লেখকঃসাবিহা সুলতানা
গত পরশুদিনই বিয়ে করলাম আমরা। আমি আর তৌসিফ। নিজেদেরকেই করতে হল বিয়েটা। আমার ফ্যামিলি বেকায়দা ধনী তাই তারা তৌসিফের মত গড়পড়তা ব্যাকগ্রাউন্ডের মিডলক্লাস ফ্যামিলির ছেলের সাথে আমার বিয়ে দিতে নারাজ। আর তৌসিফের ফ্যামিলির কথা হল বামুন হয়ে চাঁদে হাত দিতে হবে কেন? যাইহোক আমরা পরস্পরকে ছাড়তে পারব না বলে নিজেরাই বিয়েটা সেরে নিলাম।এখন নিজেদের ছোট্ট বাসায় নিজেদের মত থাকি। আজও ইফতারের পর আমি আর ও টিভি দেখছি, সেখানে কেকা ফেরদৌসির রান্নার অনুষ্ঠান চলছে। আমি ইউটিউব রাঁধুনি,ঝুলি আমার ফাঁকা। তাই আগ্রহ নিয়েই দেখছি।
হঠাৎ তৌসিফের ফোন বাজল। ও রিসিভ করে কথা বলল। আমার শাশুড়ি মা। তিনি কাল সবাইকে নিয়ে ছেলের সংসার দেখতে আসবেন। ইফতার আমাদের এখানেই করবেন। আমার মাথায় হাত। বাবার বাড়িতে কোনদিন রান্নাঘরে ঢুকি নি। পুদিনা পাতা আর ধনেপাতার পার্থক্য বুঝি না। নিজেরা যা খাই তা আর যাহোক মেহমানের পাতে দেয়া যায় না। কি করি, কি করি করে আঙুল কামড়াচ্ছি, বুদ্ধি বাতলালো তৌসিফ নিজেই।
:আরে এত চিন্তার কী আছে? এখন তো চারিদিকেই রান্নার ছড়াছড়ি। টিভি আছে, ফোন আছে, কেকাপ্পা আছেন! আরে আমাদের কেকাপ্পা কি বাহুবলির কাটাপ্পা থেকে কম কিছু? তুমি তারই হেল্প নাও ।উতরে যাবে।
আমি ভাবলাম কথা তো ঠিক। তারা যেভাবে করেন ঠিক সেভাবে করলে আমারও সব ঠিক হবেই। যেই ভাবা সেই কাজ। কেকাপ্পার রেসিপি ফলো করা হবে। চিন্তা করলাম বাবা-মাকেও ফোন করে আসতে বলে দেই। একই সাথে তারাও আমার সংসার, শশুরবাড়ি আর আমার রান্না দেখে যাক। কিন্তু তৌসিফ আমার দিকে এমনভাবে তাকালো যেন আমি জাতিসংঘের শান্তি সম্মেলন ডাকছি। আমি অভয় দিলাম। কিই বা আর হবে!
পরদিন আমি আর তৌসিফ দিনভর কেকাপার ওপর গবেষণা করে, তার রেসিপি দেখে আমাদের ডাইনিং সাজালাম। সাজিয়ে নিজেরাই খুশি হয়ে গেলাম;বাহ! কি করেছি!
বিকালে আমার শশুরবাড়ির সবাই মানে শশুর, শাশুড়ি, ননদ-নন্দাই,তাদের ছেলে,দেবর এলেন। তার কিছুক্ষণ পরই আমার বাবা-মা-ছোটবোন এলো। চারিদিকে পিনপতন নীরবতা! কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছে না পর্যন্ত। গা ছমছম ছমছম, কি হয় কি হয়! আমি আর তৌসিফই সবাইকে নিয়ে এলাম ডাইনিংয়ে। ইফতারের সময় হয়ে গেছে। আজান দিয়ে দিল। সবাই খেজুর দিয়ে ইফতার খুলে শরবত মুখে দিতেই অবস্থা তথৈবচ! শশুর বিষম খেলেন, বাবার নাকে-মুখে উঠে গেল শরবত; মা 'ইন্নালিল্লাহ' পড়লেন আর শাশুড়ি মুচকি হাসলেন!
