হাড় না ভাঙা ভালোবাসা

২৪ পঠিত ... ১ ঘন্টা ৫৫ মিনিট আগে

লেখা: ইশতিয়াক আহমেদ শোভন 

মফিজুদ্দিন সাহেবের কপালে আজ ঘাম জমছে। প্রচণ্ড গরমে নয়, উৎকণ্ঠায়। তার স্ত্রী জোবেদা আদালতে গিয়েছেন। কাবুলের আদালত। গত পরশু রাতে সামান্য মনোমালিন্য থেকে মফিজুদ্দিন সাহেব জোবেদার গায়ে হাত তুলেছিলেন। ঠিক হাত তোলা নয়, তার ভাষায় পরিমিত শাসন।

আজমল সাহেব মফিজুদ্দিনের সামনে শান্ত ভঙ্গিতে চা খাচ্ছে।

মফিজ: আজমল ভাই, আমার তো কলিজা শুকিয়ে যাচ্ছে। জোবেদা যদি আমার নামে নালিশ করে? যদি জেল হয়ে যায়?

আজমল: (নির্লিপ্ত হাসিতে) আপনি ভয় পাচ্ছেন কেন মফিজ সাহেব? আপনি কি জোবেদার হাড় ভেঙেছেন?

মফিজ: না না, হাড় ভাঙব কেন? পাগলের মতো কথা বলবেন না। শুধু পিঠে একটা কালশিটে দাগ পড়েছে।

আজমল: তাহলে তো আপনি বিরাট সাফি মানুষ। তালেবানি ৯০ পাতার দণ্ডবিধি কি আপনি পড়েননি? সেখানে ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদে পরিষ্কার লেখা আছে—হাড় না ভাঙলে ওটা অপরাধই না। ওটা হলো মমতার স্পর্শ। কাজী সাহেব আপনাকে দেখলে উল্টো মোবারকবাদ জানাবেন।

মফিজ: (একটু আশ্বস্ত হয়ে) তাই নাকি? কিন্তু জোবেদা তো খুব কান্নাকাটি করছিল।

আজমল: ওটাই তো সমস্যা। নারীরা বড় আবেগপ্রবণ। তবে ভয় নেই, জোবেদা যখন জখম দেখাতে যাবে, তখন তো তাকে পুরো হিজাব পরে থাকতে হবে। এখন বোরকার ওপর দিয়ে কাজী সাহেব কি আপনার দেওয়া ওই নীল দাগটা দেখতে পাবেন? ওটা দেখতে হলে কাজী সাহেবকে অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার অধিকারী হতে হবে। আপনি কি তাকে মিসির আলি মনে করেছেন?

মফিজ: কিন্তু জোবেদা যদি হুট করে বোরকা খুলে ফেলে?

আজমল: (হাহা করে হাসল) খুললেই তো কেল্লা ফতে! বোরকা খোলা মানেই তো পরপুরুষকে অঙ্গ দেখানো। তখন তো বিচারের বিষয় পাল্টে যাবে। জখমের বিচার আর হবে না, হবে বেহায়াপনার বিচার। জোবেদার তিন মাস জেল হয়ে যাবে। আর আপনি তো ‘মধ্যবিত্ত’ শ্রেণির মানুষ, আপনার সাজা হলেও তো মাত্র ১৫ দিন। লাভ কার হলো? আপনারই তো!

মফিজ: (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) আজমল ভাই, আপনার লজিক তো চমৎকার। কিন্তু একটা চিন্তা হচ্ছে—আমি তো ‘আশরাফ’ বা অভিজাত শ্রেণিতে পড়ি না। আমি যদি উলামা হতাম, তবে কাজী সাহেব শুধু আমাকে ডেকে একটু নসিহত করতেন।আমাকে শুধু বলতেন, ‘মফিজ সাহেব, পরের বার যখন চড় মারবেন, তখন হাড় থেকে অন্তত এক ইঞ্চি দূরে মারবেন। ব্যাস, মামলা শেষ!’

আজমল: সেটা ঠিক। এই যে শ্রেণিবিভাগ, এটা তো বড় বৈজ্ঞানিক বিষয়। অপরাধ যার যার, শাস্তি তার তার স্ট্যাটাস অনুযায়ী। আইন কি আর সবার জন্য সমান হওয়া সাজে? তাহলে আর অভিজাত হওয়ার দাম রইল কোথায়?

ঠিক এই সময় জোবেদা ফিরে এল। তার মুখ ঢাকা। পাশে তার বড় ভাই। আইন অনুযায়ী, অভিভাবক ছাড়া তো নারী আদালত পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না।

মফিজ: কী হলো জোবেদা? কাজী সাহেব কী বললেন?

জোবেদা: (ফুঁপিয়ে কেঁদে) কাজী সাহেব বললেন, হাড় যেহেতু ভাঙেনি, সেহেতু ওটা পারিবারিক খুনসুটি। আর আমি যে আপনার অনুমতি ছাড়া ছোট ভাইয়ের সাথে কথা বলেছি, সেটার জন্য আমাকে সতর্ক করে দিয়েছেন।

আজমল: (চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে) দেখলেন মফিজ সাহেব? পৃথিবীটা কত সুন্দর! এখন আর অপরাধ করলে ভয় পেতে হয় না, শুধু দেখতে হয় আপনি কোন স্তরের মানুষ। আপনি যদি বড় স্তরের হন, তবে আইন আপনার সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়াবে। আর যদি ছোট স্তরের হন, তবে আপনার পিঠের ছালটা একটু শক্ত রাখতে হবে।

মফিজুদ্দিন সাহেব স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। আজ রাতে তিনি নিশ্চিন্তে ঘুমাবেন। জোবেদার হাড় অক্ষত আছে—এটা ভেবেই তার গর্ব হচ্ছে। কী আদর্শ স্বামী তিনি!

২৪ পঠিত ... ১ ঘন্টা ৫৫ মিনিট আগে

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top