স্রষ্টার দরবার। এক কোণে বসিয়া ইবলিশ কাঁদিতেছে হাপুসনয়নে। সে বিরতি দিয়া দিয়া কাঁদে। কখনো হাপুসনয়নে, কখনো ইনাইয়া-বিনাইয়া।
স্রষ্টা ব্যস্ত। চারিদিকে নজর দেওয়া লাগিতেছে তাঁহাকে। একদিকে মুসলিম-ইহুদি+খ্রিস্টান মূলকের ইনসানেরা ঝামেলা করিতেছে। একে অপরের পিছু মোটেই ছাড়িতেছে না। এটা ছাড়াও নানা জায়গায় জিও-পলিটিক্যাল ঝামেলা হইতেছে। ওদিকে চলিতেছে রমাদান। সারা বিশ্ব থেকে কত কত চাহিদা আসছে প্রতিনিয়ত। সেগুলোতেও এক্সট্রা সময় ব্যয় হচ্ছে। সব মিলাইয়া তাঁহার দম ফেলিবার ফুরসত নাই। কিন্তু তিনি প্রশান্ত। তাঁহার কাজ-কর্মসকল ইশারায় হয়। তাঁহাকে পেরেশান হইতে হয় না। কিন্তু এই ব্যস্ততার মধ্যেই ব্যাটা শয়তান যন্ত্রণা করিয়া মারিতেছে। পুরো রমাদানই এই ব্যাটা এইরূপ জ্বালাইয়া মারে। সে তাহার নিজের অকাজের বোঝা ফেলিয়া এইখানে বসিয়া আছে, ইহা তাহার সহ্য হইতে চায় না।
তবে এইবারে সে অন্যবারের চেয়ে আনন্দে আছে। দুনিয়ায় যুদ্ধ-বিগ্রহ লাগিতেছে চরম আকারে। বাকি দ্বন্দ্ব-সংঘাত, হানাহানি, রাহাজানি, তালাক, অবাধ মেলামেশা সবই ভালো চলিতেছে। তবে সবচেয়ে আনন্দ তার হয় যখন সে বাংলাদেশের কোনো খবর শোনে। রঙে ভরা বঙ্গভূমি। আপনমনে খিকখিক করিয়া হাসিল সে। এই জায়গাটাকে সে দিনেদিনে হরর মুভির সেট বানাইয়া ফেলিতে সক্ষম হইতেছে। তেমন বেশি কিছু তাকে করাও লাগিতেছে না। এখানকার মানুষ নিজেরাই হায়েনা বনিয়া গিয়াছে, মানুষের চেয়ে পিশাচের আচরণ তাহাদের মধ্যে সুস্পষ্ট এখন। খুন-খারাবি, রাহাজানি, শাসকগোষ্ঠীর জুলুম, ব্যবসায়ীদের ধোঁকাবাজি, মব, ধর্ষণ—কিছুই বাদ থাকিতেছে না। সবচেয়ে বেশি বাড়িয়াছে ধর্ষণ। আশি বছরের বুড়ি হইতে আট মাসের শিশু কেহই আর পড়িতেছে না। শয়তানের পথ অনুসরণ করিতে করিতে ইহারা তাহাকে ছাড়াইয়া উঠিতেছে। ক্ষণে ক্ষণে নরক হইয়া উঠিতেছে জনপদটি। আবারও মনের সুখে হাসিয়া লইল সে, কতক্ষণ স্রষ্টাকে আড়াল করিয়া। আহা, বাঁধা থাকিলেও মনে সুখ হইতেছে।
মহামান্যের দরবারের পশ্চাতে কাহাদের গুনগুনানি ঈষৎ জোরালো মনে হইতেছে। তিনি দৃষ্টিপথ সংকোচন করিলেন। তাঁহার দিক হইতে দৃষ্টি ফিরাইয়া একটু মনোযোগ দিয়া শুনিয়াই ইবলিস বুঝিতে পারিল বাংলাদেশে আবার কিছু কাণ্ড ঘটিয়াছে। আহা, আনন্দ আনন্দ!
চট্টগ্রাম ইকোপার্ক বলিয়া এক জায়গায় একটি সাত বছর বয়সী শিশুকে ধর্ষণ করিয়া মারিয়া ফেলার উদ্দেশ্যে গলার নালি কাটিয়া দিয়াছে। আহা, আহা, আহা।
“আনন্দ রে আনন্দ তুই কোথায় থাকিস বল!”