ননদ-পুত্র বলে উঠল, মা, মামি নুডলসের সাথে কাঁচা মরিচ দিয়ে এটা কি বানিয়েছে? আমি খাব না। নুডলস কি পানিতে ভাসে? এটা ভাসছে কেন? ননদিনী তাড়াতাড়ি তাকে থামানোর চেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
বাবা নিজেকে সামলে নিয়ে অপর শরবতের গ্লাসে চুমুক দিয়েই হা করে কতখানি বাতাস গিলে ফেললেন। তার বেয়াই ও ঐ কাজটি করতে যাচ্ছেন দেখে জলদি তার হাত ধরে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ঐ শরবতটি বরং থাক বেয়াই সাহেব। গরম পানিতে তৈরি তো, শীতকালেই ওটা খেলে আরাম লাগবে! শশুরমশাই হতভম্ব হয়ে তাকালেন। গরম পানিতে শরবত? বাবা চোখের ইশারায় তাকে আশ্বস্ত করলেন;বোধহয় বলতে চাইলেন,নতুন যুগ ভাই!আমাদের সহ্য হবে না এটাই স্বাভাবিক।
আমি ইফতারের অন্য পদগুলো এগিয়ে দিলাম।সেমাই মুখে দিয়ে আমার দেবরের হেচঁকি উঠে গেল। সে পানি পানি বলে চেঁচাতে লাগল। তৌসিফ তার মাথার পেছনে একটা চাঁটি মেরে পানি এগিয়ে দিল।কিন্তু আমি ফাটা বেলুনের মত চুপসে গেলাম। সেমাইটাতে ঝাল একটু বেশিই হয়েছিল। আর সবাইকে দেখে মনে হল না পারছে গিলতে,না পারছে ফেলতে! দেবর বলল,ভাবি রেঁধেছেন কী? ফিউশন কুইজিন? আমার জিহ্বায় কামড়,মাথায় হাত! জবাব দেব কী? অগ্নিঝরা চোখে তৌসিফের দিকে তাকালাম। সে চোখে মুখে বলল, ধরণী দ্বিধা হও।
এবার চিকেন স্টাফড উইথ নুডলস এন্ড এগ ।আমার ননদ-পুত্রের মিহিকন্ঠ আবার শোনা গেল, মা, মুরগির ভেতর থেকে ডিম বের হচ্ছে। সুতা ও বেরুচ্ছে। ওটা আমি খাব না। আচ্ছা মা,মুরগি সুতার ওষুধ খায় না? তার পিতা-মাতা আবার তাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
আমার বোন আমাকে বলল, "আপু,তোর স্যালাইন খেয়ে মরে যাওয়া উচিত। জীবনে শিখলিটা কি তুই? আমি শুনলাম বাবা মাকে বলছেন, করেছটা কি তুমি? মেয়েটাকে কিছু শিখিয়ে পরের বাড়ি পাঠাতে পারোনি? এই ছেলেটা ছিল বলে তোমার মেয়েটার একটা গতি হয়েছে। বেয়াই-বেয়ানকে মুখ দেখানো কষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
মা সেই একই স্বরগ্রামে বাবাকে জবাব দিলেন,ও আচ্ছা। এখন আমার দোষ। আগে যখনই রান্নাবান্নায় ডেকেছি, ওমনি পড়াশোনায় ক্ষতি হবে বলে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছ!
কেকাপ্পার শক্তিশালী রেসিপি আমার সংসার থেকে আমার পূর্বসুরিদের সংসারেও হানা দিতে সক্ষম হয়েছে! বাবা-মায়ের মধুবর্ষণ আরও গাঢ় হবার আগেই আমার শশুর-শাশুড়ি তাতে হস্তক্ষেপ করলেন। বারবার বললেন জীবনের শুরুতে এমন হতেই পারে,ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে। সবাই মিলে আমাকে শিখিয়ে দিলেই হবে।
সবার যাবার সময় হয়ে গেল। ননদ-পুত্রকে খুশি করতে কিছু চকোলেট দিলাম। সে খুশি হয়ে বলল, তুমি হাবিজাবি রাঁধো ঠিকই,কিন্তু আই লাভ ইউ। সবাই চলে যাবার পর তৌসিফকে তেড়ে গেলাম ,সে বলল, আরে লোকের দেখি ভাল করতে নেই। কেকা আপার রেসিপি রাঁধতে বলেছি বলে তুমি রাগ হচ্ছো,কিন্তু একবারও বুঝতে পারছ না এইসব ইউনিক রেসিপি রাঁধাতেই তোমার আর আমার ফ্যামিলি এক হয়ে ফিরে গেল। সবাই যে মিলে মিশে ইফতারের মুড়ি মাখা হয়ে গেল।এখন তারা আত্মীয়।
আরে,তাইতো! এভাবে তো ভেবে দেখিনি। কেকাপ্পা দেখি নাকাল করেও বাঁচিয়ে দিয়েছেন। জয় কেকাপ্পা! জয় রেসিপি!
ওদিকে তৌসিফ সব গুছাতে গুছাতে আমায় বলল, তুমি হাবিজাবি রাঁধো ঠিকই, কিন্তু আই লাভ ইউ।



পাঠকের মন্তব্য