শহরভর্তি নেশাখোর 

১০৮ পঠিত ... ১৫:৩৭, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২৬

লেখা: ইশতিয়াক আহমেদ শোভন 

রিহ্যাব সেন্টারের নাম ‘নির্বাণ কুটির’। দেয়ালে বড় বড় করে লেখা, 'নেশামুক্ত জীবন, সুন্দর ভুবন'।

ভেতরে ফ্যান চলছে। সাজিদ বসে আছে আরামকেদারায়। তার সামনে ডক্টর আনিস, যিনি কিনা শহরের নামকরা ‘মাইন্ড হিলার’। সাজিদের অপরাধ? সে মাঝরাতে শহরের ফ্লাইওভারের ওপর দাঁড়িয়ে একা একা বোতল হাতে চাঁদ দেখছিল। ধরা পড়ার পর তার প্রভাবশালী কোনো ‘মামা’ ফোন করেনি, প্রথমে জেলে, তারপর এখন রিহ্যাবের কয়েদি।

ডক্টর আনিস চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে বললেন, সাজিদ সাহেব, আপনি শিক্ষিত ছেলে। ব্যাংকার ছিলেন। এই নোংরা পথে কেন নামলেন? মদ কি কোনো সমাধান?

সাজিদ মুচকি হাসল। হাসিটা একটু ত্যাড়া।

: ডক্টর, সমাধানের খোঁজ তো আপনারা করেন। আমি তো বিসর্জনের লোক। এই শহরে সালা সবাই নেশাখোর। আপনিও নেশাখোর। শুধু তাই-ই না, আপনি নেশা বিক্রি করেন। মানুষকে যে বেঁচে থাকার আশা দেখান, এই স্বপ্নটাও আসলে একপ্রকার নেশা।

নেশা অনেক রকম। কেউ মদের নেশা করে। কেউ টাকার নেশা করে। কেউ ক্ষমতার নেশা করে। আর চেকপোস্ট তো একটা ফিল্টার।

আনিস সাহেব কলম থামিয়ে বললেন, ফিল্টার মানে?

: মানে হলো কে ধরা খাবে আর কে ছাড় পাবে, তার ফিল্টার।–সাজিদ আয়েশ করে বলল। 'পুলিশ যখন আমার মানিব্যাগের চিপায় কী আছে খোঁজে, সে আসলে খুঁজছিল আমার ‘যোগ্যতা’। আমার যদি কোনো এমপির পিএস-এর নাম্বার থাকত, তবে ওই বোতলের পানি তখন ‘পবিত্র জমজমের পানি’ হয়ে যেত। কিন্তু আমার পকেটে ছিল শুধু কয়েকটা কবিতার লাইন আর একটা ছেঁড়া দশ টাকার নোট। তাই আমি এখন ‘নেশাখোর’, আর ওই এসি গাড়িতে করে যাওয়া লোকটা হলো ‘ভিআইপি’। অপরাধ একই, ডক্টর, শুধু ডেকোরেশন আলাদা।' 

ডক্টর আনিস গম্ভীর গলায় বললেন, আপনি লজিক দিয়ে ভুল ঢাকছেন। অ্যালকোহল শরীরের ক্ষতি করে।

: ক্ষতি তো এই শহরটাও করছে, ডক্টর!–সাজিদ এবার সোজা হয়ে বসল। 'সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত কিউবিকলে বসে থাকা কি শরীরের জন্য ভালো? বসের ঝাড়ি খাওয়া কি লিভারের চেয়ে কম ক্ষতি করে? আমরা লোনলি, ডক্টর। এই শহরে মানুষ বাড়ছে, কিন্তু মানুষ কমছে। চেকপোস্টে যখন পুলিশ ভাই জিজ্ঞেস করে ‘ব্যাগে কী?’, আমি বলতে চেয়েছিলাম ‘ভাই, ব্যাগে এক দলা হাহাকার আছে, দেখবেন?’ কিন্তু বলি না। বললে আপনারা পাগল সাজিয়ে ইলেকট্রিক শক দেবেন।' 

ডক্টর আনিস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ডায়েরিতে লিখলেন, রোগীর ডিলুশন প্রকট। তীব্র সমাজবিদ্বেষী চিন্তা। তিনি কলিংবেল টিপলেন। ওয়ার্ডবয় এসে সাজিদকে নিয়ে গেল মেডিটেশন রুমে। যাওয়ার সময় সাজিদ বলে গেল, ডক্টর, সাদা অ্যাপ্রনটা খুলে আয়নায় নিজের চোখের দিকে তাকাবেন একদিন। দেখবেন, ওটাতেও এক ফোঁটা লাল নেশা জমে আছে, সফল হওয়ার নেশা!

দরজা বন্ধ হলো। রুমটা এখন নিস্তব্ধ।

ডক্টর আনিস চেয়ারে হেলান দিলেন। কপালে জমে থাকা ঘাম মুছলেন। তারপর ড্রয়ার থেকে একটা চাবির রিং বের করলেন। তার বুকশেলফের একদম নিচে মোটা মোটা মেডিকেল বইয়ের আড়ালে একটা ছোট্ট লকার।

লকার খুলতেই বেরিয়ে এল এক বোতল ধকধকে জ্যাক ড্যানিয়েলস।

তিনি গ্লাসে কোনো বরফ নিলেন না। এই শহরে বরফও এখন ভেজাল। এক চুমুক দিয়ে বুক ভরে শ্বাস নিলেন তিনি। তারপর জানালার পর্দাটা একটু সরিয়ে বাইরে তাকালেন। নিচে ট্রাফিক জ্যামে শত শত গাড়ি আটকে আছে। মানুষগুলো হর্ন দিচ্ছে।

ডক্টর আনিস বিড়বিড় করে বললেন, সাজিদ ছেলেটা একটা মিথ্যাও বলেনি। এই শহরে শালা সবাই নেশাখোর।

গ্লাসে আরেকটু ঢাললেন তিনি। বাইরের চেকপোস্টে তখন আরেকটা ‘সাজিদ’-এর পকেট চেক করা হচ্ছে। ডক্টর আনিস গ্লাসে চুমুক দিয়ে ভাবলেন, কাল সকালে আবার ‘সুস্থ জীবনের’ ওপর একটা লম্বা লেকচার দিতে হবে।

১০৮ পঠিত ... ১৫:৩৭, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২৬

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top