এই শিশু আবার মারা যায় নাই। গলার কাটা নালি লইয়া গহীন জঙ্গল হইতে হাঁটিয়া বাহির হইয়া আসিয়াছে। আহা আহা! বিভৎসতার কী নগ্ন রূপ! পরে আশপাশের লোকেরা তাহাকে বাঁচাইবার চেষ্টা করিলেও শিশুটি মারা যায়।
মহামান্য অমৌখিক আদেশে অতি সত্ত্বর এই শিশুর ধর্ষণকারীকে খুঁজিয়া বাহির করার হুকুম হইয়াছে। কিন্তু ইবলিস জানে তাহাতে কোনো ফল নাই। কারণ মহামহিম নিজে নিচে নামিয়া তো আর ইহাদের শাস্তি দিবেন না। আর এই জাতটা নিজেরা এমন যে এরা এই কাহিনি শুনিবে, তারপর খোঁজখবর লইয়া দেখিবে, তারপর বসিবে ফেসবুকে কথা দিয়া যুদ্ধ জয় করিতে, কিন্তু তাহারা কাজে কিছুই করিবে না। এরা বিক্ষোভ করিবে না, প্রতিবাদ জানাইবে না, ফেসবুক মারাইবে। আরও মজা হইতেছে যে এদের শাসকও এমন যে এইসবকে নজরআন্দাজ করিয়া যাইবে। এরা প্রচণ্ডভাবে পিঠ বাঁচানো জাত। যে শিশুটির ক্ষতি করিয়াছে সে প্রকাশ্যে ঘুরিয়া বেড়াইবে। শিশুর বাবা-মা কাঁদিয়া ফিরিবে, আশেপাশের সবাই আহা বলিয়া শোক প্রকাশ করিবে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হইবে না।
শয়তান খুশিতে চার হাতে-পায়ে নাচিয়া লইল। এই রমাদানেই তাহার দুনিয়াবি চেলারা এইরূপ চার-পাঁচটি কাজ করিতে সক্ষম হইয়াছে। শুধু এই বাংলাদেশেই। চিন্তা করিলেও রোমাঞ্চ হয়।
কিছুদিন আগেই আরেকটি দলবদ্ধ ধর্ষণের পর তাহার বিচার চাইলে তরুণীটিকে আবারও তুলিয়া লইয়া ধর্ষণ করে চক্রটি। পরিহাস হইতেছে—ইহার বিচার করিতে স্থানীয় মেম্বারকে দায়িত্ব দেওয়া হইলে সে টাকা খাইয়া ঘটনাটি ধামাচাপা দিয়া দেয়। ইহাই প্রমাণ এই জাতির গোড়ায় পচন ধরিয়াছে। পরবর্তীতে কন্যাটিকে মারিয়াও ফেলে তাহারা। আহা আহা! আজকাল ইবলিসের মনে বড়ই প্রশান্তি। মনে হয় রমাদান সুদ্ধ বাকি এগারো মাসও যদি মহামান্য তাহাকে আটকাইয়া রাখেন তবুও তেমন কিছু ক্ষতি-বৃদ্ধি হইবে না।
দয়াময় দৃষ্টি প্রসারিত করিয়াছেন। তাঁহাকে আগের চেয়েও প্রশান্ত দেখাইতেছে। তাঁহার দিকে তাকাইয়া ইবলিসের মনে হইল তিনি ইবলিসের চিন্তা বুঝিয়া ফেলিয়াছেন এবং হাহা রবে হাসির প্রয়াস পাইতেছেন। তিনি ইবলিসকে বলিলেন, “তুমি যাহা জান আমি তাহা জানি, কিন্তু তুমি যাহা জান না তাহাও আমি জানি।”
শয়তান বিভ্রান্ত হইয়া গেল। দয়াময় কী বলিতেছেন বুঝিল না।
দয়াময় বলিলেন, “আমি ছাড় দেই, কিন্তু ছেড়ে দেই না।”
শয়তান একজন ফেরেশতাকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “দয়াময় কী বুঝাইতে চাইতেছেন?”
ফেরেশতা কহিলেন, “সেই শিশুটির হত্যাকারী পাকড়াও হইয়াছে। তাহার শাস্তির ব্যবস্থা করা হইতেছে। ইহা লইয়া তাহাদের দেশে বিশাল আন্দোলন হইতেছে। পরবর্তীতে আর কোনো শিশু-কন্যা যাতে এইসব মানুষরূপী শয়তানের হাতে না পড়ে সেই ব্যবস্থা করা হইতেছে। প্রশাসন এই ব্যাপারে সর্বোচ্চ সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়াছে। সকলে সজাগ হইয়া গিয়াছে। নিজেদের মা, স্ত্রী, কন্যা, ভগিনী সকলে যাতে ভীতিমুক্ত জীবনযাপন করিতে পারে সেটা নিশ্চিত করিবার প্রয়াস চলিতেছে। ভবিষ্যতে আর কোনো নারী বা শিশু ধর্ষণের শিকার হইবে না। যদি হয়, তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করিতে হইবে। তৎক্ষণাৎ কার্যকর করিতে হইবে।
ফেরেশতা বলিলেন, “মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত। তাহারা আশরাফের মতই আচরণ করিবে। আর যারা তোমার পথ লইবে বাকি সকলে মিলিয়া তাহাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়িবে। তবেই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ তথা পুরো দুনিয়া জান্নাত হইবে।
তোমার ওপর খুশি হইয়া একদিন মহামহিম তোমাকে জ্বীন হইতে ফেরেশতার দরজা দিয়েছিলেন, তুমি আদমকে সিজদা না করার গুনাহে তিনি তোমাকে ইবলিস বানাইয়া দিয়াছেন। আর তুমি কিভাবে ভাবিতেছ যে তুমি এইসব করিয়া জিতিয়া যাইবে? রমাদান মাস পূর্ণ শান্তির সময়। মহামহিম সেই শান্তি ভঙ্গ করিতে দিবেন—তাহা ভাবিলে কি করিয়া?”
ফেরেশতার কথা শুনিয়া ইবলিস হতাশ হইয়া গেল। তাহার সারাজীবনের শ্রম পণ্ডশ্রম হইয়া যাইবে নাকি?



পাঠকের মন্তব্য