধরে নাড়িয়ে দেবার মতো কেউ নেই। বৌরা গত হয়েছে, ছেলেমেয়েরা বাইরে।
আমি আমতা আমতা করে বললুম, চুল তো অর্ধেক কাটা হয়েছে, এই আধখোঁচা চুল নিয়ে...
পুরোটা বলার আগেই আমার শরীরে পেঁচানো কাপড়টা খুলে নিয়ে প্রশান্ত বলল, যান কাকু, বাকি চুলটা পরে কাটবেন।
কুন্ডুদা খিঁচিয়ে উঠলেন, কী লোক মশাই আপনি, চুলটাই বড় হল? সমাজে বাস করেন, সমাজের ভালোমন্দ দেখবেন না?
অগত্যা কী আর করা, আধখোঁচা চুল নিয়ে গাড়িতে করে দুজনকে রাজমিস্ত্রি হুলোর বাড়ির সামনে নামিয়ে দিলুম। বেশ সুন্দরী কমবয়সি মহিলা দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল। কুন্ডুদা আর বুবুদা গাড়ি থেকে নেমেই বললেন, তুমি কি হুলোর বউ?
মহিলার ইতিবাচক ঘাড় নাড়া দেখে বুঝলুম ও হুলোর বৌ এবং বেশ আশ্চর্য হলাম এই ভেবে যে ঘরে এরকম সুন্দরী বৌ থাকতে কেউ অন্যের বৌ নিয়ে পালাতে পারে?
বাড়িটা তিনতলা করাবো, হুলো কোথায় ?
বলতে বলতে দুজনে হুলোর বাড়িতে ঢুকে পড়ল। আমি গাড়িতে দুদিকে পা ঠেসিয়ে বসে আছি, এমন সময় বৌয়ের ফোন এল, পুঁটির জন্য মন খারাপ করে বিবাগী হয়ে গেলে নাকি? বাড়িতে ঢুকতে ইচ্ছা করছে না? অন্য সময় তো বাড়ি থেকে বেরোতে ইচ্ছা করে না।
‘এই তো যাচ্ছি’ বলে ফোনটা কেটে গাড়ি স্টার্ট করে বাড়ি এলাম। বাড়িতে ঢুকতেই বৌ আশ্চর্য হয়ে বলল, একি! ঝোড়ো কাকের মতো চুল কাটা?
মিথ্যা করে বললুম, প্রশান্তর শাশুড়ির যখন তখন অবস্থা, দোকান বন্ধ করে চলে গেল। কাল প্রশান্ত দোকান খুললে ভালো, নাহলে অন্য দোকানে বাকিটা কেটে নোবো।
গামছাটা নিয়ে বাথরুমে ঢুকে পড়লুম চান করতে।
ততক্ষণে বৌ প্রশান্তকে ফোন করে সব জেনে নিয়েছে। আমার কথা বৌ কিছুতেই বিশ্বাস করে না। যাই বলি না কেন, ঠিক যাচাই করে নেয়। প্রতিবার ধরা পড়ে ভাবি এবার থেকে সত্যি কথাই বলব কিন্তু সব সত্যি কি বলা যায় ? বিশেষ করে পুঁটিবৌদিকে খুঁজতে যাওয়ার ব্যাপারটা ? বাথরুম থেকে বেরোতেই বৌ এর তুমুল ঝাঁজের মুখে পড়লুম, তোমরা হলে দড়ি দিয়ে খুঁটোর সঙ্গে বেঁধে রাখার বস্তু। দড়ি যতদূর ছাড়া হবে ততদূর পর্যন্ত চরে বেড়াবে। এর বাইরে যাবে না। তোমার মতো ধড়িবাজ মিনসেকে আমার চেনা আছে। ছুকরিবাজ বুড়োদুটোকে নিয়ে পুঁটিবৌদির খোঁজে বেরিয়েছিলে?
রবিগুরু কবীন্দ্রনাথ নাকি বলেছিলেন, বৌ এর ধমকে বরের স্বরের পর্দা নেমে গিয়ে যখন মিনমিন স্বরে কথা বেরোবে, তখন বরের ওই অবস্থাকে এক কথায় বোঝাতেই "মিনসে" কথাটির ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ঠিকই বলেছেন। আমি মিনমিন করে বললাম,
কী করব, জোর করে নিয়ে গেল।
বৌ আর এক পর্দা চড়িয়ে বলল, কচি খোকা তুমি, জোর করে নিয়ে গেল। আর কোনদিন যদি ঐ বুড়োদুটোর সঙ্গে দেখেছি তো তোমার একদিন কী আমার একদিন।
পরেরদিন সকালবেলা প্রশান্তর দোকানে বাকি চুলটা কাটতে গেলুম।
কাল কাকিমার খুব ঝাড় খেয়েছেন নিশ্চয়ই।
আয়নার পিছনে প্রশান্তর দাঁত চাপা মুচকি হাসি লক্ষ করলুম।
কাকিমাকে মিথ্যা যখন বললেন, আগে আমাকে ফোন করে বলে দিতে পারতেন, তাহলে ঝাড় খেতে হত না।
আসলে আটঘাট বেঁধে মিথ্যা কথা আমি বলতে পারি না। প্রশান্তকে বললুম, বেশি ফটর ফটর না করে চুলটা তাড়াতাড়ি কাট।
এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে বুবুদা ঢুকেই বলল, ছি ছি ছি, রাস্তায় আর মুখ দেখানোর উপায় রইল না।
প্রশান্ত কাঁচি থামাল আর আমিও মুখ ঘুরিয়ে পিছনে বেঞ্চে বসা বুবুদার মুখের দিকে তাকিয়ে তার মুখ না দেখানোর কারণ খুঁজতে লাগলুম।
প্রশান্ত জলের বোতলের ছিপিটা খুলে বুবুদার হাতে ধরিয়ে বলল, ব্যাপারটা কী খুলে বলুন তো?
ঢক্ ঢক্ করে দু ঢোঁক জল গিলে বুবুদা বললেন, কাল সন্ধ্যে থেকে কুন্ডুদা বেপাত্তা।
প্রশান্ত আর আমার দুজনের মুখ থেকে একসঙ্গে বের হল, কাকে নিয়ে?
বুবুদা কপাল চাপড়ে বললেন, কাকে আবার? ওই ছোটোলোক রাজমিস্ত্রিটার কচি বৌটাকে নিয়ে। বুড়োভামটার মনে মনে এই ছিল? ইস্, আগে যদি আন্দাজ করতে পারতাম! বৌটারও বলিহারি বুদ্ধি গেলি গেলি ওই সত্তর বছরের বুড়োটার সঙ্গে?
তারপর একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, কেন, আর কি কেউ ছিল না?



পাঠকের মন্তব্য