লেখা: রাশেদুল হাসান
রিটায়ার্ড হেড ক্লার্ক হরিপদ সেনগুপ্ত যখন সস্তায় বালিগঞ্জের পুরনো বাড়িটা কিনলেন, তখন পাড়ার লোকে সাবধান করেছিল— মশাই, ও বাড়িতে ‘উপরি’ পাওনা আছে। ওটা ভুতুড়ে।
হরিপদ বাবু আজীবন ডেবিট-ক্রেডিটের হিসাব মিলিয়ে এসেছেন। তিনি চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে বলেছিলেন, ভুতুড়ে মানে? ভূত কি কর্পোরেশন ট্যাক্স দেয়? ইলেকট্রিক বিল দেয়? যদি না দেয়, তবে লিগ্যালি এ বাড়ির মালিক আমি। ভূত থাকলে ভাড়া দেবে, না দিলে নোটিশ ধরিয়ে দেব।
কিন্তু প্রথম রাতেই হরিপদ বাবু বুঝলেন, সমস্যাটা ঠিক ‘ভৌতিক’ নয়, সমস্যাটা ‘নৈতিক’।
রাত তখন দুটো। হরিপদ বাবু ঘুমের ঘোরে শুনলেন, তার পড়ার ঘরে খসখস শব্দ হচ্ছে। চোর এল নাকি?
তিনি টর্চ আর লাঠি নিয়ে পা টিপে টিপে পড়ার ঘরে ঢুকলেন।
গিয়ে যা দেখলেন, তাতে তার পিলে চমকানোর কথা, কিন্তু তিনি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
টেবিলে তার গত মাসের সংসারের খরচের খাতাটা খোলা। আর সেই খাতার ওপর ঝুঁকে বসে আছে এক ছায়ামূর্তি। অবয়বটা ধোঁয়াশা, কিন্তু স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে—ভদ্রলোকরূপী ভূতটির চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, আর পরনে ব্রিটিশ আমলের ধুতি-পাঞ্জাবি। ভূতটি খুব মন দিয়ে খাতা দেখছে আর বিড়বিড় করে বলছে,
ছিঃ ছিঃ! অপচয়! ঘোর অপচয়!
হরিপদ বাবু গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, কে? কে ওখানে?
ভূতটি চমকে উঠল না। বরং খুব বিরক্ত মুখে খাতা থেকে মুখ তুলল। তার গলার স্বর হিমশীতল, কিন্তু তাতে যমদূতের চেয়েও বেশি আছে হেডমাস্টারের গাম্ভীর্য।
ভূত বলল, সেনগুপ্ত, তোমার হিসাবের তো কোনো আগামাথা নেই! গত মঙ্গলবার তুমি লিখেছ—‘কাঁচাবাজার ২০০ টাকা’। কিন্তু ব্রাকেটে ডিটেইলস কই? পটল কত? বেগুন কত? ২০০ টাকা কি হাওয়ায় গেল?
হরিপদ বাবু তোতলে বললেন, আজ্ঞে আপনি কে? আমার প্রাইভেট খাতা দেখছেন কেন?
ভূতটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ধুলোর মতো সেই শ্বাস।
‘আমি এ বাড়ির আদি মালিক, কৈলাস চক্কোত্তি। আমি মরার সময় আমার ব্যাঙ্কের পাসবইয়ের লাস্ট এন্ট্রিতে ৫ পয়সার গরমিল ছিল। সেই যন্ত্রণায় আমার আত্মা আজও শান্তি পায়নি। আমি মুক্তি চাই, কিন্তু তার আগে আমি এই বাড়ির ‘অডিট’ শেষ করতে চাই।’
সেই থেকে শুরু হলো হরিপদ বাবুর নরকযন্ত্রণা।
ভূতটি রক্তচোষা নয়, সে ‘হিসাবচোষা’। সে কাউকে ভয় দেখায় না, কিন্তু তার অত্যাচারে বাড়ির সবাই তটস্থ।
পরদিন সকালে গিন্নি চা বানাচ্ছেন। হঠাৎ জানলার পাশে কৈলাস ভূতের আবির্ভাব। সে চায়ের কেটলির দিকে তাকিয়ে বলল, বউমা, তিন কাপ চায়ের জন্য তুমি যে পরিমাণ গ্যাস খরচ করলে, তাতে একটা ছোটখাটো স্টিমার চালানো যেত। ফ্লেমটা মিডিয়ামে রাখলে মাসে অন্তত ১৫ টাকা সাশ্রয় হতো। অপচয় মানেই পাপ।
গিন্নি ভয়ে ও বিরক্তিতে চায়ে চিনি দিতে ভুলে গেলেন।
দুপুরে হরিপদ বাবু বাজারে যাবেন। ভূত তার কাঁধে সওয়ার হলো।
ইলিশ মাছের দোকানে হরিপদ বাবু দরদাম করছেন।
ভূত কানে কানে ফিসফিস করে বলল, সেনগুপ্ত, ওই ইলিশ নিও না। ওটার পেটে ডিম নেই, অথচ দাম চাইছে ১২০০। তার চেয়ে বাটা মাছ নাও। ক্যালরি ভ্যালু প্রায় সেম, কিন্তু পকেটের সাশ্রয় ৪০০ টাকা। ওই টাকাটা ফিক্সড ডিপোজিটে রাখলে বছরে ৬% ইন্টারেস্ট পাবে।
হরিপদ বাবু মাছওয়ালার সামনেই শূন্যে হাত ছুঁড়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, আরে মশাই, আমি ইলিশ খাব না বাটা খাব, সেটা কি আমার জিভ ঠিক করবে না? আপনি আমার ফাইন্যান্স মিনিস্টার নাকি?
মাছওয়ালা ভাবল ভদ্রলোক পাগল হয়ে গেছেন।
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো মাসের শেষে।
হরিপদ বাবু ইনকাম ট্যাক্সের ফাইল রেডি করছেন। তিনি একটু এদিক-সেদিক করে কিছু টাকা ট্যাক্স বাঁচাতে চাইছিলেন।
হঠাৎ ভূতটি টেবিলের ওপর ধপাস করে একগাদা পুরনো ফাইল ফেলল।
সে গর্জন করে বলল, সেনগুপ্ত! এই যে ‘মেডিকেল এলাউন্স’-এর ভুয়া বিলটা বানাচ্ছ, তোমার কি বিবেক নেই? চিত্রগুপ্তের খাতায় কিন্তু সব এন্ট্রি হচ্ছে। আমি গত ৫০ বছর ধরে এ বাড়ির প্রতিটি ইঁদুরের খাওয়ার হিসাব রেখেছি। তুমি যদি এই ২ হাজার টাকা ট্যাক্স ফাঁকি দাও, তবে আমি আজ সারা রাত তোমার কানের কাছে ১ থেকে ১০ লক্ষ পর্যন্ত নামতা পড়ব!
হরিপদ বাবু কানে হাত দিয়ে বসে পড়লেন, দোহাই কর্তা! আমি ট্যাক্স দেব! সব দেব! আপনি থামুন!
...
এক মাস পর।
বালিগঞ্জের সেই বাড়িতে এখন ‘টু-লেট’ বোর্ড ঝুলছে।
হরিপদ বাবু সপরিবারে পালিয়েছেন। না, ভূতের ভয়ে নয়। অডিটের ভয়ে।
যাওয়ার সময় প্রতিবেশীরা জিজ্ঞেস করেছিল, কী দাদা, ভূতে ভয় দেখাচ্ছিল?
হরিপদ বাবু করুণ হেসে বলেছিলেন, দাদা, রক্তচোষা ভূত সহ্য করা যায়, ঘাড় মটকানো ভূতও সহ্য করা যায়। কিন্তু যে ভূত বাজারের থলে চেক করে বলে—‘আলুর দামে ঠকেছ, কাল থেকে অন্য দোকানে যাবে’—তার সাথে সংসার করা যায় না। ওটা প্রেতাত্মা ছিল না, ওটা ছিল সাক্ষাৎ ইনকাম ট্যাক্স অফিসার!
শোনা যায়, কৈলাস চক্কোত্তি নামের সেই ভূতটি এখন একাই থাকে। আর সারাদিন বাড়ির তেলাপোকাগুলোর ‘হেড কাউন্ট’ করে আর দেওয়ালে কয়লা দিয়ে তাদের বংশবৃদ্ধির গ্রাফ আঁকে। তার ৫ পয়সার হিসাব আজও মেলেনি।



পাঠকের মন্তব্য